মেইন ম্যেনু

ভ্যানচালক জায়দা বেগমের জীবনযুদ্ধে হার না মানার গল্প

গায়ের রঙ ‘কালো’ বলে তাকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেনি কেউ। ফর্সা হলে যৌবনে যেমন ছেলেরা প্রেমে পড়ে, তেমন করে তার প্রেমেও পড়েনি কেউ। যত দিন গড়িয়েছে পরিবারের অবিবাহিত কন্যার জন্য বাবা-মার বোঝা যেন ততই বেড়েছে। মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে পারলে আবার বিয়ে হয়ে যেত দ্রুতই। অবশেষে ৩০ বছর বয়সে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামের বাসিন্দা জায়দা বেগমের বিয়ে হয় শাহা জামাল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে।

বিয়ে হওয়ার পর ‘কালা’ স্ত্রীর সাথে সংসার করতেও রাজি হয়নি স্বামী! ফলে বছরখানেকের মধ্যেই সংসার ভাঙে জায়দা বেগমের। তার গর্ভে সন্তান রেখেই চলে যায় স্বামী। অসহায় জায়দা তখন বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ নেন। ঝিয়ের কাজ করা অবস্থায় জন্ম নেয় তার একমাত্র পুত্র সন্তান জায়দুল হক।

ভারতের সীমান্তবর্তী পদ্মার দুর্গম বাংলাবাজার চর ছেড়ে ছেলেকে সাথে নিয়ে প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি চলে আসেন বর্তমান ঠিকানা রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের জোতকাদিরপুর গ্রামে। এখানে ৫ কাঠা জমি কিনে শুরু করেন নতুন জীবন। নানা সময় নানা কাজ করে বাঁচিয়েছেন নিজের ও সন্তানের জীবন। জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে তিনি কোন কাজকেই ছোট করে দেখেননি। এভাবেই পার করে দিয়েছেন জীবনের ৫০ বছর।

৫০ বছর বয়সে তিনি সাহসী একটি পদক্ষেপ নিতে মনস্থির করেন। পরিবর্তন করেন তার পেশা। জীবনযুদ্ধে হার না মানা জায়দা জীবিকার তাগিদে ধরেছেন ভ্যানের হ্যান্ডেল। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দু-মুঠো ভাতের জন্য উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ান। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের দিকে তিনি স্থানীয় একটি এনজিও থেকে কিস্তিতে প্রায় ৩২ হাজার টাকা নিয়ে একটি ভ্যান কেনেন। কয়েকদিন নিজে নিজে খোলা মাঠে চালিয়ে নিজেই নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। এরপর একদিন সমাজের শত রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি রাস্তায় বেড়িয়ে পড়েন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জোতকাদিরপুর-নারায়নপুর-বাঘা সড়কে ভ্যান চালান তিনি।

ভান চালিয়ে দিন শেষে তার আয় ২৫০ টাকা থেকে ৩৫০টাকা। প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জ দিতে ব্যয় করেন ২০টাকা। সপ্তাহের মাথায় পরিশোধ করেন এনজিওর কিস্তির টাকাও। বাকি টাকা দিয়ে নিজের ও একমাত্র ছেলের পড়াশোনার খরচ চালান তিনি। সপ্তাহ শেষে কিছু টাকা সঞ্চয়ও করেন। নিজে পড়াশুনা করতে না পারলেও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করার স্বপ্ন জায়দার। ছেলে জায়দুল হকের লেখাপড়াটাও শুরু হয়েছে দেরিতে।

ভ্যান চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে জায়দা বেগম বলেন, ‘সমাজের এং পরিবারের বোঝা না হয়ে কাজ করা উত্তম। আর কোন কাজের গায়ে নাম লেখা নেই যে, এই কাজ পুরুষের, এই কাজ নারীর। পেশা হিসেবে সকল কাজে সবার অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকা দরকার। নারীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি নারীর কর্মস্থানও বাড়া উচিত। নারীরাও গাড়িতে চলে। তারা নিজেরা গাড়ি চালালে দোষ কি? আমি ভিক্ষা না করে কাজ করে খাচ্ছি। আমার ছেলে লেখা-পড়া করার সুযোগ পাচ্ছে। যারা সমালোচনা করে তারা তো আমাকে মাস চলার খরচ দেয়না। তাদের সমালোচনা আমি কেন শুনবো?’

স্থানীয় বেসরকারি স্ব-উন্নয়নের প্রকল্প কর্মকর্তা আবু বাক্কার সিদ্দিকী বলেন, ‘যানবাহনের চালক হিসেবে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি নিরাপদ। কেননা তারা সহজে ধৈর্য্য হারা হয় না। ওভারটেকের মত ঘটনা তাদের দ্বারা কম সংগঠিত হয়। ফলে সড়কে নারী চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা দেশের অর্থনীতি ও নারীদের জন্য এক মাইল হবে।’