মেইন ম্যেনু

মক্কায় কারো জন্য বিস্কুট, কারো খাবার ভরা টেবিল!

সৃষ্টিকর্তার সামনে সম্ভবত তাঁদের সবার মর্যাদা এক। এমনকি সৌদি আরবের মসজিদ আল হারামের ভেতরে ঢুকে যখন সবাই প্রার্থনা করেন, তখনও সবার একই মর্যাদা থাকে। কিন্তু প্রার্থনা শেষে যখন তারা মসজিদ থেকে বের হন, তখন তাদের মধ্যকার বিভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি পবিত্র হজ পালনে যাঁরা এই মুহূর্তে সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থান করছেন, তাঁদের কথা নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির করা একটি প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

পবিত্র নগরী মক্কা। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে মসজিদ আল হারামের পেছনেই রয়েছে মক্কা রয়েল ক্লক টাওয়ার। এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ উচ্চতার বহুতল ভবন। আছে ছয়টি সুউচ্চ ভবন নিয়ে নির্মিত বিলাসবহুল আবরাজ আল বায়েত টাওয়ার কমপ্লেক্স। এখানে আছে বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে অনেক কিছু।

একই শহরে আবার উল্টো চিত্রও আছে। পূর্ব দিক থেকে শহরের প্রবেশপথে আরেক দৃশ্য। সেখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র থেকে পানি পড়ছে, রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ পড়ে আছে, আর বাতাসে অন্যরকম গন্ধ।

আপনি দেখতে পাবেন, ছোট ছোট দোকান থেকে বৃদ্ধ বিক্রেতারা তাঁদের পণ্য বিক্রির জন্য হাঁকডাক করছেন। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মিসওয়াক, জায়নামাজ, কাঠের তসবিহ থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের চপ্পল।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে স্থানীয় দোকান মালিক আবু মোহাম্মদ বলেন, এখানে সবকিছু অনেক কম দামে পাওয়া যায়। যারা অনেক দরিদ্র তারা এখান থেকে বিভিন্ন সামগ্রী কিনতে আসে। কারণ শহরের অন্যপ্রান্তের দোকানগুলোতে দাম চড়া এবং ওগুলো যাদের অনেক টাকা আছে তাদের জন্য।

সৌদি আরবের সামাজিক সুরক্ষা বিভাগ মক্কার দুস্থ বৃদ্ধদের উপার্জনের জন্য এই ধরনের ছোট ছোট দোকান খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এ রকমই একজন দোকানী ৭৪ বছর বয়সী হাসান জানান, সরকারই দোকানের সব খরচ বহন করে। একেবারে দোকান ভাড়া থেকে শুরু করে বিদ্যুৎবিল পর্যন্ত সবই সরকার দেয়। আমাকে শুধু মালামাল বিক্রি করতে হয়।

ওই স্থানে কয়েকজন আফ্রিকান নারীকেও দেখা যায়। যাঁরা কবুতরকে খাওয়ানোর জন্য শস্যদানা বিক্রি করছেন হজযাত্রীদের কাছে।

এ ছাড়া পূর্ব দিকের দরজার বাইরে কিছু স্বেচ্ছাসেবককে দেখা গেল, হজযাত্রীদের মধ্যে খাবারের বাক্স বিতরণ করতে। তাদের কাছ থেকে খাবার নিয়ে হজযাত্রীরা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রচণ্ড গরমের মধ্যেই রাস্তায় বসে পড়ে খাবার খাচ্ছেন।

এবার চলুন ফিরে যাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আবরাজ আল বায়েত কমপ্লেক্সে। দ্রুতগতিতে এলিভেটরগুলো ওঠানামা করছে। ভীষণ ব্যস্ত সময় সেখানে। কমপ্লেক্সের নিরাপত্তারক্ষী আর কর্মীরা মিষ্টি হেসে হজযাত্রীদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। সেইসাথে তাঁদের সহায়তা করছেন তারা যেন তাদের নির্দিষ্ট স্থানটি খুঁজে পান।

কমপ্লেক্সের একটি হোটেলের কর্মচারী বললেন, আমাদের অতিথিরা সাধারণত উচ্চ বিত্ত শ্রেণির হয়ে থাকেন। এঁরা বিত্তবান হজযাত্রী এবং আরামের বিনিময়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকেন।

হজ মৌসুমে এই হোটেলের ভাড়া প্রতি রাতে গড়ে এক হাজার ডলার। এখানকার বেশিরভাগ কক্ষ থেকেই পবিত্র কাবা শরীফ দেখতে পাওয়া যায়। সেজন্য বিত্তবানদের কাছে এর চাহিদাও বেশি।

মিসর থেকে হজ করতে এসেছেন ইয়াসের রিয়াদ। তিনিও উঠেছেন এই হোটেলে। তিনি জানান, স্ত্রীকে নিয়ে এবার হজ পালনে এসেছেন। হজের পুরো সফরে তাদের মাথাপিছু খরচ হচ্ছে পাঁচ হাজার ডলার। তিনি বলেন, ‘আমরা মসজিদ আল হারামের কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করেছি যাতে করে প্রার্থনার জন্য সময় বাঁচাতে পারি।’ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা হোটেল সংলগ্ন শপিং মল থেকেই করেছেন এই দম্পতি। কারণ হিসেবে বললেন, ‘বাইরে অনেক গরম।’ তা ছাড়া এখানেই পেয়ে যাচ্ছেন সব ধরনের খাবার। রয়েছে বুফে ব্যবস্থা।

এবার আরেকজন হজযাত্রীর কথা বলি। তাঁর নাম উম্মে হানি। বয়স ৫৫ বছর। শহরের পূর্ব দিকে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে পা টেনে টেনে হাঁটছেন তিনি। উপরের বিলাসের কথা কল্পনাও করতে পারেন না তিনি। শহরের উত্তর দিকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওইদিককার দোকানগুলো ভীষণ ব্যয়বহুল। সেই তুলনায় এই এলাকার খোলাবাজার অনেক সস্তা।’

উম্মে হানির অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে নিজের টাকায় হজে আসা অসম্ভব ছিল তাঁর জন্য। তবে মিসর সরকার প্রতিবছর দরিদ্রদের হজে পাঠানোর জন্য যে লটারি করে সেখানে নাম আসায় পবিত্র হজ পালনের সুযোগ হয়েছে তাঁর। সৌদি আরব সরকারের দেওয়া বিনামূল্যের বিস্কিট, টুনামাছ, বিভিন্ন ফলের রস পেয়ে ভীষণ খুশি তিনি। উম্মে হানি থাকছেন দরিদ্র হজযাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে।

পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই মানুষ হজ করতে আসুক না কেন সবাইকে পরিধান করতে হয় একই রকমের ইহরাম। কাবা শরীফের কোন দরজা দিয়ে তারা ভেতরে প্রবেশ করছেন সেটা এখানে মুখ্য নয়, ভেতরে ঢুকে সারিবদ্ধভাবে নামাজ আদায় করাটাই মুখ্য। হাজিরাও সেটাই করছেন। কারণ আল্লাহর ঘরে কোনো ভেদাভেদ নেই। কিন্তু এই ঘরের দরজা পেরোলেই আবারও মানুষের সৃষ্টি করা ভেদাভেদ। সেই শ্রেণি বৈষম্য, সেই অর্থ-বিত্তের প্রভাব।

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় একই হজব্রত পালন করতে এসে উম্মে হানির মতো হজযাত্রীরা যেখানে বিনামূল্যের বিস্কিট খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করছেন সেখানে আরেক শ্রেণির হজযাত্রীর জন্য পরিবেশিত হচ্ছে বুফে খাবার। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সুস্বাদু খাবার খেয়ে কেউ নামাজে বসছেন আবার কেউ প্রচণ্ড গরমে রাস্তায় বসেই সেরে নিচ্ছেন বিনামূল্যে পাওয়া খাবার। তারপর আল্লাহর প্রতি হাত উঠিয়ে শুকরিয়া আদায় করছেন।

প্রতিবছর পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবে ছুটে আসেন বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ। আর যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এভাবেই দিন কাটান সৌদি আরবে। তবে যে যেভাবেই হজ করেন না কেন, কার দোয়া কবুল হচ্ছে কারটা হচ্ছে না, সেটা বলতে পারেন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। যাকে সন্তুষ্ট করতেই এত আয়োজন।