মেইন ম্যেনু

মদ খেয়ে মরছে পুরুষ, বিয়ে হচ্ছে না যুবতীদের!

‘সুলতানার স্বপ্ন’ উপন্যাসে নারীস্তানের কথা বলেছিলেন নারী জাগরণের প্রতীক বেগম রোকেয়া। যেখানে স্থান নেই পুরুষের। কিন্তু বাস্তবে পুরুষশূন্য গ্রাম কি হতে পারে? এখনও না হলেও হতে দেরি নেই আর। এমন একটি গ্রামের নাম ‘ধ্যাঙ্গর পাড়া’। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের সদর সিউড়িতে এই গ্রামের অবস্থান। এই গ্রামে নারী ও শিশু থাকলেও পুরুষের সংখ্যা খুবই কম। দিনদিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে পুরুষের সংখ্যা।

কি কারণে কমছে পুরুষের সংখ্যা? এই গ্রামে পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ ‘চোলাই মদ’। এটা খেয়েই গত দু’বছরে মারা গেছে ৬০ থেকে ৭০ জন পুরুষ। আর তাদের সংখ্যা এসে ঠেকেছে সাত থেকে আটে। ফলে সমস্যার মুখোমুখি গ্রামের মহিলারা। আবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে যুবতিদের ভবিষ্যৎ। পুরুষ নেই, তাই অনেকেরই বিয়ে হচ্ছে না। পরিবারের বংশরক্ষা হবে তো ? চিন্তায় ঘুম উড়েছে অনেকের।
পশ্চিমবঙ্গে বীরভূমের জেলা সদর সিউড়ি থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে রয়েছে আদিবাসী গ্রাম উপর ধ্যাঙ্গর পাড়া ও নিচু ধ্যাঙ্গর পাড়া। আর পাঁচটা গ্রামের মতোই ছিল এই গ্রামগুলির চেহারা। কিন্তু, ছবিটা বদলাতে শুরু করে তিনবছর আগে থেকে। কী রকম ?

গ্রামের মহিলাদের বক্তব্য, আদিবাসী পুরুষরা চোলাই বা হাড়িয়া খায়। আগেও খেত। কিন্তু এই কয়েক বছরে তা খেয়ে প্রাণ হারান অনেকে। দিন কাটে, মাস কাটে, ঘুরে যায় বছরও। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মৃত্যুর সংখ্যা। গ্রামে নেই হাসপাতাল, শহরে গিয়ে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য নেই অনেকের। ফলে অসুস্থ হয়ে বাড়িতেই মৃত্যু হতে থাকে কিশোর, যুবক, প্রাপ্তবয়স্ক, বৃদ্ধদের। এখন গ্রামে পুরুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ থেকে ৮ জন। তাদের মধ্যে একজন দিলীপ কোঁড়া। তিনি কয়েক মাস ধরে শয্যাশায়ী। তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী কোঁড়া জানান, “স্বামীকে নিয়ে গত প্রায় ৮ থেকে ৯ মাস ধরে ভুগছি। বাড়িতে পড়ে রয়েছে। হাতে কাজ নেই, টাকাও নেই চিকিৎসার জন্য। গত কয়েকদিন আগে সিউড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু, সেখানে চিকিৎসা সেরকম হয়নি। সেখানকার ডাক্তাররা স্বামীকে বর্ধমানে স্থানান্তরিত করে। সেখানে পরীক্ষা করে জানানো হয় টিভি হয়েছে। ওষুধ কেনার পয়সা নেই। সরকারি কোনও সাহায্য পাই না। বিনা চিকিৎসাতেই দিন কাটাতে হচ্ছে।”

সংস্থান নেই, পেট চলে দেহব্যবসায়
পুরুষরা যতদিন ছিল ততদিন চিন্তা ছিল না মহিলাদের। শহরে কাজ করে তারাই রোজগার করে নিয়ে আসত। গ্রামে ক্ষেত খামারির কাজ করত মহিলারা। কিন্তু, ধারাবাহিকভাবে পুরুষরা একের পর এক মারা যাওয়ায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে মহিলাদের কপালে। খাবে কী ? বাচ্চাদের পড়াশোনা ? সন্তান নিয়ে কোথায় যাবে তারা ? গ্রামের মহিলারা জানাচ্ছেন, আদিবাসী মহিলাদের শহরে তেমন কাজ দেওয়া হয় না। তা ছাড়া বাড়ি ঘর ছেড়ে কাজ করতে যেতেও আগ্রহী নয় অনেকে। কিন্তু, পেট তো চালাতে হবে। কীভাবে ? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা বলেন, বাড়ির পুরুষরা মারা যাওয়ার পর দেহব্যবসায় নামা ছাড়া উপায় ছিল না। যারা সাহসী তারা শহরে গিয়ে দেহব্যবসা শুরু করে। আর বাকিরা সন্ধেবেলা দাঁড়ায় রাস্তায়। দুটি গ্রামের মাঝখান দিয়ে নগরী গ্রামের দিকে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। সূর্য ডোবার পরে সেই রাস্তাতে সারি দিয়ে দাঁড়ায় আদিবাসী মহিলারা। পথচলতি মানুষদের ডেকে নেয় নিজের ঘরে অথবা প্রকাশ্য রাস্তাতেই চলে দেহব্যবসা।

বংশরক্ষা হবে তো ?
প্রায় তিনবছর ধরে পুরুষশূন্য গ্রাম। মহিলার সংখ্যা অনেকটাই বেশি। কিশোরী, যুবতি, প্রৌঢ়া, বৃদ্ধা সবই রয়েছে তালিকায়। যাদের স্বামী মারা গেছে তাদের কথা অন্য। কিন্তু, যারা কিশোরী বা যুবতি ? গ্রামে ছেলে না থাকায় বিয়ে হচ্ছে না তাদের। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, প্রায় দুবছর গ্রামে কোনও বিয়ে হয়নি। বাজেনি সানাই। ওই দুটি গ্রাম ছাড়াও পাশে রয়েছে আরও এগারোটি আদিবাসী গ্রাম। কিন্তু, পুরুষশূন্য হওয়ার পর থেকে গ্রামের বদনাম হয়েছে। ফলে এই দুটি গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায় না অন্য গ্রামের পরিবার। গ্রামে নেই পুরুষ, বিয়ে হচ্ছে না মহিলাদেরও। ফলে বংশরক্ষা হবে তো ? চিন্তায় গ্রামবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গ্রাম পঞ্চায়েত বাম দল সিপিআইএমের দখলে রয়েছে। ফলে বন্ধ ১০০ দিনের কাজ। প্রায় সব রকম সুবিধা থেকে বঞ্চিত গ্রাম। না আছে শৌচালয়, না আছে মাথা গোঁজার ভালো ঠাঁই। গ্রামের এই অবস্থা কেন ? সিউড়ি ১ নম্বর ব্লকের বিডিও মুহাম্মদ বদরুদ্দোজা জানিয়েছেন, “ওই গ্রামের বেহাল দশার কথা শুনেছি। পুরুষ নেই সেখানে। আর যারা বেঁচে আছে তাদের অবস্থাও খারাপ। আমরা ওই গ্রাম দুটিকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।”- এনাডু ইন্ডিয়া।