মেইন ম্যেনু

মধ্যপাড়া পাথর খনি দেড় মাসের মধ্যে উত্তোলন বন্ধের আশঙ্কায়

দিনাজপুরের মধ্যপাড়া পাথরখনিতে পাথর উত্তোলন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। মতবিরোধের চলছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খনি কর্তৃপক্ষের।
খনির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ঠিকাদার জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়ামের (জিটিসি) সঙ্গে খনি কর্তৃপক্ষের মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করায় প্রয়োজনীয় খনন উপকরণ ও ভারী খননযন্ত্র সময়মতো বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়নি।
ফলে খনি ভূগর্ভে নতুন স্টোপ (সুরঙ্গের ধাপ) উন্নয়ন করতে না পারায় এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে খনির পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, পদ্মাসেতু কর্তৃপক্ষ মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহার শুরু করেছে। এছাড়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে পিপিপি প্রকল্প ও কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহুলেন টানেল নির্মাণ প্রকল্পেও এখানকার পাথর ব্যবহারের আলোচনা চলছে।
ফলে পাথর উত্তোলন বন্ধের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় ওই তিন প্রকল্পে পাথরের যোগান নিয়ে চিন্তায় পড়েছে খনি কর্তৃপক্ষ।
খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে গেলে ওই তিন প্রকল্পের ঠিকাদাররা এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এতে করে মধ্যপাড়া পাথরখনি পেট্রোবাংলার লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসাবেই রয়ে যাবে।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে গত ২২ জুলাই মধ্যপাড়া খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আবুল বাসারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে খনির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা।
একটি সূত্র জানায়, মধ্যপাড়া খনির উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান জিটিসি ২০১৪ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে খনিটি পরিচালনা করে আসছে। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় খনন উপকরণ ও ভারী খননযন্ত্র সরবরাহ করবে খনি কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় এবং খনি কর্তৃপক্ষের অপারগতায় প্রথম দিকে জিটিসি নিজ অর্থে বিদেশ থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকার উপকরণ ও যন্ত্র নিয়ে এসে উৎপাদন শুরু করে। খনি কর্তৃপক্ষ সে টাকা পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে। পরে পেট্রোবাংলার হস্তক্ষেপে দুই দফায় ১৩ কোটি টাকা পরিশোধ করে খনি কর্তৃপক্ষ।
খনি কর্তৃপক্ষের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী উপকরণ ও যন্ত্র বাবদ অর্থ বৈদেশিক মূদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু জিটিসি দেশীয় মুদ্রায় সে অর্থ দাবি করায় সমস্যা দেখা দেয়। যে টাকায় ৩২/৩৩ রকম উপকরণ কেনা সম্ভব জিটিসি ১৬/১৭ রকম উপকরণ কিনতেই একই পরিমাণ অর্থ দাবি করছে।
তবে জিটিসির দাবি, খনি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় মালামাল দিতে পারছে না বলেই তা‍দের তা আমদানি করতে হচ্ছে। খনি কর্তৃপক্ষ অযথা জিটিসিকে হয়রানি করছে।
এসব বিষয়ে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আবুল বাসারের বিরুদ্ধে জিটিসি সম্প্রতি পেট্রোবাংলাসহ সরকারের উচ্চ মহলে অভিযোগ করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলা আবুল বাসারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। পরে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুজ্জামানকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব দেয়।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির প্রতিনিধি ও জার্মানিয়া করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম কাজী জানান, খনন উপকরণ, প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক ও ডিটোনেটরের (এক্সপ্লোসিভ) অভাবে খনির পাথর উত্তোলন দুই দফা বন্ধ থাকে।
বর্তমান উৎপাদনশীল স্টোপ থেকে আর এক থেকে দেড় মাস পাথর উত্তোলন করা যাবে। প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে খনন উপকরণ ও ভারী যন্ত্র আমদানি করা না হলে পাথর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মীর আব্দুল হান্নান জানান, যে খননযন্ত্রের প্রয়োজন সেটি কোন দেশের তৈরি জিটিসি তা বলছে না। ফলে এটি সংগ্রহে দেরি হচ্ছে। জিটিসি অনেক বাড়াবাড়ি করছে যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০০৭ সালের ২৫ মে মধ্যপাড়া কঠিন শিলাখনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। উৎপাদন শুরুর পর থেকে নানা প্রতিকুলতার কারণে পেট্রোবাংলা প্রতিদিন তিন শিফটে ৫ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক শিফটে গড়ে ১ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করে আসছিল। এতে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ৬ বছরে খনিটি লোকসান দিয়েছে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা। এ অবস্থায় ২০১৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় ৬ বছরের জন্য খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলারুশের জেএসসি ট্রেস্ট সকটোস্ট্রয় ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান জিটিসিকে।
পরে জিটিসি ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি খনি পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি উৎপাদনে যায়। জিটিসি প্রথমে এক শিফটে পাথর উৎপাদন শুরু করে এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিফট চালুর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করছে।খনির আঙিনায় বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ টন পাথর মজুদ রয়েছে।