মেইন ম্যেনু

মন্ত্রীর মুখে মাস্ক, জনতার নেই

চট্টগ্রামে দুর্ঘটনাকবলিত ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট কারখানা বুধবার পরিদর্শনে যান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময়ে মুখে মাস্ক ব্যবহার করে সচেতনতার পরিচয় দেন মন্ত্রীরা। এ সময় দুইমন্ত্রীর পাশে উৎসুক জনতা ও নেতাকর্মী থাকলেও তাদের মুখে ছিল না নিরাপত্তা মাস্ক।

শুধু তাই নয় পরিদর্শন শেষে দুইমন্ত্রী দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে রুমে চলে যান। সেখানে মাস্ক খুলে পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে তারা কথা বলেন।

দুইমন্ত্রীর এমন ‘সচেতনতায়’ সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় এক মুদি দোকানদার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘মন্ত্রী বলেই সম্ভব। তাদের মুখে মাস্ক। মন্ত্রীর দাম আছে জনগণের দাম নেই।’

মন্ত্রীদের সচেতনতা ও উপেক্ষিত জনগণ— এমন পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘তারা (মন্ত্রী-এমপি) মূলত জনগণের পক্ষেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যান। কিন্তু এ কথা তারা মনে রাখে না যে, সবার আগে জনগণের নিরাপত্তা। মন্ত্রীদের আচরণ হতাশাজনক।’

তিনি বলেন, ‘তারা নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রতি দেয় জনগণের সেবা করবে। আসলে কী তারা পরবর্তীতে তা মনে রাখে? ব্যক্তিগতভাবে হয়তো বা তারা তা উপলব্ধি করে না। করা হলে জনগণের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টা তারা সবার আগে চিন্তা করতেন। তাই জনসচেতনতা করার আগে জনগণের ভালো দিকটা সামগ্রিকভাবে তাদের উপলব্ধি করতে হবে বলে মনে করি। এখানে আমি না (মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী) সবার নিরাপত্তার বিষয়টা সমানভাগে গুরুত্ব দিতে হবে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মাস্ক পড়েছেন কিন্তু তাদের সঙ্গে যারা ছিল তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খেয়াল করেননি। এটা হতাশাজনক। মন্ত্রীদের কাছ থেকে আমরা এটা প্রত্যাশা করি না। এটা দায়িত্ব অবহেলার শামিল।’

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সেটা খুশির খবর। আমরা সেটাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না দিয়ে শুধু নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এটা দায়িত্ব অবহেলা বলে আমি মনে করি।’

সোমবার রাতে সার কারখানার অ্যামোনিয়া ট্যাঙ্কারটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। জানা গেছে, চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি অ্যামোনিয়া ট্যাংকটিতে ত্রুটি ধরা পড়ে তিন বছর আগেই। তার পরও সেটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার কারখানা কর্তৃপক্ষ। ত্রুটিপূর্ণ ওই ট্যাংকেই অ্যামোনিয়া গ্যাস সরবরাহ করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া প্রতিষ্ঠার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও ওভারহোলিং (নির্দিষ্ট সময় উৎপাদন বন্ধ রেখে যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও মেরামত) করা হয়নি একবারো। যদিও দুর্ঘটনা এড়াতে যে কোনো কেমিক্যাল প্লান্ট নির্দিষ্ট সময় অন্তর ওভারহোলিংয়ের নিয়ম রয়েছে।

কারখানাগুলোয় অ্যামোনিয়া স্টোরেজ ট্যাংকের পুরুত্ব হয় সাধারণত ১৬-১৮ মিলিমিটার। কিন্তু চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি বিস্ফোরিত অ্যামোনিয়া ট্যাংকটির পুরুত্ব ছিল মাত্র আট মিলিমিটার। অথচ একই প্রতিষ্ঠানের অন্য প্লান্টের বাকি ট্যাংকগুলোর পুরুত্ব ১৮ মিলিমিটার।

এ ব্যাপারে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যোতিষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল কেমিক্যাল অর্গানাইজেশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর শর্ট শাটডাউন ও দুই বছর পর পর পুরো প্লান্ট ওভারহোলিং বাধ্যতামূলক। অথচ দীর্ঘ ১০ বছরেও কারখানাটি ওভারহোলিং না করা ও চীনা প্রযুক্তির নিম্নমানের ট্যাংকই অ্যামোনিয়া গ্যাস বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ।’

এদিকে এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও চট্টগ্রাম নগরীর অর্ধশতাধিক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাণী ও উদ্ভিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এরই মধ্যে মাছ, সাপ, পাখি, গরুসহ অনেক প্রাণী মারা গেছে।

ট্যাংকার বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুই কমিটির সদস্যরা মঙ্গলবার বিকেলে ডিএপি কারখানায় একযোগে প্রবেশ করে ঘটনা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

কমিটি দুটির একটি গঠন করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। দশ সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক হলেন সংস্থাটির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) আলী আক্কাছ, সদস্য সচিব হচ্ছেন চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তাহের ভূঁইয়া। এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রদান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদকে।

বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ বলছে, অ্যামেনিয়া গ্যাস নিঃসরণ প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এখন গ্যাস নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিঁটানো পানির কারণে আশাপাশের এলাকায় যাতে কোনো ধরনের দূষণ না ছড়ায় সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।