মেইন ম্যেনু

মহানুভবতার দৃষ্টান্ত : শিশু শাহাদাত পেল নতুন জীবন

শিশুদের নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনায় গোটা দেশ যখন উত্তাল, ঠিক তখনই কিছু মহানুভব মানুষের কল্যাণে নতুন জীবন ফিরে পেল এক শিশু।

মাত্র চারদিন আগেও জীবন সংশয়ে থাকা সাত বছরের শাহাদাত এখন প্রাণোচ্ছ্বল। সফল ওপেন হার্ট সার্জারির মাধ্যমে শিশুটি এখন শঙ্কামুক্ত।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পূর্ব খৈয়াছড়া গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম শিশু শাহাদাতের। সে আর তার বড় ভাই দুটো ছেলেকে নিয়ে অভাবে দিন কাটান তাজুল-সালমা দম্পতি। তাদের ভাঙা ঘরে সুখ তো অধরাই, উল্টো অভিশাপ হয়ে নেমে আসে শাহাদাতের জীবন শঙ্কা। স্বাভাবিক চলাফেরা আর বেড়ে উঠতে ব্যর্থ শাহাদাতের শরীরে ধরা পড়ে জন্মগত ব্যাধি- হৃদপিণ্ডের ছিদ্র।

জটিল অপারেশনে প্রায় দেড় লাখ টাকা লাগবে শুনে ভেঙে পড়ে অসহায় হতদরিদ্র পরিবারটি। ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখার আশা একপর্যায়ে ছেড়েই দিয়েছিলেন সালমা। এখন সেই ছেলেই নতুন জীবন পেয়েছে। কিছু মহানুভব মানুষের সহায়তায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারের পর শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।

খবর নিয়ে জানা যায়, শাহাদাতের জীবন শঙ্কার বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকরা বিভিন্ন পত্রিকায় তুলে ধরেন। একপর্যায়ে শাহাদাতের অস্ত্রোপচারের তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর ঢাকার স্টাফ রিপোর্টার জয়নাল আবেদীন। মাত্র এক সপ্তাহের প্রচেষ্টায় তিনি শাহাদাতের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করে ফেলেন।

শাহাদাতের সফল অস্ত্রোপচারের পর এক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘অসহায় শিশুটির জীবন বাঁচানোর কৃতিত্ব আমার একার নয়। আমাদের অনেকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে।

জানা গেছে, শাহাদাতের অসহায় মায়ের আর্তনাদ, কায়িক শ্রমে অক্ষম বাবার প্রতিবন্ধকতা এবং শাহাদাতের দুরারোগ্য ব্যাধির মানবিক গল্প সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে তুলে ধরেন সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন। অল্প সময়ের মধ্যে দেশ-বিদেশের অনেক ব্যক্তি তার আহ্বানে সাড়া দেন। এরপর তিনি শিশুটির অস্ত্রোপচারের মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

গত ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে শিশু শাহাদাতের ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন হয়। জটিল এ অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন হাসপাতালের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সারওয়ার আলম।

তিনি বলেন, ‘এটি শাহাদাতের জন্মগত সমস্যা। এ ধরনের সমস্যায় প্রতিবছর অনেক শিশু মারা যায়। সময় মতো শাহাদাতের অস্ত্রোপচার না হলে বিপদ হতে পারত।

বৃহস্পতিবার হাসপাতালের ৮০৬ নাম্বার কেবিনে গিয়ে দেখা যায়, সদ্য অস্ত্রোপচার হওয়া শিশুটি অনেকটাই প্রাণবন্ত। বিছানায় বসে সে খেলছিল। মা-ছেলের মুখে যেন বিশ্বজয়ের হাসি। অথচ এই মায়ের মুখটাই হতাশায় কালো ছিল কিছুদিন আগেও। নিয়তির সেই ঘোর কাটিয়ে তার মনে এখন রাজ্যের খুশি।

শাহাদাতের মা সালমা আক্তার বলেন, অপারেশনে এত বড় অংকের টাকা প্রয়োজন শুনে আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সবাই এগিয়ে না এলে আমার ছেলে বিনা চিকিৎসায় মারা যেত। এখন আমার অনেক ভালো লাগছে।

শিশুটির মামা জাফর আহম্মেদ বলেন, জয়নাল আবেদীন এ উদ্যোগ না নিলে হয়তো আজ শাহাদাতের অপারেশন হতো না। এ ছাড়া সবাই যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাতে আমরা চির কৃতজ্ঞ।

জানা গেছে, শিশুটির চিকিৎসা এবং চিকিৎসা পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য তহবিল গঠনে বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রবাসীরা এগিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে কুয়েত স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছানাউল করিম, সৌদি আরব থেকে শহিদুল ইসলাম খোকন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সাইদুল ইসলাম সাঈদ, এরশাদ নূরসহ অনেকে অনুদান দিয়েছেন।

এ ছাড়া পেনিনসুলা চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, জমজম সুইটস এন্ড বেকার্সের চেয়ারম্যান সেলিম খায়েরসহ অসংখ্য মানুষ শাহাদাতের চিকিৎসায় এগিয়ে আসেন। মঈনুল হাসান টিপু, রিয়াজ সজিবসহ অনেকে রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করেন। আরো নানাভাবে এগিয়ে আসেন সাংবাদিক এম মাঈন উদ্দিন, রাজীব, সাজ্জাদ, রবিসহ আরো অনেকে।

শুধু অস্ত্রোপচারেই শেষ নয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকের মাধ্যমে সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন এ প্রজন্মের তরুণদের একত্রিত করছেন। তিনি নিজের বন্ধু-শুভাকাঙ্খীদের মাধ্যমে শিশু শাহাদাতের সারাজীবনের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণাও দেন। এরই মধ্যে অনেকে শাহাদাতকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। নিজ পেশাগত দায়িত্বের বাইরে এসে শিশু শাহাদাতের চিকিৎসার মাধ্যমে নতুন জীবন উপহার দিয়ে মহানুভবতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন ও তার মাধ্যমে অন্যান্য মহানুভব তরুন প্রজন্ম।