মেইন ম্যেনু

মানব জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য

‘মাতৃভাষা বাংলা ভাষা আল্লাহর সেরা দান।’ মানুষের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার এবং মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। তাইতো ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি ও ভাষা।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা সুরা রূমের ২২ নং আয়াতে উল্লেখ করেন, ‘আর মহান আল্লাহর নিদর্শসমূহ হতে (একটি নিদর্শন হলো) আসমান ও জমিন সৃষ্টি এবং মানুষের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। এর মধ্যে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য উপদেশ রয়েছে।’

আবার মানুষকে দুনিয়ার গোমরাহী থেকে সত্যের পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অনেক নবি রাসুল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রত্যেককেই তিনি স্বজাতির ভাষায় সত্য বিধানসহ এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যাতে তাঁরা মানুষের মাঝে তাওহিদের প্রচার-প্রসারের কাজ সহজে করতে পারে।

তাইতো আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবি-রাসুলকেই তার গোত্রের ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেন, ‘আর আমি প্রত্যেক পয়গম্বরকেই (নবি-রাসুলগণকে) স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে করে তাদের পরিষ্কার (আল্লাহর বিধান) বুঝাতে পারে। (সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৪)

বাঙালি ও বাংলাদেশীদের মুখের ভাষা, প্রাণের ভাষা, আত্মার বন্ধনের ভাষা তথা রাষ্ট্রীয় ভাষা হলো বাংলা ভাষা। মাতৃভাষা বাংলার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অস্ত্রের মুখে গর্জে উঠেছিল এদেশের সূর্য সন্তান সালাম, রফিক ও জাব্বার-বরকতদের মতো একদল দেশপ্রেমী মর্দে মুজাহিদ।

আজকে আমাদের মুখের ভাষা বাংলা ভাষা তাদের আত্মত্যাগেরই অবদান। যার ফলশ্রুতিতে আজ বাংলা ভাষায় ইসলাম ও মুসলিমদের তাহজিব তমদ্দুনের দাওয়াত, প্রচার-প্রসারে আমরা দ্বীনের দাওয়াত ও কুরআনের বাণী পৌঁছে দিতে সক্ষম। এটা মাতৃভাষা বাংলার এক মহা সফলতা।

ভাষার গুরুত্বের প্রয়োজনীয়তা আমরা কুরআনেই দেখতে পাই। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম ভাষার গুরুত্ব উপলব্দি করে সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় কথাবার্তা বলার জন্য তার ভাই হজরত হারুন আলাইহিস সালামকে নিজের সঙ্গী করার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন।

কারণ তিনি উপলব্দি করেছিলেন যে, সুন্দর ও প্রাঞ্জল ভাষায় আল্লাহর একত্মবাদ ও দ্বীনের বক্তব্যকে উত্তম বচন ভঙ্গিতে তৎকালীন সম্রাট ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গীদের নিকট তুলে ধরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

হজরত মুসা আলাইহিস সালামের এ বিষয়টিকে আল্লাহ তাআলা কুরআনে এভাবে উল্লেখ করেন, ‘আমার ভাই হারুন, তিনি আমার থেকে অনেক বেশি প্রাঞ্জল ভাষী। তাই আপনি তাকে আমার সহযোগী করে প্রেরণ করুন; যাতে সে আমাকে (দাওয়াতের ক্ষেত্রে তার প্রাঞ্জল ভাষার দ্বারা) সত্যায়িত করে। কেননা আমি আশঙ্কা করছি (আমার বক্তব্য সত্য হওয়া সত্বেও) তারা আমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে।’ (সুরা কাসাস : আয়াত ৩৪)

ভাষার গুরুত্ব অত্যধিক হওয়ায় আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা আলাইহিস সালামের ওপর তাওরাত অবতীর্ণ করেছেন হিব্রু ভাষায়, ইউনানি ভাষায় যাবুর অবতীর্ণ করেছেন পয়গাম্বর হজরত দাউদ আলাইহিস সালামের ওপর, আর হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের ওপর ইঞ্জিল অবতীর্ণ করেছেন সুরিয়ানি ভাষায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও মায়ের ভাষায় কথা বলতে গর্ববোধ করতেন। তিনি বলতেন, ‘আরবদের মধ্যে আমার ভাষা সর্বাধিক সুন্দর। তোমাদের চেয়েও আমার ভাষা অধিকতর মার্জিত ও সুফলিত।’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে উন্নত ও মার্জিত ভাষায় কথা বলতেন। কারণ তিনি আরবের সবচেয়ে মার্জিত ভাষার অধিকারী সাদিয়া গোত্রে (শিশুকাল ভাষা রপ্ত করার সময়) লালিত পালিত হয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি বলতেন, ‘আমি সর্বাধিক সুফলিত ভাষায় আমার ভাব বিনিময় করছি।’

সুতরাং মাতৃভাষা মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার সেরা দান বা অনুগ্রহ। তাইতো ভাষা নিয়ে গর্ব করা যায়। মাতৃভাষার চর্চা ও একে উন্নত করার অধিকার সবার একান্ত কর্তব্য। মাতৃভাষা চর্চা ও রক্ষাও প্রত্যেকের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব।

বিশ্বনবির হাদিস মতে, ভাষা শহীদদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা সদকায়ে জারিয়ার মতো কাজ। হাদিসে এসেছে, ‘যদি কেউ কোনো সদকায়ে জারিয়ার মত সৎকর্ম সম্পাদন করে, তাহলে যত প্রাণী তা থেকে উপকৃত হবে, সে ওইসব মানুষের নেকির একটি অংশ পেয়ে যাবে। (মুসলিম)

হাদিসের বর্ণনা মতে, আজ যারা বাংলা ভাষায় স্বাধীনভাবে কুরআন-হাদিসের খেদমত করছেন, ওয়াজ-মাহফিল ও ইসলামি আলোচনাসহ যত ভালো কাজ করছেন এর একটি অংশ ভাষা শহীদদের নিকট অবশ্যই পৌঁছে যাচ্ছে।

আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা সমগ্র জাতির হেদায়েতের জন্য আলোর দিশারী হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ করেন তাঁর স্বজাতি ভাষা ‘আরবি ভাষায়’।

বাংলা ভাষার জন্য আত্মদানকারী সালাম, রফিক, জাব্বার বরকতসহ নাম না জানা অসংখ্য আত্মদানকারী ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব জনতার আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। যে ভাষা আমাদের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার ও দান।

কেননা এ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে কুরআনের হাদিসের অগণিত অসংখ্য কপি। রয়েছে দেশ ও বিশ্বব্যাপী ভরপুর ইসলামি সাহিত্যের ভাণ্ডার। রচিত হয়েছে কুরআনে হাদিসে ব্যাখ্যা গ্রন্থসহ অসংখ্য ইসলামি সংকলন, যা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য আল্লাহ অশেষ রহমত।

সুতরাং যারা ভাষার জন্য বুকের তাঁজা রক্তকে এ জমিন ঢেলে দিয়েছেন, আজকের এই দিনে ওই সব ভাষা শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা করাও ঈমানের দাবি।

পরিশেষে…
কুরআন হাদিসের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। দেশপ্রেম যেমন ঈমানের অংশ, ঠিক মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থাকাও ঈমানের অপরিহার্য বিষয়।

তাই দেশের সব নাগরিকের উচিত, ব্যক্তি, জাতি ও দেশ মাতৃকার জন্য, ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার প্রয়োজনে সবাইকে এক ও অভিন্ন থাকা।

আল্লাহ তাআলা বাংলা ভাষাভাষী সবাইকে মাতৃভাষার প্রশ্নের এক কাতারে শামিল থাকার তাওফিক দান করুন। বাংলা ভাষাভাষী সবাইকে ভাষার গুরুত্ব উপলব্দি করে তাঁর মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ তাআলা সব ভাষা শহীদদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।