মেইন ম্যেনু

মানসিক হাসপাতালে মেধাবী ছাত্র

মানসিক হাসপাতাল শুনলেই মানসপটে সাধারণ কিছু চিত্র ভেসে ওঠে। শৃঙ্খলিত জীবন, বৈদ্যুতিক শক, অনাহারে থাকা, শিকল দিয়ে বাঁধা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, হিংস্রতা ইত্যাদি ইত্যাদি। তেমনি এ নিউজের প্রতিবেদকের মধ্যেও কমবেশি এ ধারণাই ছিল। তাই সম্প্রতি পাবনা মানসিক হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শনে যান তিনি। পরবর্তী ঘটনা শুনুন প্রতিবেদকে নিজের মুখেই।মানসিক হাসপাতালে গিয়ে গেট দিয়ে ডুকে ভিতরে হাটতে লাগলাম, একটু সামনে এগুতেই দেখি ডান পাশ্বে জানালার কাছে অনেক মানুষ ভিড় করে দাড়িয়ে আছে।

আমার সেটা দেখে একদিকে যেমন কৌতুহল হলো অন্যদিকে মনের ভিতর একটু ভয়ও কাজ করছিল। তবুও তাদের কাছে গিয়ে পিছনে দাড়িয়ে রইলাম, দেখি সবাই মানসিক রোগীদের কে বিভিন্ন কিছু প্রশ্ন করছিল আর তখন ঝটপট কথাগুলোর স্পর্ষ্ট ভাবে উত্তর ও মাঝে মাঝে ইংরেজী ভাষাও ব্যবহার করছিল সেখানে থাকা তরুণ এক মানসিক রোগী। আমি তার কথা গুলো শুনেই পুরাই টাশকি খেয়ে গেলাম। পরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো একে একে সবাই চলে গেল এখন হাসপাতাল একদম ঠিক নীরব হয়ে গেছে।

তখন আমি তার কাছে যেতে না যেতেই একটি সালাম দিল, সালামের জবাব দিয়ে জানালার কাছে গেলাম। তখন সে আমার সাথে কূশলাদি বিনিময় করে গান গেতে গেতে ১০টাকা চাইলো। যেই টাকা দিব তখন এক লোক এসে বললো এরা মানসিক রোগী তারা যাকে দেখে তাদের কাছেই টাকা চায়। এবং একজনকে টাকা দিলে সবাইকে দিতে হবে, কথাটা শুনে টাকা টা না দিয়ে দাড়িয়ে রইলাম।পরে বললাম ভাই আপনার বাড়ি কোথায় সে বললো টাঙ্গাইলের করটিয়া।

আমি বললাম আমার বাড়িও তো টাঙ্গাইলে। তখন সে একই জেলার লোক এবং আমার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে একটু খুশি হয়ে ভালভাবে কথা বলতে লাগলো, সে বললো ভাই এখন আমি আর পাগল নই, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছি। তবে পাগলের অভিনয় করে যাচ্ছি নিয়মিত। সেটা শুনে পিছনের ঘটনা জানতে চাইলাম তার কাছে, সে বললো টাঙ্গাইলের করটিয়া গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের জাল মাছুদ নামের এক পিতার তৃতীয় সন্তান তিনি তার নাম মো. ইমরান হোসেন (২২)। সে করটিয়া সরকারি সাদাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ৩য় বর্ষের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। তার জীবনে ছোট থেকে অনেক স্বপ্নও ছিল বটে। কিন্তু হঠাত্‍ করে সব এলোমেলো হয়ে গেল। তিনি জানান সে রাত জেগে প্রচুর লেখাপড়া করতেন অন্যদিকে দিনে প্রাইভেট পড়াতেন ও নিয়মিত কলেজে ক্লাস করতেন। র্দীর্ঘ দিন এভাবেই চলতে থাকে তার।

পরে গত দুই মাস আগে থেকে দেখা দেয় তার মাথায় প্রচন্ড সমস্যা। রাতে কখনো ঘুমাতে পারেনি সে, মানুষের সাথে ঠিক ভাবে কথাও বলতে পারেনি। এক প্রকার পাগল হয়ে গিয়েছিল সে। তাই তার বড় ভাই তাকে দেড় মাস আগে এখানে ভর্তি করায়। তবে আল্লাহ তালার রহমতে এবং ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ সে পুরোপুরি সুস্থ। এই মাসের শেষের দিকে সে বাড়িতে চলে যাবে। তার কথা গুলো শুনে আবেগপ্লাবন হয়ে গেলাম আমি পরে বললাম এখান থেকে গিয়ে কি লেখাপড়া শুরু করবেন। সে ঝট করে বলে ফেলল যে লেখাপড়া মানুষকে পাগল বানায় সেই লেখাপড়া আর করবো না কখনো। বাড়ি গিয়ে ভাল একটা ব্যাবসা শুরু করবো।

এই কথা বলতে বলতেই ভিতর থেকে ডাক্তারের ডাক পড়লো, বললো ভাই চলি ডাক পড়েছে। তখন বললাম একটা ছবি নেওয়া যাবে আপনার, সে সঙ্গে সঙ্গে বললো নেন। কথা গুলোর শেষ মুহুর্তে টাকা দিতে চাইলাম সে বললো না ভাই, আপনি একই জেলার লোক আপনার সাথে কথা বললাম এতে অনেক ভাল লাগলো। পরে জানালা দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে তার হাতে হাত রেখে বললাম চলি ভাই বেচে থাকলে দেখা হবে।

এভাবেই শেষ হলো তার সাথে কথা।পরে ওখান থেকে এসে পরলাম, তারপর হাসপাতালের পেছনের ইতিহাস শোনালেন দায়িত্বরত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এক ডাক্তার। পাবনা মহকুমার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা.হোসেন গাঙ্গুলির অনুপ্রেরণা ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলে ১৯৫৭ সালে পাবনা শহরের অদূরেশীতলাই হাউসে ৬০টি বেড নিয়েপাবনা মানসিক হাসপাতালেরযাত্রা শুরু। পরবর্তীতে ১৯৬৬সালে পাবনার হেমায়েতপুরের শ্রীশ্রী অনুকূল ঠাকুরের আশ্রমেরপাশে ১১১ একর জায়গা জুড়ে একমনোরোম পরিবেশে ২০০টি বেডনিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে এটি ৪০০ এবং সময়ের আবর্তনে বর্তমানে ৫০০ বেডের একটি পুর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।

সম্প্রতি মানসিক হাসপাতালের জায়গায় স্থাপিত হয়েছে আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। অবকাঠামো ও সুযোগ সুবিধাবর্তমানে হাসপাতালটিতে ৪ জনসাইক্রিয়াটিস্ট, ১ জন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, ৩ জন সাইক্রিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কার কাজ করছেন। হাসপাতালটি আউটডোর ও ইনডোর দু’ভাগে বিভক্ত। আউটডোরে সব ধরনের রোগী দেখা হয় এবং ইনডোরে রোগীভর্তি করা হয়। এই হাসপাতালেবর্তমানে ১৮টি ওয়ার্ড রয়েছে,যার মধ্যে ১৩টি পুরুষ এবং ৫টিমহিলা। পুরুষ ওয়ার্ডের মধ্যে ২টিপেয়িং ওয়ার্ড। এর ১টি বরাদ্দমাদকাসক্ত রোগীর জন্য, অন্যটি জেনারেল ওয়ার্ড। মহিলা ওয়ার্ড গুলোর মধ্যে ৪ টি বিনামূল্যে আর ১টি পেয়িং।

মোট তিনটি পেয়িং ওয়ার্ডে বেডের সংখ্যা ১৫০। অর্থাৎ ৩৫০টি বেডই বিনামূল্যে রোগীদের জন্য। প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীদেরবিনোদনের জন্য রয়েছে ডিস সংযোগ সহ রঙিন টেলিভিশন।সবার জন্য আছে চারবেলা উন্নতপরিবেশে রান্না করা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা।

ইনডোরে ভর্তিকৃত রোগীরা সুস্থ হলে তাদের অকুপেশনাল ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ যেমন, তাতের কাজ, কাঠের কাজ, সেলাই ও কম্পিউটার চালানো, দেয়া হয়।সাথে খেলাধূলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা তো রয়েছেই। অতিরিক্ত পড়াশোনা’য় এক মেধাবী শিক্ষার্থী মানসিক হাসপাতালে ভর্তিঅতিরিক্ত পড়াশোনা’য় এক মেধাবী শিক্ষার্থী মানসিক হাসপাতালে ভর্তি