মেইন ম্যেনু

মানুষের রক্ত চুষে খায় যে মানুষ

নিউ অরলিন্সের ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারে একটা ভোজের আয়োজন হতে যাচ্ছে। ভোজ না বলে এটাকে ভক্ষণ কিংবা চোষণ বলা যেতে পারে। জন এডগার এই চোষণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রক্রিয়া শুরু হবে মেডিকেলের নিয়মকানুন মেনেই। ব্রাউনিংয়ের সহকারি প্রথমে এক টুকরো তুলোতে এলকোহল মিশিয়ে সেটা দিয়ে তার কাঁধের কাছে এক জায়গায় ভালো করে মুছে দিলেন। তারপর অস্ত্রোপচার করার একটা ছুরি দিয়ে চাপ দিলেন মাংসপেশিতে। রক্ত বেরিয়ে পড়লো সাথে সাথে এবং তিনি ঠোট চেপে ধরলেন ক্ষতস্থানে। জোঁকের মত চুষে পান করতে শুরু করলেন রেড ওয়াইনের মত গাঢ় তরল।

এটা বেশ কিছুদিন আগের কথা। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্রাউনিং বলেন, ‘ঐ লোক বেশ কয়েকবার এইভাবে পান করার পর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে সুন্দর ভাবে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।’ তবে তার রক্ত চুষে চোষক খুব একটা স্বাদ পান নি। ব্রাউনিং বলেন, ‘উনি আমাকে বলেছেন আমার রক্ত নাকি যতটা ধাতব হওয়ার কথা ততটা ধাতব না। যে কারণে খানিকটা হতাশ হয়েছিলেন।’

আপাতদৃষ্টিতে খাদ্য, পানি এবং রক্তের গ্রুপের উপরে স্বাদে সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হয়। যাই হোক, ভোজন শেষ করে তারা দুজন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে বাইরে বেরুলেন এবং গৃহহীনদের সহায়তায় একটি জনহিতৈষী অনুষ্ঠানে গিয়ে যোগ দিলেন রাতের খাবার খাওয়ার জন্য।

কিছু মানুষ আছে যারা শরীরে সুঁই ফোঁটাতে কিংবা কাটাছেড়া করতে ভয় পান। এই ভয়ে তারা এমনকি চিকিৎসার সময়ও ইঞ্জেকশান কিংবা স্যালাইন নিতে রাজি হন না। ব্রাউনিংয়েরও এই ভীতি আছে। নিজের শরীর ফুটো করে অন্যকে রক্ত খাওয়ানোর ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিলো না। কিন্তু কাজটা তিনি মোটেও সখের বশে করেন নি।

ব্রাউনিং যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক। কেবলমাত্র গবেষণার স্বার্থেই তার এ কাজ করা। গবেষণার বিষয় হচ্ছে, নিউঅরলিন্সের ‘রিয়াল ভ্যাম্পায়ার’ বা ‘আসল ভ্যাম্পায়ার’ নামের একটি সম্প্রদায়। ব্রাউনিং দেখতে চেয়েছিলেন, এই রিয়াল ভ্যাম্পায়াররা আসলে কতটা রিয়াল। ভ্যাম্পায়ারদের এই রক্ত চোষার ব্যাপারটা আসলে কি? এটা কি কোন ধর্মীয় রীতি, মোহ নাকি আরাধ্য কিছু একটা?

বাস্তবে কোনো ভ্যাম্পায়ারের দেখা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ব্রাউনিংয়ের ধারণা ছিল, ভ্যাম্পায়ারা হচ্ছে বাস্তব এবং কল্পনার মাঝামাঝি ক্ষ্যাপাটে কোন প্রাণী যাদের সময় কাটে লেখিকা অ্যানা রিচের লেখা বর্বর টাইপের উপন্যাস পড়ে।

কিন্তু নিজেকে রক্ত দাতা হিসেবে প্রস্তাব দেয়ার পর তার ধারণা আমুল বদলে গেলো। কারণ বেশিরভাগ বাস্তব জীবনের ভ্যাম্পায়ারদের অধিভৌতিক কোন কিছুতে বিশ্বাস নেই, তারা কাল্পনিক রক্তখেকো ড্রাকুলা নয়, এমনকি তাদের নেই কোন মানসিক বিকার। কিন্তু তারা দাবি করেন, তাদের একটি অদ্ভুত শারীরিক সমস্যা রয়েছে। সেটা হচ্ছে- অবসাদ, মাথা ব্যথা ও তীব্র পেটে ব্যথা। তারা বিশ্বাস করেন এই অদ্ভুত সমস্যার একটাই মাত্র চিকিৎসা- সেটা হচ্ছে মানুষের রক্ত পান করা।

ব্রাউনিং বলেন, ‘শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই কয়েক হাজার মানুষ এই কাজ করছে। আমার কাছে মনে হয় না এটা কাকতালীয় ঘটনা কিংবা ক্ষ্যাপামি। তাদের উপসর্গ এবং আচরণ আসলেই রহস্যজনক।’

বেশিভাগ মানুষের কাছেই বাস্তবের ভ্যাম্পায়ার নিষিদ্ধ একটা জিনিস। মানুষ হয়ে মানুষের রক্ত পান নিষিদ্ধ একটা কাজগুলোর মধ্যে একটা। যে কারণে ভ্যাম্পায়ার সম্প্রদায় নিজেদের দলের বাইরের কাউকে সহজে গ্রহণ করেন না। মানুষ জানাজানি হলে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। যদিও পরিস্থিতি সবসময় এরকম ছিল না। একটা সময় ছিল যখন মানুষের রক্ত ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো চিকিৎসা কাজে।

যেমন, ১৫শ শতকের শেষদিকে অষ্টম পোপ ইনসেন্টের চিকিৎসক ৩ জন তরুণের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে সেই উষ্ণ রক্ত পান করিয়েছিলেন মুমূর্ষু পোপকে। তিনি ভেবেছিলেন, তরুণ রক্ত পান করালে বৃদ্ধ পোপের শরীরে আবার তারুণ্য ফিরে আসবে। পরবর্তীতে রক্ত ব্যবহার করা হতো এপিলেপসি বা মৃগী রোগের চিকিৎসায়। রক্তকে মনে করা হতো শরীর এবং আত্মার সংযোগকারী হিসেবে। তরুণদের রক্ত পান করলে সেই তারুণ্যের স্থানান্তর ঘটবে এমনটাই ধারণা ছিল। কিন্তু আঠারো এবং উনিশ শতকে মানুষ এনলাইটমেন্ট বা আলোকিত যুগে প্রবেশ করার সাথে সাথে এই ধারণাগুলো বদলে যায়।

শুধু অল্প কিছু মানুষের মধ্যে মানুষের রক্ত পান করার এই চর্চা ঠিকই রয়ে গেছে। পৃথিবীতে ইন্টারনেট আসার আগে এই দলের মানুষগুলো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। কিন্তু এখন অনলাইনে তারা তৈরি করেছে বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক। তবে এই নেটওয়ার্ক খুবই গোপনীয়। তারা নিজেদেরকে শুধু নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান।

বাস্তবের এই ভ্যাম্পায়ারদের জীবনযাত্রা কিন্তু খুবই সাধারণ। মারটিকাস নামের একজন ভ্যাম্পায়ার বলেন, আমাদের সবাই কর্মজীবী মানুষ। অনেকে নিয়মিত গির্জায় গিয়ে ধর্মকর্ম করেন। অনেকেই আছেন হাসপাতালের নার্স কিংবা অফিসের ছাপোষা কর্মচারী। মানুষ যে রকম ভাবে যে, ভ্যাম্পায়াররা হয়তো গোরস্থানে গিয়ে পড়ে থাকে কিংবা অন্ধকারে দল বেঁধে রক্ত খেয়ে পৈশাচিক উল্লাস করে, সেইরকম কিছুই না। আমাদের মধ্যে এমনও দল রয়েছে যারা গৃহহীনদের খাওয়ায়, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ করে এবং সামাজিক আরও অন্যান্য জনহিতৈষী কাজ করে।

তবে এই ভ্যাম্পায়ারদের মধ্যে দুটো দল আছে। একদল বিশ্বাস করেন রক্ত তাদের আত্মাকে শক্তি দেয়, অন্যদল মনে করেন এটা শারীরিক শক্তি যোগায়। ব্যাপারটাকে তারা খুবই সাধারণভাবে নিয়েছেন। ‘ভ্যাম্পায়ার’ শব্দটা তাদের কাছে বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না। কিন্তু যেহেতু তারা মানুষের রক্ত পান করেন, সেহেতু ‘ভ্যাম্পায়ার’ শব্দটা বাদ দেয়াও তাদের পক্ষে অসম্ভব।

গবেষণা করতে গিয়ে ব্রাউনিং আবিষ্কার করেছেন, এদের রক্ত পান করার ইচ্ছাটা জেগে ওঠে বয়ঃসন্ধির সময়ে। ব্রাউনিং যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেছে, ১৩ বছর বয়সে তিনি এক ধরনের শারীরিক দুর্বলতায় ভুগতে শুরু করেছিলেন। একদিন তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে মারামারির এক পর্যায়ে রক্তপাত হলে প্রথম রক্ত পানের অভিজ্ঞতা হয় তার এবং তারপরই তার দুর্বলতা কেটে যায়। এরপর থেকে ব্যাপারটা নেশা হয়ে গেছে।

অন্য ভ্যাম্পায়ারদের ক্ষেত্রেও রক্ত পানের শুরুটা কমবেশি একইরকম অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটেছে। কিন্তু প্রশ হচ্ছে, কিভাবে তারা মিটিয়েছেন রক্তের তৃষ্ণা? কারণ রক্ত দাতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কাউকে গিয়ে বলাও যায় না, আমাকে আপনার রক্ত খেতে দিন!

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্তদাতারা হয় খুবই ঘনিষ্ঠজন। যেমন, কিনেসা নামের এক ভ্যাম্পায়ার রক্ত খায় তার স্বামীর শরীর থেকে। অনেকে আবার রক্তদাতাকে টাকা দিয়ে কাজ সারেন। তবে কিনেসা বলেছেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে রক্তদাতাকে কোনভাবেই আঘাত না করা। রক্তদাতা যেন স্বেচ্ছায় এবং শান্তচিত্তে রক্ত দেয় সেটাই আমরা সবসময় প্রাধান্য দিই।’

রক্তদাতা হিসেবে ব্রাউনিং নিজেও এটা খেয়াল করেছেন। কারণ রক্ত দেয়ার আগে তাকে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। তাছাড়া রক্ত পানের প্রক্রিয়াটাও মেডিকেল নিয়ম অনুসারে হয়। যিনি রক্ত পান করেন তাকেও পরীক্ষা করতে হয়। দাতব্রাশ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে তবেই শুরু হয় ভোজন। ভ্যাম্পায়ারদের স্বাস্থ্যজ্ঞান মারাত্মক। ভোজনের আগে আয়োজনই বেশি।

ভ্যাম্পায়াররা স্বাস্থ্য সচেতন- এটা শুনতেই কেমন অদ্ভুত লাগে! কিন্তু সচেতনতা সত্ত্বেও কেন তারা মানুষের রক্ত খায় সেটা একটা বড় প্রশ্ন? ডাক্তারদের কাছে গিয়ে বিষয়টা খুলে বলে চিকিৎসা গ্রহণ করেন না কেন?

প্রথমত, ডাক্তারদের এটা বলতে তারা ভয় পান। অনেকে বলার পরে বিপদেও পড়েছেন। তাছাড়া ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দেন তাতে তাদের শারীরিক উপসর্গ কমে না। কিনেসা বলেন, যদি কার্যকরী কোনো চিকিৎসা তারা পেতেন, তাহলে অবশ্যই সেটা গ্রহণ করতেন। ব্রাউনিং তার গবেষণায় যাদের সাথে কথা বলেছেন তাদের বেশিরভাগই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, যদি তারা সুস্থ হওয়ার সুযোগ পান।

কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়- তাদের এই রোগটা কোনভাবে শারীরিক না হয়ে, মানসিক হতে পারে কিনা? আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এটা মেনে নিতে এই ভ্যাম্পায়ারদের কোন আপত্তি নেই। মানুষের রক্ত পানের এই ব্যাপারটি যে মানসিক রোগ হতে পারে সেই সম্ভাবনা তারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কারণ মানুষের শরীরের উপরে মস্তিষ্কের দখলই সবচেয়ে বেশি। কাজেই রক্ত খেতে না পারলে যে উপসর্গগুলো তৈরি হচ্ছে, সেটা মানসিক হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।

তবে ব্রাউনিং এবং তার সহকারি মানসিক বিশেষজ্ঞরা যে সমস্ত বাস্তব ভ্যাম্পায়ারদের উপর গবেষণা করেছেন তাদের ভেতরে কোনো মানসিক গোলযোগ দেখতে পান নি। যুক্তি এবং আবেগে তারা আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই। রক্ত পানের ব্যাপারটাকে তারা যুক্তিসঙ্গত ভাবেই নিয়েছে। যদিও ব্যাপারটা একইসাথে অস্বাভাবিক। ভ্যাম্পায়ারদের রক্ত পিপাসার মনস্তত্ত্ব নিয়ে কেন এতদিন পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

হয়তোবা আধুনিক ভ্যাম্পায়ার সম্প্রদায় এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবেন। বহিরাগতদের প্রবেশ করতে দেবেন তাদের দলে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান হবে আরও বেশি করে। পাওয়া যাবে জটিল কিছু প্রশ্নের উত্তর। এ ব্যাপারে কিনেসার পরিচালিত দলটি ইতিমিধ্যেই এগিয়ে এসেছে অনেক। তারা যোগাযোগ স্থাপন করতে শুরু করেছে বাইরের জগতের সাথে। নিজেরদেরকে ভ্যাম্পায়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং চিকিৎসার মাধ্যমে কিভাবে তাদের শারীরিক অভাব পূরণ করা যায় সেটাই তাদের উদ্দেশ্য।

চিকিৎসকরা এই তথাকথিত ভ্যাম্পায়ারদের উপর গবেষণা করে যাই খুঁজে পাক না কেন, ব্রাউনিংয় তার গবেষণা থেকে শিখেছেন, এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে মানুষের মত সম্মান দেয়া উচিৎ। তিনি বলেন, ‘প্রথমে যখন আমি এই কাজ শুরু করেছিলাম, তখন ধরেই নিয়েছিলাম কতোগুলো উদ্ভট আজগবি মানুষের সাথে আমার দেখা হবে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে আমি বুঝেছি, ভ্যাম্পায়ারদের আসলে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা আমাদের সাধারণ মানুষের ভেতর। তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সমস্যা রয়েছে।’

তারা কেমন জীবনযাপন করে সেটা বুঝতে পারছি না বলে, তাদেরকে আমরা অবজ্ঞা কিংবা ঘৃণা করতে পারি না। তারা রহস্যময় কোন শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতায় ভুগছে। এটাই তাদের পরিচয়। আমরা তাদের দুষছি, তাদেরকে বলছি ভ্যাম্পায়ার। কিন্তু তাদের সাথে যা ঘটছে সেটা খুবই বাস্তব একটা সমস্যা। সেটা আমরা যেমন বুঝতে পারছি না, তারাও বুঝতে পারছে না। কিন্তু তারা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছে এর সাথে মোকাবেলা করার জন্য।

বিবিসি অবলম্বনে