মেইন ম্যেনু

মামলার অজুহাতে বেরোবিতে দুই শিক্ষকের ৪ মাস ধরে পদোন্নতি স্থগিত

এইচ.এম নুর আলম, বেরোবি প্রতিনিধি : আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে পদোন্নতিপ্রাপ্ত দুই প্রভাষকের অজ্ঞাতনামা মামলার অজুহাতে সহকারি অধ্যাপকপদে পদোন্নতি স্থগিতের অভিযোগ উঠেছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ফলে ৪ মাসের বেশি সময় ধরে নিজ বিভাগে সহকারি অধ্যাপক পদে যোগদান করতে পারছেন না এই দুই প্রভাষক ।

এছাড়াও গত ৪৪ তম সিন্ডিকেটে গণিত বিভাগের আরেক শিক্ষক ড. আর এম হাফিজুর রহমানকে নিজ বিভাগে অধ্যাপক পদে যোগদান করতে না দেওয়ারও অভিযোগ উঠে প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

পদোন্নতির নীতিমালা অনুসরণে সহকারি অধ্যাপক/ প্রভাষক নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সভার সুপারিশক্রমে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ৪৫ তম সিন্ডিকেটে ১৮ জন শিক্ষককে প্রভাষক থেকে সহকারি অধ্যাপকে পদোন্নতি দিলেও পদোন্নতি স্থগিত করে নিজ পদে যোগদান করতে না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন দুই শিক্ষক ।

অভিযোগকারী শিক্ষক দুইজন হলেন- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাইদুর রহমান ।

অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বরে প্রশাসনিক ভবনে অনুষ্ঠিত ৪৫ তম সিন্ডিকেট সভার উপাচার্য স্বাক্ষরিত কার্য বিবরনীতে বলা হয়,‘তবে…. ক্রমিক নং ৫ এ উল্লিখিত জনাব তাবিউর রহমান প্রধান,প্রভাষক,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বেরোবি,রংপুর ও ক্রমিক নং ৯ এ উল্লিখিত জনাব মোঃ সাইদুর রহমান,প্রভাষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,বেরোবি, রংপুর-এর নামে কোতয়ালি থানার পুলিশ কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় (সূত্রঃ রংপুর কোতয়ালি থানার মামলা নং ০৮, তারিখ: ০৩-০৩-২০১৫ ইং, ধারা-১৪৩ /৩৪১ /১৮৬ /৩৫৩ /৩৩২/৪২৭/৩৪ দ:বি:) অভিযুক্ত হিসেবে সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষ্য প্রমান পাওয়ার বিষয়টি সিন্ডিকেট সভার সদস্যদের গোচরীভূত হলে সংশ্লিষ্ট মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত তাঁর পদোন্নতি স্থগিত রাখার জন্য সিন্ডিকেট সভায় উপস্থিত সকল সদস্য সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।” বিবরণীতে আরো উল্লেখ করা হয়, ‘ফলে প্রভাষক হতে সহকারি অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে পদোন্নতি প্রদানের লক্ষ্যে গঠিত বাছাই বোর্ডের ১৪-০৮-২০১৫ ও ২১-০৮-২০১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত সভার সুপারিশ অনুযায়ী… ১৮ জন শিক্ষককে প্রভাষক থেকে আপগ্রেডেশনের মাধ্যমে সহকারি অধ্যাপক পদে উন্নীত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’ তবে উপাচার্যের সিন্ডিকেট সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা মামলার সূত্র খুঁজতে গিয়ে এর কোনো সত্যতাই পাওয়া যায় নি। উপাচার্য কোতয়ালি থানায় উল্লেখিত শিক্ষকদ্বয়ের নামে যে মামলার কারন দেখিয়ে পদোন্নতি স্থগিত করেছেন সে মামলার বিবরনীতে পদোন্নতি আটকে দেওয়া ঐ দুই শিক্ষকসহ কারো নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

উপাচার্য যে ‘প্রাথমিকভাবে স্বাক্ষ্য প্রমাণ’ পাওয়ার বিষয়টি সভার বিবরনীতে উল্লেখ করেছেন সেখানে অভিযুক্ত কারো নাম পাওয়া যায়নি। মামলাটির তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ফেরদৌস আহমেদ (বর্তমানে মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে আছেন মুহিব্বুল ইসলাম) ০৪-০৩-২০১৫ ইং তারিখে কোতয়ালি থানায় জমা দেওয়া ‘প্রাথমিক তথ্য (থানায় পেশকৃত ফৌজদারী বিধান কোষের ১৫৪ নং ধারায় ধর্তব্য অপরাধ সংক্রান্ত) বিবরনী’তে আসামির নাম ও বাসস্থান/ঠিকানা উল্লেখ করতে গিয়ে “অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জন” বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। সেখানে কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস আই শফিকুল ইসলামের কোতয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায়ও (সূত্র: রংপুর কোতয়ালি থানার জিডি নং-১৩৫ তারিখ-০৩/০৩/২০১৫ খ্রিঃ) ঐ দিন ঘটে যাওয়া ঘটনায় কারো নাম উল্লেখ করা হয় নি। তাঁর দায়ের করা মামলার শেষের দিকে বলা হয়েছে,“ অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জন আসামী একই উদ্দেশ্য সাধন কল্পে বেআইনি জনতায় দলবদ্ধ হইয়া লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করিয়া সাধারণ জখম এবং সরকারি কর্মচারিকে কর্তব্য কাজে বাধা প্রদান করায় আসামীদের বিরুদ্ধে দঃ বিঃ আইনে (সভার বিবরনীতে উল্লেখিত ধারা) তাহাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজুর জন্য অত্র এজাহার দায়ের করিলাম।” এখানে উল্লেখিত অভিযোগনামায় পদোন্নতি আটকে দেওয়া গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান সেলিমসহ অন্য দুইজন শিক্ষকেরও নাম পাওয়া যায় নি।

ভুক্তভোগী শিক্ষকদ্বয় জানিয়েছেন কী কারনে তাঁদের নিজ নিজ বিভাগে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি তা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোরশেদুল আলম রনি (ভারপ্রাপ্ত,সাবেক)কে বারবার ফোন করেও সদুত্তর পাওয়া যায় নি। এ ব্যাপারে সাবেক রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোরশেদ উল আলম রনিকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, “উপাচার্য বলেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এস আই শফিকুল ইসলামের দায়ের করা মামলায় ঐ দুইজনের নাম রয়েছে বলে উপাচার্যের বরাত দিয়ে জানান।” উক্ত শিক্ষকদ্বয়ের নিজ নিজ বিভাগে যোগদান করতে চিঠি না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, “সিন্ডিকেট সদস্যরা তাঁদের পদোন্নতি স্থগিত করেছে।” কোন মামলায় তাঁদের পদোন্নতি আটকানো হয়েছে জিজ্ঞেস করলে কোনো সদুত্তর দেন নি তিনি।

সিন্ডিকেটে পদোন্নতি স্থগিত করার বিষয়ে প্রতিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, “সিন্ডিকেটে আমার পদোন্নতি আটকানো হয়েছে কি না সেটা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিঠির মাধ্যমে এখনো জানানো হয়নি। কী কারনে আমাকে আমার বিভাগে সহকারি অধ্যাপক পদে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি সেটা আমি জানি না।”

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বারবার রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত,সাবেক)কে ফোন দিলে তিনি বলেন, বিষয়টি আলোচনায় আছে। সমাধান হলেই জানাবো। কিন্তু তিনি এখনো পরিস্কারভাবে জানান নি “কী কারনে আমাকে নিজ বিভাগে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি।” জিজ্ঞেস করলে ঐ একই কথা বলেন ভুক্তভোগী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক তাবিউর রহমান প্রধান। উল্লেখিত শিক্ষকদ্বয়ের পদোন্নতি স্থগিতের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সদস্য এবং বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ মতিউর রহমানকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, “উপাচার্য ঐ দুই শিক্ষকের নামে মামলার বিষয়টি সিন্ডিকেটে উথ্থাপন করেছিলেন ।” মামলার কপিতে ঐ দুই শিক্ষকের নাম রয়েছে কি না সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটাতে শিক্ষকের নাম আছে কি না সেটা থানায় গিয়ে দেখা সম্ভব নয় তবে উপাচার্য সভার কার্যবিবরনীতে দু’জনের নামের ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন।”

এ দিকে অজ্ঞাতনামা মামলার অজুহাতে তিন শিক্ষকের পদোন্নতি স্থগিত করায় তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র বর্ম্মণ (সাবেক) বলেন,“আমরা অবিলম্বে শিক্ষকদের পদোন্নতি স্থগিতের কারন জানতে চাই।এ জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।” অবিলম্বে এর সুষ্ঠু সমাধান না হলে বিভিন্ন কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্বাচিত শিক্ষক সমিতি এ ব্যাপারে আলোচনা করে নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য যে,গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে শিক্ষক সমিতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আপগ্রেডেশন, হল, ক্যাফেটেরিয়া চালু, বকেয়া বেতনসহ বেশকিছু দাবির এক পর্যায়ে আন্দোলন-মিছিল এরপর উপাচার্যের পদত্যাগ চায়। সবশেষ পুলিশ ফাঁড়ির সামনে অনশন মঞ্চ তৈরি করে অবস্থান করলে গত ৩ মার্চ কিছু সন্ত্রাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এ হামলার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তৎক্ষণাৎ পার্কের মোড়ে জড়ো হয় এবং এ সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে পুলিশ ঔ দিনই কোতয়ালি থানায় গিয়ে অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে।

মামলাটির বর্তমান অবস্থা খোঁজ নিয়ে জানা যায়,বর্তমানে মামলাটি সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত, কোতয়ালি, রংপুর এ বিচারাধীন রয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে নথিভুক্ত হয় এবং রংপুরের চীপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এটি দেখেন। মামলাটির ২য় তদন্তকারি কর্মকর্তা মুহিব্বুল ইসলাম বুধবার বিকেলে জানান, ‘মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট গত দেড়/দুই মাস আগে প্রদান করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত রিপোর্টে অভিযুক্ত কারো নাম পাওয়া যায়নি।’
মামলাটির পরবর্তী তারিখ আগামী ২৯ মার্চ ধার্য করা হয়েছে বলে জানা গেছে।