মেইন ম্যেনু

মারাত্মক বিষাক্ত ক্ষুদ্র যে প্রাণীটি!

বড়রা রোজ কত রকমের শাসনই না করে ছোটদের। রোদে দৌড়াদৌড়ি করো না, খাবার ফেলে রেখো না, স্কুলের হোমওয়ার্ক সেরে রাখো, সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠো- আরো কত কী! কিন্তু কেন এরকম করে ওরা? ভাবছেন- কেন আবার! ছোটরা যাতে ভালো থাকে, আরেকটু সুরক্ষিত থাকে সেই জন্যেই তো এতকিছু! তবে এবার এমন এক প্রাণীর কথা বলব যাদের মায়েরা ছোটবেলাতেই তাদের বাচ্চাদের শরীরে পুরে দেয় প্রচন্ড বিষাক্ত এক বিষ। আর এই প্রাণীটি হচ্ছে ব্যাঙ! তবে যে সে ব্যাঙ নয়, কলম্বিয়ার বিষাক্ত ব্যাঙ বা পয়জন ফ্রগ!
কলোম্বিয়ার জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত এই ব্যাঙগুলোকে সবাই চেনে গোল্ডেন পয়জন ফ্রগ বা সোনালি বিষের ব্যাঙ নামে। পৃথিবীর সবচাইতে বিষাক্ত প্রাণী হিসেবে খ্যাতি আছে ওদের। খেলনা পুতুলের মতন দেখতে আর শরীরে নানা রকম ঝকমকে রঙ মাখা থাকলেও আদতে ওরা মোটেও সুবিধের নয়। একসাথে দশজন বয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলা ওদের কাছে পানির মতন সহজ। আর তাইতো ওদের এই বিষকে কাজে লাগিয়ে কলোম্বিয়ার জঙ্গলে থাকা মানুষেরা শিকার করে নানারকম পশু-পাখি আর মানুষ! কী করে বিষটা পায় ওরা?

প্রথমে একটা বিষাক্ত ব্যাঙকে কাঠের মাধ্যমে ধরে একটা বদ্ধ পাত্রে বন্দী করে রাখে ওরা। এরপর লম্বা একটা কাঠের টুকরোকে ব্যাঙটার গলার কাছে জমিয়ে রাখা বিষের থলির ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে একটা পায়ের মধ্য দিয়ে বের করে নেয়। এতে করে আস্তে আস্তে সেই কাঠ বেয়ে গলার কাছে জমিয়ে রাখা ব্যাঙটার বিষগুলো নেমে আসে পাত্রের ভেতরে। তবে এতটুকুতেই কিন্তু কাজ শেষ হয় না ওদের। বিষগুলোকে তীরে মেখে তবেই ব্যবহার করে ওরা বিষগুলোকে। একটা ব্যাঙ এর বিষ ওরা ব্যবহার করতে পারে টানা এক বছর অব্দি।

ভাবছেন এত বিষাক্ত ব্যাঙ নিশ্চয়ই অনেক বড়সড় হবে? আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়। বিষাক্ত এই ব্যাঙদের আকার খুব বেশি হলেও ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয় ( ন্যাশনাল জিওগ্রাফি )। কারো কারো আয়তন তো ১.৫ সেন্টিমিটারের বেশি হয়-ই না। শুধু সোনালি বিষের ব্যাঙগুলোই নয়, পয়জন ডার্ট ফ্রগ প্রজাতির সব ব্যাঙ এর আকারই এমন আর বিষও হয় প্রচুর। সোনালি বিষের ব্যাঙ কেবল গলার থলিতে বিষ রাখলেও এই প্রজাতির আরেক ব্যাঙ স্ট্রবেরী ডার্ট পয়জন ব্যাঙ কিন্তু সে তুলনায় আরো ভয়ঙ্কর। বিষ কেবল শরীরের ভেতরেই রাখেনা ওরা, রাখে শরীরের বাইরেও। নিজেদের চামড়াতে বিষ মাখিয়ে রাখে ওরা। ফলে ওদের ছুঁয়ে দিলেও বিপদে পড়তে হয়। তবে সে তুলনায় অ্যান্থনিস পয়জন অ্যারো ফ্রগ কিন্তু খানিকটা কম ভয়ঙ্কর। পেরু আর ইকুয়েডরে বাস করা এই পয়জন ডার্ট ফ্রগ প্রজাতির ব্যাঙেরা গাঢ় লাল আর বাদামি রঙ এর হয়ে থাকে। আর তার মাঝে থাকে হলুদ রঙ এর দাগ। এরা শরীরের বাইরে নয়, ভেতরেই রাখে বিষকে। তবে ঝামেলার ব্যাপার হল ওদের এই বিষটাও কিন্তু মহা সমস্যার। ওটার খানিকটাও যদি কারো শরীরে ঢুকে যায় তাহলে মস্তিষ্ক আর পেশীর ওপর বেশ ভয়াবহ প্রভাব ফেলে সেটা আর শারীরিকভাবে অচলতাসহ এনে দেয় মৃত্যুও।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, পয়জন ডার্ট ফ্রগ প্রজাতির এখনকার ব্যাঙগুলো এমন ভয়াবহ রকমের বিষাক্ত হলেও আগে কিন্তু ওরা এমনটা ছিলোনা। অনেক আগের কথা। তখন না ছিল ওদের গায়ের এত রঙচঙে বাহার, না ছিল এমন তীব্র বিষ। মনে করা হয়. নিজেদেরকে বাঁচাতেই বিষাক্ত পিঁপড়াসহ আরো অনেক বিষাক্ত খাবার খেতে শুরু করে ওরা। ফলে ধীরে ধীরে বিষ ঢুকে যায় ওদের শরীরেও। নিজেদের শরীরের বিষকে ওরা দিয়ে দিতে থাকে বাচ্চাদের শরীরেও। ফলে একটা সময় এসে ব্যাট্রাকোটক্সিন নামক বিষ নিজেদের শরীরে উত্পাদন করতে শুরু করে ওরা ( বিবিসি )। যা কিনা করে তোলে ওদেরকে ভয়ঙ্কর রকমের বিষাক্ত।

তবে যতটাই বিষাক্ত হোক না কেন, এই ব্যাঙগুলো কিন্তু আমাদের পৃথিবীকে সুন্দর আর স্বাভাবিক রাখার জন্যে অনেকটা দরকারী। বিষাক্ত হলেও আজকাল নিজেদের এতটা বিষ দিয়েও বেঁচে থাকতে পারছে না এই পয়জন ডার্ট ফ্রগেরা। মারা যেতে হচ্ছে ওদের মানুষের না ভেবে করা অনেক কাজের জন্যে। এছাড়া নানারকম রোগেও মারা পড়ছে ওরা। পৃথিবীর পরিবেশকে ভালো রাখার জন্যে ওদেরকে টিকিয়ে রাখা খুব দরকার। কিন্তু সেজন্যে কেবল ওদের বিষটুকুই যথেষ্ট নয়। তাই ওদের সাথে সাথে আমাদেরকেও এখন কাজ করতে হবে ওদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যে।