মেইন ম্যেনু

মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ধসের ধাক্কা বাংলাদেশে!

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য হ্রাস এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উদীয়মান শিল্পোন্নত দেশ মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ধস নামতে শুরু করেছে। এর ফলে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। চাকরি হারানোর ভয় রয়েছে তাদের। বহু শ্রমিক ছাঁটাই হতে পারে- এমন আভাস পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মালয়েশিয়ার মুদ্রা রিংগিতের মূল্য ডলারের বিপরীতে আশঙ্কাজনকভাবে পড়ে গেছে, যা বিগত ১৭ বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন।

মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে পতন হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশি শ্রমিক। এই চিন্তা থেকে শ্রমিকরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ হ্রাস করে অর্থ বাঁচাতে শুরু করেছে। তা স্বত্ত্বেও ভীতি কাজ করছে। শ্রমিকরা তাদের আয়ের একটা বড় অংশ দেশে পাঠায়। এতে শেষমেষ রাষ্ট্রেরই লাভ।

ডলারের বিপরীতে বর্তমানে ৪ দশমিক ২০ রিংগিত প্রদান করতে হয়। ছয় মাস আগে ১ ডলারের মূল্য ছিল ৩ রিংগিত।

অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান হ্রাস পেয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধিতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়েছে সবাই।

এখন বাংলাদেশি টাকায় ১ রিংগিতের মূল্য ১৮ টাকা। তিন মাস আগে ছিল ২৪ দশমিক ২৫ টাকা। কমেছে ৬ দশমিক ২৫ টাকা। এই চিত্র আশঙ্কাজনক।

মালয়েশিয়ায় কাজ করে বাংলাদেশি শ্রমিক মোহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি বলেন, ‘চলতি মাসের শুরুর দিকে দেশে আমি ১ হাজার রিংগিত পাঠিয়েছি। এখন তা ভাঙালে ২০ হাজার টাকার কম হবে। কিন্তু তিন মাস আগেও সমপরিমাণ রিংগিতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা হতো।’

অর্থনীতিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ভোগ্যপণ্যের ওপর শতকরা ৬ ভাগ মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এ ছাড়া বাড়িভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সবকিছুর দাম বেড়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন আগের চেয়ে অনেক কমেছে।

বর্তমানে একজন শ্রমিককে ১ হাজার ২০০ রিংগিতের বেশি দিতে চায় না মালিকরা। এতে শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে মালয়েশিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ঠ শংসয় রয়েছে।

মোহাম্মদ ইলিয়াসের মতো ৬ লাখের বেশি শ্রমিক মালয়েশিয়াতে চাকরি করে, তারা দেশে টাকা পাঠায়। বলতে গেলে, তাদের আয়ের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

মালয়েশিয়ার অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে সেটা বাংলাদেশের জন্যই কল্যাণকর। ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়াতে কাজ করে এবং তারা পরিবার ও দেশের জন্য টাকা পাঠায়।

২০১৪-১৫ অর্থ বছরে এই ৬ লক্ষাধিক শ্রমিক দেশে ১৪০ কোটি ডলার পাঠিয়েছে, যা শতকরা ৯ ভাগ রেমিটেন্সের সমান।

সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পরই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক যায় মালয়েশিয়াতে। জনশক্তি রফতানিতে মালয়েশিয়ার অবস্থান তৃতীয়।

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য যদি অব্যাহতভাবে হ্রাস পেতে থাকে, তাহলে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ একেবারেই নেই- এমন আভাস দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

দেশটিতে দুর্নীতি দমন করতে নাজিব রাজাক কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছেন। সরকারি খরচ কমানো হয়েছে। কিস্তু তাতেও কোনো গতি আসছে না।

মেরিল লিঞ্চ ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ চুয়া হাক বিন বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই বিনিয়োগে স্থিতিশীলতা আসছে না। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা নতুন কোনো বিনিয়োগ করছে না। পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত।’

চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ১০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার এমপ্লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন মারফত এ তথ্য জানা যায়।

চলতি অর্থ বছরে আরো শ্রমিক ছাঁটাই হবে, এমন আভাস পাওয়া গেছে। তবে সেটা কী পরিমাণ তা অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

শ্রমিকদের আয় হ্রাস পাচ্ছে, তাদের সুযোগ-সুবিধা কমানো হয়েছে। অতিরিক্ত কাজ করার সুযোগ কমে গেছে। কয়েক লক্ষ শ্রমিক চাকরি হারাবে এমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে, মালয়েশিয়ার সুদিন কি ফুরিয়ে গেছে? এর উত্তর সময় বলে দেবে।

বর্তমানে বহু শ্রমিক কোনো স্থায়ী কাজ পাচ্ছে না। শ্রমিকরা জানে না, কখন কোন কাজ জুটবে তাদের ভাগ্যে। বহু শ্রমিকের ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারাও সংকটের মধ্যে রয়েছে। নতুন ওয়ার্ক পারমিট না পেলে দেশে ফিরতে হবে।

বহু শ্রমিক মাসে ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি কাজ পায় না। এমনও দেখা গেছে, অনেক শ্রমিক মাসে মাত্র ১০ দিন কাজ করছে। বাকি দিনগুলো বেকার বসে থাকতে হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়লে এবং দেশটির অর্থনীতির চাকা সচল না থাকলে সবচেয়ে বিপদে পড়বে বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র : দ্য ডেইলি স্টার, ইয়াহু নিউজ।