মেইন ম্যেনু

মায়ের সামনে বাবার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছিল ‘সেই’ ছেলেটি !

সৈয়দ হাসান ইমাম : মো. আব্দুল জলিল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এখন প্রয়াত। উনি তখন বালুরঘাট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। বালুরঘাট মানে ভারতে রাজশাহী, নওগাঁর বর্ডারে। মুজিবনগর থেকে তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছেলেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য। কারণ তখন তো আমি চলচ্চিত্র নায়ক, আমরা গেলেই ছেলেরা খুব উৎসাহিত হতো। আমি তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদপাঠক এবং নাটক বিভাগের দায়িত্বে। আমি জলিল সাহেবের আমন্ত্রণে বালুরঘাট গিয়েছিলাম। তখন আব্দুল জলিল একটি ছেলেকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটি দেখে রাখুন, রাতে এর সম্পর্কে বলব।’

সেই বালুরঘাট থেকে একটি টিম পাঠানো হয়েছিল রেকি করতে। রেকি মানে- অপারেশন স্পট, পরিবেশ-পরিস্থিতি যাচাই করে আসা কোনো অপরারেশনের আগে। পরিবেশ-পরিস্থিতি কী রকম, কী অবস্থা, সেখানে কেমন করে অপারেশন করা যাবে এটির একটি জরিপ করে আসা। রেকি করতে যাবে ছয়টি ছেলে। যেখানে রেকি করতে যাবে সেই জায়গাটি সেই ছেলেটির গ্রামের পাশে। একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের। ব্রিজটির ওপর দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বর্ডার পর্যন্ত এসে মানুষের ওপর অত্যাচার করছিল। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছিল, পেলে তাদের হত্যা করছিল। সে কারণেই ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি করা হয়। এটিই দেখতে যাবে ছেলেরা, যে কিভাবে অপারেশনটি করা যায়। ওখানে যাওয়ার সময় ওই ছেলেটিকে যেতে দেওয়া হয়নি। কারণ সে স্থানীয় লোক, তাকে হয়ত শনাক্ত করে ফেলবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। সে জন্য ক্যাম্প থেকে তাকে যেতে দেওয়া হয়নি। ছেলেটি তখন সেখানে যারা যাচ্ছিল, তাদের বলে দিয়েছিল, ‘তোরা যদি রাতের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারিস, তাহলে দিনের বেলায় আমার মায়ের কাছে আশ্রয় নিবি।’ ওই ছেলেটি তার বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা দিয়েছিল। যেহেতু রাতের মধ্যে অপারেশন শেষ করতে পারেনি, তাই ভোর হওয়ার আগেই ছেলেটির বাড়িতে তারা যায়। ছেলেটির মাকে ঘুম থেকে উঠায়, সেখানেই আশ্রয় নেয়। ছেলেটির মা খুবই খুশি হয়। ওরা ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা, ছেলের সহযোদ্ধা- তাদের যতটা সম্ভব আপায়ন করার চেষ্টায় তৎপর হলেন তিনি। সকালবেলা উঠে তিনি- রান্নাবান্না করছিলেন। ওদের খাওয়াতে হবে। ওই ছেলেটির বাবা সকালে ওঠে সব জানতে পেরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে খবরটি জানিয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেই বাড়িতে আসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য। মুক্তিযোদ্ধাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে উঠানে সারিবদ্ধ করে ‘সেই’ ছেলেটির বাবা-মায়ের সামনে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে।

এই খবরটি যখন ক্যাম্পে আসে, তখন ওই ক্যাম্প থেকে তার বাবার মৃত্যুদ- ঘোষণা করা হয়। এখন মৃত্যুদ- কার্যকর কে করবে সেই নির্বাচন যখন হচ্ছে, তখন ছেলেটি বলল, আমি যাব। তখন সবাই বলল তোর বাবা, তুই যাবি, না এটা হয় না। তুই থাক, আমাদের থেকে কেউ যাই। তখন ও বলল, না আমিই যাব। আমি গেলে আমার বাবা-মা কেউ সন্দেহ করবে না। আমি এই মৃত্যুদ- কার্যকর করব। তারপর ছেলেটি রাতের অন্ধকারে বাড়িতে যায়। বাড়িতে গিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তোলে বাবা-মাকে। বাবা-মা যখন বেড়িয়ে এসেছে, তখন চাদরের ভেতর থেকে স্টেনগান বের করে মায়ের সামনে বাবার মৃত্যুদ- কার্যকর করেছিল ছেলেটি।

যুদ্ধের অনেকদিন পর আমি যখন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মিটিং করতে রাজশাহীতে গিয়েছিলাম, তখন ওই ছেলেটিকে দেখিয়ে সবাই বলেছিল, এই ‘সেই’ ছেলে। তখন সে প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। খুবই হালকা-পাতলা একটি ছেলে। সাধারণ জীবনযাপন করে। সেই ছেলেটির কথা আজও আমি ভুলতে পারিনি।

সেই ছেলেটির কথা মনে পড়লে আজও আমি বিস্মিত হই। কী ত্যাগ স্বীকার করেছিল বাঙালি জাতি। আপন-পর বিচার করেনি। যারাই পাকিস্তানের পক্ষে গিয়েছিল, তারা যত ঘনিষ্ঠই হোক, যতই নিকট আত্মীয় হোকÑ তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

পরিচিতি : মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
মতামত গ্রহণ : আশিক রহমান
সম্পাদনা : টিপু