মেইন ম্যেনু

মা এক মমতার অাধার

মা! ছোট্ট একটি শব্দ। একটি পৃথিবী। শুধু পৃথিবী নয়, ত্রিভুবন। স্বর্গাদপী গরীয়সী। শুধু একবার মা বলে ডাকলেই এক স্বর্গীয় পুণ্যে হৃদয়-মন অমিয় সুধায় প্লাবিত হয়। মা, ত্রিভুবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। তাই মা-ই বসুন্ধরা, মা-ই ছায়া, মা-ই মায়া। মা এক মমতার অাধার।

মা মানেই নিশ্চয়তা, মা মানেই নিরাপত্তা, মা মানেই অস্তিত্ব, মা মানেই আশ্রয়, মা মানেই অন্ধকারে একবুক ভালোবাসা, স্নেহের অফুরান ভান্ডার। মা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয়, আপনজন।

আসলে কোনো উপমাই মায়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না মা। মা তো মা-ই। সেই মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর একটি বিশেষ দিন আজ। বিশ্ব মা দিবস। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার, এই দিনে বিশ্বের মানুষ বিনম্র চিত্তে মাকে স্মরণ করে।

প্রতিটি মানুষের কাছে তার মা তুলনাহীনা ও অনন্যা। মাকে ভালোবাসা আর তার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধার বিষয়টি পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলোতে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশতের কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মেও মাতৃভক্তি আর তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞান সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। মাকে নিয়ে কবি-গীতিকারসহ বিশিষ্টজনেরা অজস্র ছত্র রচনা করেছেন।

মা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘আমি যা হয়েছি বা যা হতে চাই, তার সবটুকুর জন্যই আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। আমার মায়ের প্রার্থনাগুলো সব সময় আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিল।’ বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক বালজাক বলেছেন, ‘মায়ের হৃদয় হচ্ছে এক গভীর আশ্রয়, সেখানে আপনি সহজেই খুঁজে পাবেন মমতার সুশীতল ছায়া।’ জন গে বলেছেন, ‘মা, মা-ই, তার অন্য কোনো রূপ নেই।’

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মা হচ্ছেন জগজ্জননী। তার চেয়ে শান্তির ঠিকানা আর কোথাও নেই।’ ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন, ‘মাতৃত্বেই সব মায়া-মমতা ও ভালোবাসার শুরু এবং শেষ।’ সনাতন ধর্মে মাকে স্বর্গের থেকেও বড়, মহান ও পবিত্র বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’

মাকে নিয়ে সারা পৃথিবীতে কত ছবি, কত কবিতা, কত গান, কত গল্প, কত ইতিহাস রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিটি মননশীল মানুষ তার মাকে কল্পনা, স্বপ্ন ও বাস্তবতার নানা রঙে, নানা বর্ণে প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাসহ সারা বিশ্বের প্রায় ৬০টির মতো দেশে প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালিত হয়ে আসছে বহু যুগ ধরেই।

উদযাপনে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বড়দিন এবং ভালোবাসা দিবসের পরই মা দিবসের অবস্থান। বিশ্বের একেক দেশে একেক তারিখে মা দিবস পালিত হয়। কেন না দিবসটি উদযাপনের সূত্রপাত বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। তবে বেশির ভাগ দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিনটি পালিত হচ্ছে। দেশভেদে মা দিবস পালনের তারিখে যথেষ্ট পার্থক্য আছে। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মা দিবস পালন করার রীতি এ যুগের নয়। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও অনেক দেশেই এই দিবসটি পালন করা হতো।

খ্রিষ্টের জন্মের অনেক আগে থেকেই মিসর, রোম ও গ্রিসে মা দিবস পালন করা হতো। তবে সে দিবসটা ঠিক আমাদের বর্তমানের মা দিবসের মতো ছিল না। সেটাকে দেবতাদের মায়ের আরাধনা বলা যেতে পারে। সেই সময়ে দেবতাদের মায়েদের (যেমন : দেবী আইসিস, সিবিলি, রিয়া) পূজা করা হতো। এদিকে ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে মা দিবস পালন করা হতো বলে জানা যায়। এটাই ছিল দেব-দেবীদের মা ছাড়া নিজের আসল মাকে নিয়ে মানে রক্ত-মাংসের মাকে নিয়ে মা দিবস। দিবসটি তারা মাদারিং ডে হিসেবে পালন করত। সেদিন সরকারি ছুটিও ছিল।

প্রথম ১৯১১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আমেরিকাজুড়ে পালিত হয় ‘মা দিবস’। সে সময় আমেরিকায় মায়েদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি বিশেষ দিন উদযাপন করা হতো। তারপর ১৯১৪ সালে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। মা দিবস উদযাপনের ধারণাটি প্রথম মাথায় আসে মার্কিন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ডের।

তবে ‘আধুনিক’ মা দিবসের ধারণার প্রবর্তক অ্যান জার্ভিস। শান্তিকর্মী অ্যান জার্ভিস যুদ্ধবিধ্বস্ত আমেরিকার নারীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা নিয়ে প্রচার কাজ শুরু করেছিলেন। ১৮৬৮ সালে তিনি নারীদের সংঘবদ্ধ করেন এবং আমেরিকার কিছু জায়গায় প্রচারণা চালান যে টমেটোর চারা যেন সবাই মা দিবসের পরই রোপণ করেন। তার আগে নয়। অ্যান জার্ভিস দিনটির সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু সফল হতে পারেননি। তবে মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যানা জার্ভিস মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের কাজে হাত দেন। তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন একটি বিশেষ দিন ঠিক করে ‘মা দিবস’টি উদযাপন করার জন্য।

সে লক্ষ্যেই ১৯০৮ সালের ১০ মে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফিটন শহরের সেই চার্চে, যেখানে তার মা অ্যান জার্ভিস রোববার পড়াতেন সেখানে প্রথমবারের মতো দিনটি উদযাপন করেন। এর পর থেকেই আস্তে আস্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিস্তার হতে থাকে চারপাশে এবং একসময় এটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে মা দিবস পালিত হয়। কারণ দিবসটি উদযাপনের সূত্রপাত বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। তবে বেশির ভাগ দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববারেই পালিত হয় দিবসটি।

মা দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মাকে যথাযথ সম্মান দেওয়া, যে মা জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, তাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। মায়ের প্রতি সন্তানের যে ভালোবাসা, তা প্রকাশের সুযোগ হয়ে ওঠে না সিংহভাগ মানুষেরই। মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস সন্তানদের এ সুযোগ করে দেয়। পশ্চিমা বিশ্বে দিবসটির উৎপত্তি; উদযাপনের ঘটাও সেখানে বেশি। বিশ্বের বহু দেশে কেক কেটে মা দিবস উদযাপন করা হয়। উপহার হিসেবে সন্তানেরা মাকে দেয় কার্ড বা চকলেট। তবে মা দিবসের প্রবক্তা আনা জার্ভিস এই বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধী ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে একবার বলেছিলেন, ‘মাকে কার্ড দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর অর্থ হলো, মা তোমার জন্য এত কিছু করেছেন, তাকে দুই কলম লেখার সময় হয় না তোমার? আর যে চকলেট উপহার হিসেবে দাও, তার বেশির ভাগই চলে যায় তোমার পেটে।’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মা দিবস উদযাপিত হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। কিন্তু বাঙালির মাতৃভক্তির ইতিহাস বহু পুরোনো। দুর্যোগ মাথায় নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাঁতরে নদী পার হয়েছিলেন মাকে দেখবেন বলে।

মায়ের ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই, কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নেই। মা তার সন্তানকে বুকভরা ভালোবাসা, প্রাণঢালা আদর বিলিয়ে দিয়ে ধন্য হন। মায়ের মমতার আঁচল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রতিটি মুহূর্তের। তারপরও বিশ্বের সকল মানুষ যাতে একসঙ্গে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে, সে জন্য মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আন্তর্জাতিক মা দিবস। মা দিবসে বিশ্বের সব মায়ের জন্য ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা।