মেইন ম্যেনু

মা হওয়ার অনুভূতি

শামীমা শেলা : বিয়ের সিদ্ধান্তটা ছিল হঠাৎ করে। হুট করে বিয়ে হলো,এর পরই মা হবো এ বিষয়টা মাথায় ছিলনা।

কিন্তু যখন জানতে পারলাম মা হতে যাচ্ছি ,তখন নানা কিছু ভর করেছিল আমার মাথায়। কি হবে,কিভাবে হবে।আর চাকুরিজিবী হিসেবে মনে হচ্ছিল কেরিয়ারের কি হবে।অনেক কাছের মানুষও আমার এসব চিন্তা নিয়ে আমাকে ভুলও বুঝেছে।

কিন্তু বিয়ের সাথে খাপ খাওয়াতে না খাওয়াতেই মা হওয়ার বিষয়টা বোধ হয় অধিকাংশ মেয়ের কাছেই একটি ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়ায়।যাই হোক,তাদেরও ভুল ভেঙ্গেছে পরে।

অবশেষে সব চিন্তা ঝেরে ঝুরে ফেলে শুরু হলো আমার দীর্ঘ নয় মাসের জার্নি।আমার মা যখন আমার মতের বাইরে কিছু বলতো তখন যাতা বলতাম মাকে।বুঝে না বুঝে।

কিন্তু যখন আমার এ জার্নি শুরু হলো তখন বুঝলাম মা হওয়া কতটা কঠিন।কিভাবে একজন মানুষের পেটে জন্ম নেয় আরেকজন মানুষ।খাওয়া,চলাফেরা,কাজ,ঘুম সব কিছুতে এতো কষ্ট হয়, মা না হলে হয়তো কখনো এ কষ্ট টের পেতাম না।যদিও আমার মা, আমার অফিসের কলিগ, বস ,এমনকি এসাইনমেন্টে গেলে অন্য হাউসের কলিগরাও যে পরিমান সাহায্য আমাকে করেছে তা হয়তো খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জুটে।

আর আমার বর যখনই পাশে ছিল রাত জেগে সেবা করেছে আমার।যখন ডাক্তার বললো আমার ওজন অনেক বেড়ে যাওয়াতে বাবুর ওজন অনেক কম।তাই সিজার করাতে হবে তখন সবচাইতে বেশি কষ্ট হচ্ছিল।মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু জেনো না হয়।আমার কিছু হলেও বাবু যাতে ঠিক থাকে।

অটিতে ঢুকানোর সময় মনে হচ্ছিল আমি বাঁচি বা মরি বাবু যাতে সুস্থ হয়েই জন্মা্য়।যদিও এটা মাইনর অপারেশন ছিল তাও কেন জানি মৃত্যুভয় কাজ করছিল।এনএসথেশিয়া দেয়ার পর কিছু বুঝিনাই কি হচ্ছে।ডাক্তারা আমার সাথে গল্প করতে করতেই হঠাৎ মনে হলো কি জেনো ঝাকি দিচ্ছে।

হঠাৎ করেই বাবুর চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ। সাথে সাথে চোখে পানি চলে আসে আমার। তখন আমার নিচে পেট কাটার সেলাই করা হচ্ছে আর আমি বাবুকে দেখে কান্না করছিলাম। ডাক্তাররা বলছিল, না কাঁদতে কিন্তু কেন জানি আটকাতে পারছিলাম না।

প্রথমবার মনে হলো আমার মা এর কাছে আমিও ঠিক এমটাই ছিলাম।অটি থেকে বের করার পর এনএসথেশিয়ার প্রভাবে খিচুনি চলে আসে আমার। কিন্তু এ অবস্থায় যখন আমাকে কেবিনে আনা হয় তখন বাবুকে আমার বিছানার পাশে রাখার সাথে সাথে আমি আবার কাঁদা শুরু করি। সেলাইয়ের ব্যথার কারনে উপর করে বাবুর চেহারা দেখতে পারছিলাম না তাও কষ্ট করে যখন দেখলাম তখন সত্যিই নয় মাসের কষ্ট,অটির কষ্ট সব মাটি হয়ে গেল।

সোনা চাঁদ আমার কোলে।পেটে থাকা অবস্থায় তার লাথি মারার কথা ভেবে তার পায়ের দিকে তাকালাম।এই পা দিয়েই তো কত লাথি মারতো।এই নখ গুলো দিয়েই তো খোঁচা দিতো।সব ভেসে উঠছিল। সত্যই আমার মা বা অন্যদের মায়ের অনুভূতিও নিশ্চয়ই একই।

এর পর কত কমপ্লিকেশন দেখা দিল আমার।কত কষ্ট, কিন্তু চাঁদের চেহারাটা দেখলেই সব মিশে যেত।মনে হতো তারাতারি সুস্থ হতে হবে আমায়।সুস্থ না হলে বাবুকে দেখবে কে।সব মা রাই বুঝি এমন।আজ ১০ দিন হলো আমার চাঁদের বয়স।ও যখন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে দুনিয়ার সব কিছু আমার কাছে ফিকে মনে হয়।

এ জন্যই হয়তো সবাই বলে নাড়ী ছেঁড়া ধন। মা ,আজ নিজে মা হয়ে বুঝলাম কেন আমরা না খেলে তুমিও না খেয়ে থাকো।কেন হাজার খারাপ ব্যবহার করার পরও তুমি আবার বুকে টেনে নাও।

মা হওয়া কতটা শান্তির,কতটা কষ্টের তা একজন মা ই বোঝে।