মেইন ম্যেনু

মিয়ানমারকে কড়া বার্তা দেবে বাংলাদেশ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত অক্টোবরে সশস্ত্র বাহিনীর অভিযানের পর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুরু হলে সমস্যাটি নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এতে সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। রাখাইনের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আলোচনার জন্য বিশেষ দূত পাঠিয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে এবং রাখাইনের লোকজনের সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে কড়া বার্তা দেবে বাংলাদেশ।

তবে ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, মিয়ানমার যেহেতু আন্তর্জাতিক চাপের কারণে আলোচনায় বসছে, তাই দেশটির আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির বিশেষ দূত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিউ তিন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। তিনি আজ বুধবার দুপুরে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। গত অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সশস্ত্র বাহিনীর নিধনযজ্ঞ শুরুর পর নতুন করে অনুপ্রবেশ করেছে আরও প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা। গত কয়েক বছরের নিয়মিত বিরতিতে নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে এ ধরনের অনুপ্রবেশ বাংলাদেশকে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন করে তুলছে। সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে মূলে যেতে হবে। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনায় মিয়ানমারকে এ বার্তাই দেবে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রায় ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে প্রত্যাবাসনের কাজটি শুরু করছে না মিয়ানমার। উল্টো নিয়মিত বিরতিতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ফলে সেখানকার লোকজন এ দেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় টেকনাফের লেদায় মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শিবিরের সভাপতি দুদু মিয়া বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আর উখিয়ার কুতুপালংয়ে মিয়ানমারের অনিবন্ধিত নাগরিকদের শিবিরের সভাপতি আবু সিদ্দিক বলেন, বালুখালির পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা এ মাসের প্রথম ১০ দিনে আশ্রয় নিয়েছে।

ইয়াঙ্গুনের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের সাম্প্রতিক অবস্থাসহ দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী গণতান্ত্রিক নেত্রী সু চি তাঁর বিশেষ দূতকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। মাস তিনেক আগে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নতুন করে সমস্যা শুরুর পর বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বারবার মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চাইলেও সাড়া দেয়নি মিয়ানমার। অথচ রাখাইনের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলার সময় নভেম্বরে চীনের সীমান্তবর্তী শান প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ হারানোর পরপরই চীনের সঙ্গে আলোচনায় বসে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের নিয়ে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন মাস পর এখন বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসছে মিয়ানমার।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার যে আন্তরিক নয়, সেটি মিয়ানমারের সাম্প্রতিক তৎপরতা থেকে স্পষ্ট। ফলে বাংলাদেশ কঠোর বার্তা দিলে সেটা শেষ পর্যন্ত কতটা ফল দেবে, সে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ ১৯৭৮, ১৯৯২ ও ২০১২ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সময় মিয়ানমারে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালের নভেম্বরে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ক্ষমতায় এলে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের অক্টোবরে সীমান্ত ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিধনযজ্ঞ শুরুর পর সে প্রত্যাশা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এমন ধারণা অমূলক হবে না যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সামরিক জান্তা, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও মিয়ানমারের সাধারণ লোকজনের ভাবনা একই বিন্দুতে মিলেছে। ফলে অন্য সময়ের চেয়ে এবারের পরিস্থিতিটা আলাদা। তাই ক্রমাগত আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকলেই রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।

ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনে কর্মরত কয়েকজন কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য মিয়ানমারের সরকার, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের একসঙ্গে কাজ করাটা জরুরি। তাঁদের মতে, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার যে দুটি চুক্তিতে রাজি হয়েছিল, দেশটিকে তা মেনে চলতে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত। ওই দুই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের স্পষ্টভাবেই মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য অর্থাৎ তাদের নাগরিকত্ব দিতে হলে মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন জরুরি।

সম্প্রতি টেকনাফ, উখিয়াসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নতুন অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে এসব লোকজনের ছড়িয়ে পড়াটা বাংলাদেশের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ তৈরি করেছে বলে মনে করে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে এসব লোকজনকে এক জায়গায় রাখার বিষয়টি ভাবা হচ্ছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, প্রাণ বাঁচাতে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে, তারা এখন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর ফলে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণে এসব লোকের মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে এক জায়গায় জড়ো করে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কক্সবাজারে জায়গা খোঁজা হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিবকে চিঠি
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন পোর্টাল টুসার্কেলস ডটনেট জানায়, রোহিঙ্গাদের নিপীড়ন থেকে রক্ষা করতে এবং দ্রুত হস্তক্ষেপসহ সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে চিঠি দিয়েছে ভারতের একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন। ইন্ডিয়ান হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আলী রাজা খান চিঠিতে লিখেছেন, মিয়ানমারে বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি লোকজন, সেনাবাহিনী এবং সেনাসমর্থিত উচ্ছৃঙ্খল জনতা রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। নিরপরাধ মানুষের ওপর সেখানে বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।