মেইন ম্যেনু

মুক্তিযুদ্ধে চার নেতার স্বীকৃতি

সিরাজী এম আর মোস্তাক: বাংলাদেশে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা এবং ৪১ বীরাঙ্গনার যে তালিকা রয়েছে, তাতে জাতীয় চার নেতার নাম নেই। তাই মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার। বিষয়টি আজও সুস্পষ্ট নয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তারাই দেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন। অথচ তাদের নাম খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭৬ যোদ্ধা এবং কোটাভোগী দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাতে নেই। এভাবে ‘৭১ এর ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের কোনো তালিকা নেই। যে হাজার হাজার ভারতীয় সেনাসদস্য সশস্ত্র সংগ্রাম ও প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাক হানাদারমুক্ত করেছেন, তাদেরও কোনো তালিকা নেই। মুক্তিযুদ্ধকালে কষ্টভোগী লাখ লাখ বন্দী ও শরণার্থী বাঙ্গালিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়। জাতীয় চার নেতার সাথে এদের বিষয়টিও সুরাহা প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধুমাত্র কোটাভোগী দুই লাখ পরিবারই কি মুক্তিযোদ্ধা এবং তারাই কি এককভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে? তারা ভিন্ন অন্যরা কি তাহলে রাজাকার? তেমনি উক্ত চার নেতাও কি রাজাকার?

এ বিষয় সুস্পষ্ট যে, ১৯৭১-এ এদেশের সবাই কোনো না কোনো রাজাকার। কেউ পাকিস্তানি রাজাকার. আর কেউবা ভারতীয় রাজাকার। যারা পাকবাহিনীর সহযোগীতা পেয়েছে, তারা পাকিস্তানি রাজাকার। এর মধ্যে রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধকালে দেশে অবস্থানকারী কোটি কোটি সাধারণ জনতা, তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন এবং পাকিস্তান সরকারের বেতনভোগী সকল বীর শহীদ ও বুদ্ধিজীবীগণ। এভাবে যারা ভারতের সহায়তা পেয়েছে, তারা ভারতীয় রাজাকার। তাদের মধ্যে রয়েছে- যুদ্ধকালে ভারতে অবস্থানকারী জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বহির্ভুত অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, প্রায় এক কোটি শরণার্থী বাঙ্গালি এবং সকল ভারতীয় সেনা সদস্য। এজন্য পাকিস্তানি রাজাকার বা ভারতীয় রাজাকার কোনো বিষয় নয়, বরং সবাই একেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অর্থাৎ জাতীয় চার নেতা যেমনি বীর মুক্তিযোদ্ধা, তেমনি আত্মত্যাগী ভারতীয় রাজাকারও বটে।

জাতীয় চার নেতা প্রত্যেকে তাদের স্বল্প জীবনে একাধারে পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতার জন্য তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তারা ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল বিজয় লাভ করেছেন। তারা বঙ্গবন্ধুর সহযোগী হিসেবে পাক সামরিক সরকারের সাথে সমঝোতা বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। তারাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তাদের নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি জনতা সর্বাত্মক সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং লাখো প্রাণ বিসর্জন ও আত্মদানের বিনিময়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এভাবে তারা পরিণত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের মহান পুরোধারূপে। দেশের মানুষ তাদেরকে ‘জাতীয় নেতা’ হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধে তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি শুধু মুক্তিযোদ্ধা বা ভারতীয় রাজাকার নয়, তা আরো ব্যাপক।

২৩ মার্চ, ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তান সামরিক সরকারের মধ্যকার সমঝোতা বৈঠক ব্যর্থ হলে যুদ্ধের আবহ শুরু হয়। এ সময় বঙ্গবন্ধু তার সকল সহকর্মীদেরকে আত্মগোপনে যাবার বা ভারতে প্রস্থানের নির্দেশ দেন। তখন এ চার নেতাও বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপনের পরামর্শ দেন। তারা প্রথমে বঙ্গবন্ধুকে হাত ধরে অনুরোধ করেন, তারপর হাউ-মাউ করে কান্না-কাটিও করেন। তারা টেলিফোনের মাধ্যমেও বঙ্গবন্ধুকে বারবার অনুরোধ করেন। সকল অনুরোধ ও কান্না-কাটি উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জবাব দেন, ‘তোমরা পালাও, কিন্তু আমি শেখ মুজিব পালাতে পারিনা। আমি পালালে, পাকবাহিনী শুধু আমাকে খোঁজার নামে বাংলার সাধারণ মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে। তাই বাংলার মানুষের জন্য আমি আমার জীবন উৎসর্গ করছি।’ বঙ্গবন্ধুর এ মহান রাজাকারি চেতনা বুকে ধারণ করে জাতীয় চার নেতা সেদিন যে যেভাবে পারেন, ভারতে পাড়ি জমান। তাজউদ্দিন আহমেদের কন্যা শিরিন শারমিনের লেখা ‘তাজউদ্দিন আহমদ নেতা ও পিতা’ এবং মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ৭১’ সহ বহু গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধকালে চার নেতার ভারত গমনের বিষয়টি বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। যুদ্ধকালে তারা ভারতে অবস্থান করলেও তাদের প্রচেষ্টা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্ভব ছিল না। অথচ স্বাধীনতার ৪৫ বছর অবধি আজও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নাম সংযুক্ত হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাস বিমূখ জাতি আজও জানে না মুক্তিযুদ্ধে তাদের স্বীকৃতি, তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার।

সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভুমিকার যথাযথ স্বীকৃতি প্রয়োজন। তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি সংগ্রামী ভারতীয় রাজাকার, তা নিশ্চিত করা উচিত। এভাবে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি, তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনদেরকেও স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার আদর্শ অনুসারে বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা নামক মিথ্যা বৈষম্য দূর করা উচিত। মুক্তিযোদ্ধা কোটা নামক অবৈধ নীতি বাতিল করা উচিত। বর্তমান ষোল কোটি নাগরিক বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ভক্ত অনুসারী হিসেবে দেশের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা উচিত।

তাই স্বাধীনতার উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সমগ্র জাতির কাছে আমার জিজ্ঞাসা, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জাতীয় চার নেতার স্বীকৃতি কী? তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি ভারতীয় রাজাকার?

লেখকঃ এ্যাডভোকেট ও কলামিস্ট