মেইন ম্যেনু

মুসলিম মেয়ে বর্ষাকে কেন ‘দেবী’ বানাচ্ছে হিন্দুরা?

ভারতের দাদরি থেকে কালনা কত দূর? কিলোমিটারের হিসাব যাই বলুক, বাস্তবে দুই গোলার্ধ্বে পড়ে আছে মানুষের মন। কালনা সত্যি করেছে কবি নজরুলের প্রশ্ন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, জিজ্ঞাসে কোন জন।’ মুসলিম ঘরের মেয়ে এবারের পুজায় কুমারী হবে কালনায়। কেউ আঁতকে ওঠেনি। শুধু মেনে নেওয়া নয়, ধন্য ধন্য করছেন কালনার মানুষ। আর বালিকার পরিবার বিভোর মেয়ের দেবী রূপের কল্পনায়। ভগবানের আশীর্বাদ বলেই তাঁরা মনে করছেন নিজেদের মেয়ের এই মর্যাদায়। পূজা আর দুই দিন পর। বইয়ের পাতা ছেড়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী বর্ষা খাতুন এখন মায়ের কাছে শিখতে চাইছে পূজার সময় তাঁর করণীয় সম্পর্কে। খবর এইসময়।

মা ফিরোজা বিবি পড়েছেন বিড়ম্বনায়। পূজার নিয়মকানুন কিছুই জানেন না। কখনও কাছে থেকে দেখাও হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি কি ছাই, এ সব জানি? ঘুরতে-ফিরতে জিজ্ঞাসা করছে, মা কেমন করে আমার পুজো হবে? আমাকে কি করতে হবে? যতটা জানি, তাই বলছি। কখনও প্রতিবেশী কারও কাছে জেনে বলছি। খুশিতে আর ধরে না আমার মেয়েটার।’ তাকে কুমারী পূজার প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন কালনার কাঁসারিপাড়ার এক সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ষষ্ঠী মল্লিক। পেশায় চিকিৎসক তিনি। ওই সেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে যে বারোয়ারি পুজো হয়, তাতেও কুমারী হিসেবে ষষ্ঠীবাবু বেছে নিয়েছিলেন বর্ষা খাতুনকে।

কুমারী পূজার জন্য ব্রাক্ষ্মণ কন্যাকে বেছে নেওয়াই প্রচলিত রেওয়াজ। তাহলে কোন সাহসে মুসলিম ঘরের মেয়েকে বাছলেন ষষ্ঠীবাবু? সমাজের চোখরাঙানির কথা ভাবেননি? হাসেন সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তিনি বলেন, ‘ধর্ম আলাদা হোক, ভগবান তো একই। সমাজ যেভাবে ভেঙেচুরে যাচ্ছে, তাতে আর যাই হোক, মানুষের মঙ্গল হবে না। সোজা পথের দিশা দেখাতে হলে এটা একটা পথ মাত্র। পরস্পরের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে বর্ষাকে মাতৃরূপে পুজো করবো বলে ঠিক করি।’ বর্ষাকে তিনি প্রথম দেখেন সেবা প্রতিষ্ঠানের দাতব্য চিকিৎসালয়ে।

মুসলিম ঘরের বধূ ফিরোজা বিবি বলেন, ‘মেয়ের চিকিৎসা করাতে ডাক্তারবাবুর কাছে যেতাম। তিনিই আমার মেয়েকে পূজা করার প্রস্তাব দেন। আমি তো প্রথমে ভেবেই পাইনি, কি করবো। ওর বাবাকে বলি। তিনি বলেন, দাদাকে জিজ্ঞাসা কর। ভাসুরকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি এক কথায় রাজি হন।’ হ্যাঁ, ধর্মের গোঁড়ামি আচ্ছন্ন করেনি বর্ষার জেঠু তাহের হোসেনকে। তিনি বলেন, ‘শুনেই বলেছিলাম, খুবই ভালো প্রস্তাব। ধর্মে ধর্মে তো কোনো ভেদ নেই। তাই সম্মতি দিয়েছিলাম।’ সমাজের চোখরাঙানোর কথা ভাবেননি তাহের কিংবা তাঁর ভাই আমেদ হোসেনও।

দুর্গাপুজোর আয়োজক ষষ্ঠী মল্লিক ও রোজ নামাজ পড়তে অভ্যস্ত তাহের-আমেদরা কোথাও যেন এক হয়ে গিয়েছেন। উভয়ের কাছেই ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নেই।’ কালনার পরিবেশটাই এমন। স্থানীয় বাসিন্দা বাবুলচন্দ্র বাড়ুই বলেন, ‘দেশে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে ভেদাভেদ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এর চেয়ে ভালো উদ্যোগ আর হয় না।’