মেইন ম্যেনু

মেসি-নেইমার: বন্ধুত্বে বিচ্ছেদ?

বিশ্ব ফুটবলে বৈরিতা কিংবা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে বোঝানো হয়। সেখানকার শিশুরা দুই দেশের মধ্যে ফুটবল বৈরিতা দেখতে দেখতে বড় হয়। তাদের মধ্যে যারা ফুটবলার হয় তারা মাঠেও সেই বৈরিতা দেখে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ গায়ে মেখেই তারা খেলতে নামে। উভয় পক্ষ জিততে মরিয়া থাকে। সে কারণে অধিকাংশ ম্যাচেই মাঠে উত্তেজনা বিরাজ করে। কখনো কখনো হাতাহাতিও হয়। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ বলে কথা! অবশ্য সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরার জন্য এই লেখা নয়।

১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেয় লিওনেল মেসি নামক এক বিস্ময় বালক। শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও শৈশবেই তার ফুটবল প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখান। সেখান থেকে তাকে নিয়ে নেয় স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা। এরপর সময়ের ব্যবধানে তারকা হয়ে ওঠেন মেসি।

মেসির জন্মের ঠিক পাঁচ বছর পর ব্রাজিলের সাওপাওলোর মোজি দাস ক্রুজেসে জন্ম নেন নেইমার দ্য সিলভা। লিওনেল মেসি যখন বড় মাপের তারকা, তখন ফুটবল প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখাতে শুরু করেন নেইমার। একটা সময় স্বপ্ন দেখেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় লিওনেল মেসির পাশে খেলার। নিজের প্রতিভা দেখিয়ে ২০১৩ সালে ব্রাজিলের এই তরুণ যোগ দেন স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায়। তখন অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদ মোটা অঙ্কের টাকায় নেইমারকে দলে নিতে চেয়েছিল। নেইমার যাননি। তার চেয়ে বলতে গেলে অর্ধেক টাকায় যোগ দেন বার্সায়। কারণ, তিনি যে স্বপ্ন দেখেছেন লিওনেল মেসির সঙ্গে খেলার। তার কাছ থেকে শেখার।

নেইমার যখন বার্সেলোনায় যোগ দেন তার আগেই লিওনেল মেসি চার-চারবার বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের খেতাব জিতে নিয়েছেন। নেইমার যখন ব্রাজিলের হয়ে খেলতে শুরু করেন তখন মেসি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। লিওনেল মেসির সঙ্গে নেইমারের তুলনা করার তেমন কিছু তখন ছিল না। বয়সে পাঁচ বছরের ছোট, ফুটবলে চিরশত্রু দেশের খেলোয়াড়- তারপরও তরুণ নেইমারের সঙ্গে মেসির বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। দুজনের বন্ধুত্বের প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে বার্সেলোনা। লিওনেল মেসির জার্সি নম্বর ১০। তার ঠিক পরের জার্সি নম্বরটি নেইমারের (১১)। সেই থেকে মেসি-নেইমারের বন্ধুত্বের পথচলা শুরু।

এরপর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বার্সার হয়ে তারা একসঙ্গে প্রায় ১০০ ম্যাচ খেলেছেন। একের পর এক জয় ছিনিয়ে এনেছেন। কখনো মেসি নিজে গোল করেছেন। কখনো নিজে গোল করার সুযোগ পেয়েও নেইমারকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। অনুশীলন, খেলার মাঠ, ড্রেসিংরুম কিংবা অন্য যেকোনো জায়গায় তাদের বন্ধুত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।

তাদের বন্ধুত্বের বিষয়ে বার্সার আরেক ফুটবলার ইভান রাকেটিচ বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো মেসি কিংবা নেইমার কেউ ইগোসম্পন্ন মানুষ নয়। দুজন ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ভালো বন্ধু। তাদের মধ্যে অন্যরকম ঐকতান রয়েছে।’

অথচ নেইমার যখন বার্সেলোনায় আসে তখন সমালোচকরা বলেছিল জুয়া খেলতে যাচ্ছে কাতালান ক্লাবটি। একজন ব্রাজিলের, একজন আর্জেন্টিনার। তাদের ইগো সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত হিতে বিপরীত হতে পারে বার্সার। তারা ভিন্ন দেশের, ভিন্ন মানসিকতার দুই ফুটবলার। তাদের মধ্যে মিল আছে। মিলের ব্যস্তানুপাতিক অমিলও রয়েছে। সমস্যা হবেই। কিন্তু তাদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন মেসি-নেইমার। কিভাবে সেটা করলেন? বন্ধুত্ব দিয়ে।

দুটি ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ব্যক্তিত্বের দুজন ফুটবলার হয়ে গেলেন ভালো বন্ধু। তাদের এই বন্ধুত্বে ফুটবল ইতিহাস দারুণ দারুণ সব গোল দেখেছে, অ্যাসিস্ট দেখেছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুটি দেশের দুই ফুটবলার মিলে ফুটবলের সুন্দর ইতিহাস লিখেছেন। হয়েছেন বিশ্বের সেরা ফরোয়ার্ড লাইন।

বার্সায় যোগ দেওয়ার পর চার বছর তারা একসঙ্গে খেলেছেন। প্রতিভাবান নেইমার তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশ্বসেরা ফুটবলার ও বন্ধু লিওনেল মেসির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। একসঙ্গে লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা ডেল রে ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছেন। অনেক সুখস্মৃতির সাক্ষী হয়েছেন। হারের কষ্ট ভাগাভাগি করেছেন। ভাগাভাগি করেছেন জয়ের আনন্দও। কিন্তু গেল বুধবার (২ আগস্ট) তারা সাক্ষী হলেন বিচ্ছেদেরও। এদিন বার্সার অনুশীলন মাঠে শেষবারের মতো লিওনেল মেসি ও বার্সা সতীর্থদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নেইমার। জানিয়ে দেন তিনি আর বার্সেলোনায় থাকছেন না। তার নতুন গন্তব্য ১ হাজার ৩৫ কিলোমিটার দূরের প্যারিস। তখন মেসি অবশ্য কিছুই বলেননি। হয়তো বন্ধুর এমন চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি।

কিন্তু মাঠ থেকে ফিরে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে লিখেন, ‘তোমার সঙ্গে এতগুলো বছর একসঙ্গে কাটানোটা আমার জন্য খুবই আনন্দদায়ক ছিল বন্ধু নেইমার জুনিয়র। জীবনের নতুন এই বাঁকে তোমার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা জানাচ্ছি। দেখা হবে।’

এর মধ্য দিয়ে চার বছরের বন্ধুত্বের বিচ্ছেট ঘটে। কিন্তু এই বিচ্ছেদেই কী বন্ধুত্বের শেষ? দূরে গেলেই কী বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়? যায় না। অটুট থাকুক মেসি-নেইমারের বন্ধুত্ব।






মন্তব্য চালু নেই