মেইন ম্যেনু

মোবাইল টয়লেট ও একটি ছিন্নমুল পরিবারের জীবনযুদ্ধের গল্প

সময়টা ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি। তারা স্বামী-স্ত্রী কাজ করতেন ঢাকার লালবাগের একটি বল তৈরির কারখানায়। কোনোমতে সংসার চলত। একদিন হঠাৎ ওই কারখানার দেওয়াল ভেঙে চাপা পড়েন দুজন। পায়ে আঘাত লেগে দুজনের একটি করে পা পঙ্গু হয়ে যায়। তবুও জীবনযুদ্ধ থেমে নেই তাদের।

এ গল্প ছিন্নমুল পরিবার হাসান-রোকসানা দম্পতির। সহায় সম্বলহীন পরিবারটি বাস করে রাজধানীর কাঁটাবন মসজিদের উত্তর পাশের ফুটপাতে। কারণ, বাসা ভাড়া দিয়ে চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চালানোর মতো সামর্থ তাদের নেই। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র তারা নন। সেই জীবনযুদ্ধের গল্প শোনাচ্ছিলেন রোকসানা।

তিনি বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনই পঙ্গু হওয়ার পর এক পর্যায়ে লালবাগের বাসা ছেড়ে দিয়ে স্বামী ও ছেলে-মেয়েসহ সংসার পাতি এলিফ্যান্ট রোডের একটি মার্কেটে। সেখানে রাত কাটাই, আর দিনের বেলা রমনা পার্ক থেকে বকুল, গোলাপ, বেলীসহ বিভিন্ন ফুল সংগ্রহ করে বিক্রি করি। কিন্তু তা দিয়ে সংসার চলে না।

এরপর ওই মার্কেট থেকে বিতাড়িত হলে সিদ্ধান্ত নিই ফুটপাতে থাকার। তবে ভিক্ষা করা আমার একদম পছন্দ নয়। কষ্ট করে আয়-রোজগার করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছি। তাদের প্রতিষ্ঠিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’ জীবনযুদ্ধে হার না মানা ওই নারী এভাবেই বর্ণনা করছিলেন তার সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনী।

তিনি বলেন, ‘আজ (শনিবার, ঈদের দিন) সকালে অনেকেই বলেছেন, তোমাদের পায়ের সমস্যা। ঈদের মাঠে সবাই ভিক্ষা করতে যাচ্ছে, তোমরাও যাও। আজকের দিনে অনেক টাকা তুলতে পারবে। কিন্তু আমি ওই টাকার প্রতি কোনোভাবেই লোভ করিনি। আর ছেলে-মেয়েদেরও ঈদের মাঠে ভিক্ষা করতে যেতে দেইনি। কারণ, ওটা আমার একদম অপছন্দ। কষ্ট করে কাজ করে খেতে চাই। পোলাপানদের লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করতে চাই।’

কীভাবে তা সম্ভব হচ্ছে, জানতে চাইলে রোকসানা জানান, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে এবং পঙ্গু স্বামীকে নিয়েই তার সংসার। সবার বড় ছেলে ফাহিম ড্রাইভিং শিখছে। ছোট মেয়ে রেহানা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সে খালার বাসায় থেখে পড়ালেখা করছে। আরেক মেয়ে ফারজানা ধানমন্ডির একটি স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ে। আর সবচেয়ে ছোট ছেলে ওমর ফারুকের বয়স আড়াই বছর। সে রোসানার সঙ্গে ফুটপাতের এই ঘরেই থাকে।

সংসার পরিচালনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রায় দশ মাস আগে রমনা পার্কে ফুল বিক্রি করার সময় একজন আমাকে প্রস্তাব করেন ফুটপাতে টয়লেটের ব্যবসা করতে। ফুটপাতে গ্যামজ্যাম হবে ভেবে প্রথমে ওই ব্যবসা করতে রাজি হইনি। পরে ওই ব্যক্তি জানান, সরাসরি অফিসে গিয়ে চুক্তি করে আসতে। তার কথামতো মিরপুরে আরমান নামে একটি বেসরকারি সংস্থার অফিসে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবসার চুক্তি করে আসি। চুক্তি অনুযায়ী মাসিক এক হাজার দুইশ টাকায় দুটি মোবাইল টয়লেট ভাড়া করে আনি। সিটি করপোরেশনের অনুমোদন সাপেক্ষে কাঁটাবন মসজিদের বিপরীত পাশে টয়লেটের ব্যবসা শুরু করি। আর তার পাশেই ফুটপাতে বসবাস শুরু করি আমরা।’

চল্লিশোর্ধ রোকসানা বলেন, ‘প্রতিদিন বাংলামোটর থেকে ২০০ টাকার পানি কিনে আনি। সেই পানি আনতে ৮০ টাকা ভ্যান ভাড়া লাগে। এতকিছুর পরও সংসার ভালোই চলছে। সামনে আরো ভালো চলবে। কারণ, ছেলে ও মেয়েরা আয় শুরু করলে সংসারে আরো শান্তি আসবে।’

রোকসানা বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার একজন হাজী সাহেব এখানে আসেন। আসার পথে কয়েক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসেন। যাওয়ার সময় ফারজানাকে ৫০ টাকা করে দিয়ে যান। বলে যান, ভালো করে লেখাপড়া করতে।

index

ঈদ কেমন কাটল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সকাল বেলা এখানেই সেমাই পাকাইছি। সবাই খেয়েছে। আর দুপুরে বোনের বাসা থেকে পোলাও-মাংস এসেছিল। সেগুলি সবাই মিলে খেয়েছি। সামনে ফুটপাত ছেড়ে আবার ভালো কোনো বাসায় উঠব, এমন আশায় দিন পার করছি। আপনারা সকলে আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

সবশেষ তিনি বলেন, ‘লালবাগে আমারও নিজের জমিতে বাড়ি ছিল। বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়েরা চক্রান্ত করে তা বিক্রি করে আমাকে পথে বসিয়েছে। তা না হলে আজ আমার ফুটপাতে না থেকে নিজের বাসায় থাকার কথা ছিল। কপাল খারাপ, এখন আশায় দিন গুনছি।’