মেইন ম্যেনু

যানজটের সমাধান করবে ইউলুপ!

সমতল রাস্তার পাশাপাশি বেশকিছু উড়াল সেতু হয়েছে নগরীতে, কাজ চলছে আরও। রাস্তা বেড়েছে। সরু রাস্তা হয়েছে চওড়া। কিন্তু স্বস্তি মিলছে না কিছুতেই। দিন যত যাচ্ছে ঢাকার রাস্তার যানজট তত বাড়ছেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নগরবাসীকে আটকে থাকতে হচ্ছে যানজটে। কোথাও ভোর থেকে রাত অবধি নিস্তার মিলছে না জটের কবল থেকে। সারা দিনই থেমে থেমে চলছে গাড়ি। ভোগান্তি নগরবাসীর নিত্যদিনকার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় মতো যাওয়া যাচ্ছে না গন্তব্যে। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। মোটাদাগে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যানজট।

যান চলাচলের জন্য শুধু যে রাস্তা বাড়ছে তা নয়। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যাও। তবে গণপরিবহনের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাই ঢাকার রাস্তায় বেশি। যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে নিরলস। নিত্যনতুন নিয়ম-কানুনও আরোপ হচ্ছে। একসময় নির্ধারিত লেন মেনে চলার জন্য নজরদারিও হয়েছে শক্তভাবে।চেষ্টা হয়েছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি কমিয়ে এনে যানজট নিয়ন্ত্রণের।তেজগাঁও-মগবাজার-বাংলামোটর-মৌচাক এলাকায় তৈরি হচ্ছে উড়াল সেতু। ধুমচে চলছে কাজ। কিন্তু এতেও যে ভবিষ্যতে যানজট থেকে পুরোপুরি স্বস্তি মিলবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এতো গেল মগবাজার-মৌচাক এলাকার চালচিত্র।কিন্তু নগরীর গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, মহাখালী, বনানী, চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকার যানজট থেকে মুক্তি, তার কী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন অনেকে, এখনো করছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলীর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে অভিনব এক কৌশল। ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’য়ের মতো দেখতে এই পদ্ধতিকে সংক্ষেপে বলা হচ্ছে ‘ইউলুপ’। উদ্ভাবকের দাবি, কম খরচে এবং কম সময়ে এতো কার্যকর পদ্ধতি অতীতে কারো মাথায় আসেনি। শুধু কথা নয়, যত দ্রুত এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তত শিগগিরই মিলবে সুফল।

ইউলুপ পদ্ধতির উদ্ভাবক প্রকৌশলী কামরুল হাসান বললেন, ‘আমার এই বিশেষ কৌশল বাস্তবায়ন হলে সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি চলতে এক মুহূর্তে থামতে হবে না। সিগন্যালে আটকে থাকতে হবে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ট্রাফিক পুলিশের প্রয়োজন হবে না। লাগবে না সিগন্যাল বাতিও।এ পদ্ধতিতে একাধিক রাস্তার সংযোগস্থল বা ইন্টারসেকশনে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। সেইসঙ্গে ক্রসিংয়ের কাছাকাছি সড়কের ভেতরে বিশেষ ধরনের ইউটার্ন স্থাপন করতে হবে।’ তিনি বলেন,‘এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন হলে সড়কে আর সিগন্যাল পড়বে না। চালক মূলত সড়কের ইন্টারসেকশনের সিগন্যালে পড়ে গাড়ি থামাতে বাধ্য হন। যে কোনো দু’দিক থেকে সরাসরি ক্রসিং বন্ধ করে দিয়ে একটু বাড়তি জায়গা নিয়ে সড়কে অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন স্থাপন করে এ সিনগ্যাল পদ্ধতি এড়ানো সম্ভব।’

চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী তার উদ্ভাবন নিয়ে অর্ধযুগ ধরে দৌড়ঝাঁপ করছেন।সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে অভিনব এই কৌশল নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও একাধিকবার চিঠি এসেছে, জানতে চাওয়া হয়েছে তার উদ্ভাবন সম্পর্কে। কামরুল হাসান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার তুলে ধরেছেন তার উদ্ভাবিত পদ্ধতির নানা দিক। সরকারও আগ্রহী পরীক্ষামূলকভাবে এটি বাস্তবায়ন করে দেখতে। তবে সেটি কবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে আছে সংশয়। প্রশ্ন, ইউলুপই কি যানজটের সমাধান? এ কথা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে কামরুল হাসানের দাবি, যানজট নিরসনে অন্য যেসব পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে তার চেয়ে এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন ব্যয় ১০০ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। তাছাড়া জায়গা কিংবা ইউলুপ তৈরিতে সময়ও লাগবে কম। এ নিয়ে একটি ভিডিও চিত্রও তৈরি করেছেন কামরুল হাসান। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে না থেমেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারে গাড়ি। প্রয়োজনে দিক কিংবা রাস্তা পরিবর্তনের জন্য ইউলুপের ভেতরে গড়ে তোলা ‘ইউটার্ন’ ব্যবহার করতে পারবেন চালক। এতে কোনো পথই আটকাতে হবে না ট্রাফিক পুলিশকে। যাত্রীদেরও ট্রাফিক সিগন্যালে অপেক্ষা করতে হবে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

যেভাবে কাজ করবে ইউলুপ

শাহবাগ ক্রসিংয়ের কথাই ধরা যাক। এ ইন্টারসেকশনের চারদিক থেকে চারটি রাস্তা শাহবাগ মোড় অতিক্রম করেছে। ফলে একটি রাস্তা খোলা থাকলে ট্রাফিক পুলিশ বন্ধ রাখেন বাকি তিনটি রাস্তা। একটি রাস্তা ৫ মিনিট করে বন্ধ করা হলেও ১৫ মিনিট পর যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় অন্য রাস্তার যাত্রীদের। এ সময়ে দীর্ঘ যানজটও লেগে যায়। নতুন পদ্ধতিতে কোনো রাস্তাই বন্ধ রাখতে হবে না। সব রাস্তা দিয়ে সারাক্ষণ গাড়ি চলতে পারবে। শাহবাগের চার রাস্তার ইন্টারসেকশনের ক্ষেত্রে সুবিধা মতো উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিমের যেকোনো একটি সড়ক দিয়ে সরাসরি গাড়ি চলাচল করবে। সরাসরি চলাচল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সড়কে স্থায়ী ডিভাইডার স্থাপন করতে হবে। যারা সরাসরি যেতে পারবে না, তাদের জন্য প্রতিটি সড়কে ‘অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন’ থাকবে। এটি ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত দিকে যাওয়া যাবে।

প্রকৌশলের ভাষায় ইন্টারসেকশন বন্ধ করা হলেও শুধু ডানে মোড় নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই ইন্টারসেকশনের কাছাকাছি মূলত ডানে মোড় নেওয়ার জন্যই ‘অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন’ ব্যবহার করা হবে। ধরা হলো শাহবাগ মোড় দিয়ে উত্তর-দক্ষিণের (বাংলামোটর-টিএসসি) সড়ক দিয়ে সরাসরি গাড়ি চলবে। ডিভাইডারের কারণে পূর্ব-পশ্চিমের (মৎস্য ভবন-কাঁটাবন) গাড়ি সরাসরি চলতে পারবে না। বাংলামোটর থেকে আসা গাড়ি টিএসসি গেলে সরাসরি সড়কে সোজা চলে যাবে। মৎস্য ভবন যেতে চাইলে বাঁয়ে মোড় নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু কাঁটাবন যেতে চাইলে শাহবাগ মোড় সরাসরি সড়ক অতিক্রম করে টিএসসির দিকে গিয়ে ‘অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন’ ব্যবহার করে ডানে মোড় নিয়ে যেতে হবে।

একইভাবে টিএসসি থেকে আসা গাড়ি বাংলামোটরে সরাসরি, কাঁটাবনে বাঁয়ে মোড় নিয়ে এবং মৎস্য ভবনের দিকে যেতে চাইলে শাহবাগ ইন্টারসেকশন অতিক্রম করে কিছুটা বাংলামোটরের দিকে গিয়ে ‘অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন’ নিয়ে ডানে ঘুরে যেতে হবে। আর সরাসরি যেতে না পারায় পূর্ব-পশ্চিমের (মৎস্য ভবন-কাঁটাবন) গাড়ি যার যার সড়কে বাঁয়ে মোড় নিয়ে উত্তর-দক্ষিণের সরাসরি সড়কে প্রবেশ করে ইউটার্ন ব্যবহার করে গাড়ি ঘোরাতে পারবেন। যেমন মৎস্য ভবন থেকে আসা গাড়ি বাঁয়ে মোড় নিয়ে টিএসসির দিকে ইউটার্নের মাধ্যমে ঘুরে সরাসরি রাস্তার বাঁয়ের লেনে ঢুকে কাঁটাবন ও সোজা গিয়ে বাংলামোটরের দিকে যেতে পারবে। একইভাবে কাঁটাবনের গাড়ি বাঁয়ের লেনে ঢুকে ইউটার্ন দিয়ে ঘুরে টিএসসি বা মৎস্য ভবনের দিকে যেতে পারবে।

করতে হবে একমুখী রাস্তা

ঢাকার রাস্তার যানজটের পেছনে যে কারণগুলো পাওয়া গেছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। সুযোগ পেলেই নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে ছোটেন চালকরা। নির্দিষ্ট লেন মানতেও বেশ অনীহা চালকদের। পুরো প্রকৌশল নিয়ে কাজ করছেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার রাস্তার জন্য একমুখী রাস্তা বা ওয়ানওয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে পাশাপাশি আলাদা লেন বা ডিভাইডার না রেখে একমুখী রাস্তা চালু করা যেতে পারে। এতে আইন অমান্য করা কিংবা লেন না মানার প্রবণতা কমবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রণে কোনো একটি প্রকল্পের প্রতি নির্ভর করলে চলবে না। একেক এলাকার সড়কের প্রকৃতি এবং যানবাহনের ধরন আর চাপের বিষয় বিবেচনায় আলাদা প্রকল্প নিতে হবে। এ জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নানা সময় নানা উদ্যোগ নিলেও তা আর আগায়নি।

নির্মাণ করতে হবে আন্ডারপাস

ঢাকার যানজট নিরসনে অতীতেও বেশকিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। যার সিংহভাগই আছে বাস্তবায়নের বাইরে। শুধু পরিকল্পনা পর্যন্তই। এমনই একটি আন্ডারপাস নির্মাণ। ঢাকায় যেসব এলাকায় গাড়ির চাপ বেশি থাকে কিংবা গন্তব্যে যাওয়ার জন্য গাড়ির দিক পরিবর্তন করতে হয় সেসব জায়গায় আন্ডারপাস নির্মাণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে আটকে গেলে এই প্রকল্প। রাজধানীর যানজট নিরসনের লক্ষে ৮টি আন্ডারপাস ও দুটি ইউটার্ন নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিয়ে ৬শ ৪০ কোটি টাকা। প্রতিটি আন্ডারপাস নির্মাণে ব্যয় হবে ৬৪ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পের অধীনে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর, ৭ নম্বর, ২ নম্বর, রাসেল স্কয়ার, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নীলক্ষেত, ফকিরাপুল ও রাজারবাগ-শাহজাহানপুরের ইন্টারসেকশনে ভেহিকুলার আন্ডারপাস এবং মিরপুর রোডের টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ও ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের মানিক মিয়া এভিনিউ ইন্টারসেকশনে ইউটার্ন নির্মাণ করা হবে। এগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের পর দ্বিতীয় দফায় পল্টন, এফডিসির পাশের রেলক্রসিং, বনানীর স্টাফ রোড রেলক্রসিং, মালিবাগ রেলক্রসিং, আগারগাঁও, গুলশান-২ গোল চত্বর, গ্রিন রোড-পান্থপথ ক্রসিং, তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো মোড় এবং কাঁটাবন-এলিফ্যান্ট রোড ক্রসিং এ ১১টি আন্ডারপাস নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার পরই সেটি ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেটর অথরিটির (ডিটিসিএ) কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখনো এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটি ডিটিসিএ’র সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানান তিনি। ডিএসসিসি’র ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ জানিয়েছে, সড়কের সংযোগগুলোতে মাটির নিচ দিয়ে এসব আন্ডারপাস ও ইউটার্ন থাকবে। ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই মাটির নিচ দিয়ে যানবাহন অতিক্রম করতে পারবে এবং এতে যানজট সৃষ্টির কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ আন্ডারপাসের যানবাহনকে দীর্ঘ সময় সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। রাজধানীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভারের চেয়ে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে এসব আন্ডারপাস। ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় অনেক বেশি কিন্তু আন্ডারপাস নির্মাণ ব্যয়ও অনেক কম। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে জায়গার কোনো অপচয় হবে না এবং ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন করপোরেশন কর্মকর্তারা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হতে অনেক সময় লাগবে। প্রতিটি সড়কের মাটির নিচে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ লাইন আছে। আন্ডারপাস নির্মাণের ক্ষেত্রে এ সংযোগ লাইনগুলো সরাতে হবে। কিন্তু এ সংযোগ লাইন সরানোর কাজ ডিসিসির নয়। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ নিজ লাইন সরাতে হবে। সড়কের মাটির নিচে থাকা এসব সংযোগ লাইন স্থানান্তরের ব্যয় যদি আন্ডারপাস নির্মাণের ব্যয় থেকে বেশি হয়, তবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন দীর্ঘসময় লাগতে পারে।

যান চলাচলে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে, সরাতে হবে বাসস্ট্যান্ড

রাজধানীতে যানজট সৃষ্টির পেছনে বড় বাধা বিশৃঙ্খলা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং থেকে শুরু করে এলোপাতাড়ি চালানো সবকিছুই দায়ী যানজটের জন্য। তাছাড়া দূরপাল্লার বাসস্ট্যান্ডগুলো শহরের মাঝখানে হওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে বেশি। বাসস্ট্যান্ড এলাকার আশপাশের কয়েক কিলোমিটারে সারি সারি দাঁড় করানো থাকে গাড়ি। এতে নগরীর গণপরিবহনগুলোর চলাচলে বিঘœ ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাস টার্মিনাল আছে এমন এলাকা যেমন-মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী এলাকায় এলোপাতাড়িভাগে গাড়ি রাখা হয়েছে। যে কারণে মূল রাস্তায় গাড়ি চলাচলে দারুণ সমস্যা পোহাতে হয়। বেশির ভাগ সময়ই জট লেগে থাকে এসব এলাকায়। তাই যানজট কমিয়ে আনতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে বাসস্ট্যান্ডগুলোকে সরিয়ে নেওয়াও উচিত বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

উচ্ছৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালানোর কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে হরহামেশা। রাজধানীর আসাদগেট এলাকা। ব্যস্ত ওই সড়কের তিনটি রাস্তা এসে মিলেছে এক মোহনায়। ট্রাফিককে সব সময় একটি রাস্তা বন্ধ রাখতে হয়। আবার সময় সময় দুটি রাস্তার গাড়ি থামিয়ে সংসদ ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে আসা গাড়ি চলাচলের জায়গা করে দিতে হয়। ওই এলাকায় বুধবার দুপুরে ঘটেছে ঘটনাটি। ধানমন্ডি-কলাবাগানের রাস্তা ধরে ভিআইপি-২৭ নম্বর পরিবহনের একটি গাড়ি আসছিল বেশ বেপরোয়া গতিতে। চালক খেয়াল করেননি ট্রাফিক সিগন্যাল। হঠাৎ কাছাকাছি এসে যখন দেখলেন লালবাতি জ্বলছে তখন শক্ত করে ব্রেক করতে গিয়ে ঘটে ছোট দুর্ঘটনা। বাসটির সামনের সিটে বসা নারী যাত্রীদের একজন এসে ছিটকে পড়েন সামনের গ্লাসে। আগে থেকেই গ্লাসটি ছিল ভাঙা। ভাঙা অংশে লেগে ওই যাত্রীর কপাল কেটে যায়। বাসটির অন্য যাত্রীরাও হুড়মুড়িয়ে পড়ে যান বাসের ভেতর।

ট্রাফিক সিগন্যাল না মানায় প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। ঢাকার রাস্তা ও গণপরিবহন নিয়ে বুয়েটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বাসচালকদের চোখ থাকে লুকিং গ্লাসের দিকে। তারা তাকিয়ে দেখেন পেছন দিয়ে একই পথের অন্য কোনো বাস আসছে কি না। কোনোভাবেই সেই বাসকে আগে যেতে দেওয়া যাবে না, এই মানসিকতা তাদের মধ্যে প্রবল। অথচ নিয়ম ছিল চালক সিগন্যাল বাতির দিকেও নজর রাখবেন। মানবেন ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনাও। সিগন্যাল অমান্য করার এই অভ্যাস শুধু যে গণপরিবহনগুলোর তা নয়, অন্য যানের চালকদের মধ্যেও সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতা দেখা যায়। তাদের অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনা কমছে না।

ফুটপাত দখলমুক্ত করা জরুরি

রাজধানীর ফুটপাতগুলো বেশির ভাগই আছে অবৈধ দখলে। দোকানপাট, হাটবাজার হরহামেশাই বসছে ফুটপাতে। যে কারণে হাঁটার রাস্তা থাকছে না পথচারীদের। আর বাধ্য হয়ে তাদের নামতে হচ্ছে গাড়ি চলাচলের রাস্তায়। নিয়ম না মেনে এদিক-সেদিক হাঁটার কারণে গাড়িগুলোও ঠিকঠাক চলাচল করতে পারে না। এসব কারণেও সৃষ্টি হয় যানজট। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, রাজধানীর ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত করতে পারলেও যানজট নিরসনে কাজে আসত। নগরবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ফুটপাতের অবৈধ দখল মুক্ত করার অনেক উদ্যোগ আমরা দেখেছি। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসেনি। একদিন উঠিয়ে দিলে সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আইন প্রয়োগে কঠোর হলে আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে এসব অভিযানের ফল পাওয়া যেত।’

আধুনিক ও কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প নেই

বেসরকারি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার রাস্তার যানজটের পেছনে ব্যক্তিগত গাড়িও দায়ী। কারণ, দিন দিন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ঢাকার রাস্তায় বাড়ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে একজন কিংবা দুজন চড়েন। অথচ একটি মিনিবাসের প্রায় সমান জায়গাই নষ্ট করে ব্যক্তিগত গাড়ি। আর এসব গাড়িতে যারা চড়েন তাদের প্রায় সবাই চান ঝামেলা এড়িয়ে চলাফেরা করতে। ঢাকায় যেসব গণপরিবহন রয়েছে সেগুলোতে চড়ে স্বস্তি নেই নগরবাসীর। বাসে ওঠা থেকে শুরু করে নামা পর্যন্ত বেশ ধকল পোহাতে হয় যাত্রীদের। যে কারণে ঢাকায় চলাচলের জন্য উন্নতমানের গণপরিবহনের প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার রাস্তায় উন্নত গণপরিবহন নামিয়ে প্রাইভেট কারের ওপর চাপ কমানোর চিন্তা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

অনেক সমস্যার সমাধান দেবে মেট্রোরেল

যানজট নিরসনে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম মেট্রোরেল। গত কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে এ নিয়ে। অথচ মেট্রোরেলের ডিপো করার জন্য জায়গা নির্ধারণ থেকেই জটিলতায় জড়িয়ে যায় প্রকল্পটি। যদিও সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন স্পটে মাটি পরীক্ষার কাজ চলছে। মেট্রোরেল চলাচলের জন্য উপযোগী রুট এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জায়গা নির্ধারণ চলছে। তবে এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কবে নাগাদ মেট্রোরেলে চড়তে পারবে নগরবাসী। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা আছে ২০১৯ সালের শেষের দিকে আংশিক চালু হবে এই রেল। রেলটি প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। সরকারের আশা এই প্রকল্পটি চালু হলে উত্তরা থেকে মিরপুর-ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত যানজট অনেকটাই কমে আসবে। তবে মতিঝিল থেকেও নগরীর উত্তর অংশে প্রকল্পটি আরও বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।

এলিভেটর এক্সপ্রেসওয়ে কবে

এলিভেটর এক্সপ্রেসওয়ে ধারণাটি উন্নত বিশ্বের। কম সময়ে যাতায়াতের জন্য এটি কার্যকর একটি পরিবহন। যানজটে নাকাল নগরবাসীকে স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে এলিভেটর এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। বিমানবন্দর এলাকা থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত এই উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে দুই দফা। তবে কাজ কবে শেষ হবে তা বলতে পারছেন না কেউ। যদিও প্রকল্পের সর্বশেষ নথিপত্রে বলা হয়েছে ২০১৮ সালের জুনে এই সড়কটি ব্যবহার করতে পারবে নগরবাসী।

বাইপাস সড়ক নেই, থাকলেও ব্যবহার কম

ঢাকার আশপাশের শহরতলির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মূল সড়কের বাইরে বাইপাস বা বিকল্প সড়কের প্রয়োজন ছিল বেশি। এতে যানজট কমে আসত। গাড়ি চলাচলের বিকল্প পথ পাওয়া যেত। অথচ নগরীর যানচলাচল পরিকল্পনার কোথাও নেই বাইপাস সড়ক নির্মাণের কথা। তাছাড়া যে কয়েকটি বাইপাস ঢাকার আশপাশে আছে সেগুলোর শতভাগ ব্যবহারও হচ্ছে না। নগরবিদরা মনে করেন, যানজট নিরসনে বাইপাস সড়কগুলোকে চালু করতে হবে। অবকাঠামোগত ত্রুটি থাকলে সেগুলোও ঠিক করে দিতে হবে। নতুন বাইপাস সড়কও নির্মাণ করা যেতে পারে।

পুলিশের দৃষ্টিতে ১৯ কারণে ঢাকায় যানজট

যানজট নিরসনে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে ১৯টি কারণ। যেগুলো রাজধানীতে যানজটের পেছনে দায়ী। অপ্রশস্ত রাস্তা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে হাট-বাজার, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, দোকানপাট বসানো, রাস্তায় নির্মাণসামগ্রী রাখা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে কার পার্কিং না থাকা, পার্কিং থাকলেও বন্ধ রাখা, রাস্তায় যত্রতত্র বাস, মিনিবাস ও অটোরিকশা থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করা যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ, ঢাকা সিটি করপোরেশন,রাজউকসহ সরকারি অন্য সংস্থাগুলোর কাজে সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করা হয়েছে।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরী একটি অপরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। নগর উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকার জমির মালিকদের ভূমি ব্যবহারে অদূরদর্শিতাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঢাকা শহরের ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মধ্যে ৮ শতাংশ ভূমি রাস্তা হিসেবে চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি আদর্শ নগরীর জন্য মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ ভূমি রাস্তার জন্য প্রয়োজন হলেও ঢাকা মহানগরীর মাত্র ৮ শতাংশ ভূমি রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই ৮ শতাংশ রাস্তার মধ্যে মাত্র ২.৫ শতাংশ কার্যকর সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৩ লাখ ২৫ হাজার যান্ত্রিক যান এবং ৭ লাখ রিকশা চলাচল করে। আবার এ সব রিকশার মধ্যে ৬ লাখ ২০ হাজারই অবৈধ। চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ব্যবহৃত রাস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। উপরন্তু প্রতিদিন ১০০টি নতুন যান্ত্রিক যান রাস্তায় নামছে। ঢাকা মহানগরীর রাস্তায় ঠেলাগাড়ি থেকে রেলগাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩০ প্রকার যান চলাচল করে থাকে। রাস্তায় দ্রুতগতি ও ধীরগতিস¤পন্ন যানবাহন এবং একই সঙ্গে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করার ফলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

চলাচলের রাস্তায় অবৈধ পার্কিং, হকার কর্তৃক অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করায় পথচারী ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে রাস্তায় নেমে আসায় এবং রাস্তার পাশে পাইকারি কাঁচাবাজার থাকায় যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। স্বয়ংক্রিয় পর্যায় ক্রমিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা, লেন মেনে যানবাহন চলাচল না করা, ট্রাফিক আইন না মেনে চলার প্রবণতা, ট্রাফিক আইন ও রীতিনীতি স¤পর্কে অজ্ঞতা। এ ছাড়াও গাড়িচালকদের শিক্ষা সচেতনতার অভাব, যানবাহন ব্যবহারে অদক্ষতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে জটিলতা এবং লাইসেন্সবিহীন বা নকল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালানো।

ঢাকা মহানগরীতে ২১৯টি বাস স্টপেজ এবং বিআরটিসি কর্তৃক অনুমোদিত ২০৮টি বাস রুট রয়েছে। বিআরটিসি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রতিদিন ১২ হাজার বাস/মিনিবাস এই রুটগুলোয় যাত্রী পরিবহন করে থাকে। বাস স্টপেজে বাস না থামিয়ে মূল রাস্তার ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করানো হয়। এছাড়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো নগরীর অভ্যন্তরে হওয়ার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। ঢাকা মহানগরীর ব্যস্ততম বিভিন্ন রাস্তায় ২০টি পয়েন্ট, লেভেল ক্রসিং রয়েছে। প্রতিদিন ট্রেনের আপ ও ডাউন মিলিয়ে দৈনিক ৪/৫ ঘণ্টা সময় লেভেল ক্রসিংগুলোয় যানবাহন আটকে থাকে। এ বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফিটনেসবিহীন যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ এবং পুরনো যানবাহন রাস্তায় চলার কারণেও যানজট সৃষ্টি হয়।

যানবাহনের জ্বালানি তেলের চেয়ে সিএনজির দাম কম থাকায় এবং দেশের অধিকাংশ অবস্থাস¤পন্ন লোক ঢাকায় বাস করায় একাধিক গাড়ি ব্যবহারসহ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের জনবল স্বল্পতা রয়েছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে এবং ওয়াসা, গ্যাস, টেলিফোন ও বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়হীনতার অভাবে সারা বছর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলায় যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ছাত্রছাত্রীদের পরিবহনে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহৃত হওয়ায় এবং যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা- ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে সবাইকে ঢাকায় আসতে হয়। নগরীর অভ্যন্তরে পোশাককল, শিল্প-কারখানা, ট্যানারি এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনের অবস্থান থাকা যানজটের অন্যতম কারণ।

বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের রাস্তায় সভা-সমাবেশ, মিছিল, মিটিং, অনুষ্ঠান করতে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে থাকে। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন অফিস-আদালত ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না রাখায় রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করায় যানজট সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ এবং পরিবহন খাতের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব। তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্তব্য পালনে অবহেলা ও দুর্নীতি ঢাকা মহানগরে যানজট সৃষ্টির সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে।

যানজট নিরসনে সুপারিশ

ঢাকার যানজট নিরসনে তিন মেয়াদে সুপারিশও করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেগুলো বাস্তবায়ন হলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ : অবৈধ যানবাহন আটক এবং নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সীমিত করে পুরনো গাড়ি নিষিদ্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মোবাইল কোর্টের ব্যবস্থা নেওয়া। রাস্তার পাশ থেকে হাট-বাজার ও ফুটপাত থেকে হকারদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি অফিস সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া। রাস্তার পাশে থাকা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোর নিজস্ব জেনারেটরসহ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে সিএনজি স্টেশন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া। আন্তঃজেলা বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলো নগরীর বাইরে স্থানান্তর করা, ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে আধুনিকায়ন করে ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে আধুনিক কন্ট্রোল রুম স্থাপনের মাধ্যমে অটোমেটেড ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা, ঢাকা শহরের সব লেভেল ক্রসিং এবং রাস্তায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা।

মধ্যমেয়াদি সুপারিশ: গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা, নগরীতে মেট্রোরেল, মনোরেল, ওভারহেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ফুটপাত উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা, পরিকল্পিত বাস রুট পরিচালনা করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রাইভেটকার ও মিনিবাস বন্ধ করে অধিকসংখ্যক যাত্রী বহনের উপযোগী বাস চালু করা অর্থাৎ ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করা। অপরিকল্পিতভাবে স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হাসপাতাল, গার্মেন্ট, শিল্প-কারখানা উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা, ঢাকা মহানগরীতে সারা দেশ থেকে আসা মানুষের চাপ কমাতে সব পর্যায়ে সব বিভাগ ও দপ্তরের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং ঢাকা মহানগরীর ডিটেইল এরিয়া প্লান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ : আধুনিক নগরায়নের জন্য বিশিষ্ট নগর উন্নয়নবিদদের নিয়ে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা; ঢাকা মহানগরীতে সেবা প্রদানকারী বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন, নগরায়ন ইত্যাদি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে গুরুত্ব দেওয়া; ঢাকা মহানগরীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা; দেশের সব নাগরিককে সচেতন করতে সংবাদমাধ্যম, লিফলেট, পেপারিং এবং বিভিন্ন এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ম-কানুন স¤পর্কে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা। ঢাকার যানজট ও জনদুর্ভোগ নিরসনে ইতিমধ্যে বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কুড়িল ফ্লাইওভার ও মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার চালু করা হয়েছে, যার সুফল জনগণ ভোগ করছে। যানজট নিরসনে ২০১০ সালের ১৫ জুলাই থেকে ঢাকা মহানগর এলাকায় ২০ বছরের পুরনো ট্রাক এবং ২৫ বছরের পুরনো বাস নিষিদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও এর পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। -সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।