মেইন ম্যেনু

যানজট নিরসনে নতুন করে ভাবতে হবে : মুহিত

রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য নতুন করে ভাবতে বললেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা আর তীব্র যানজটে নাকাল নগরজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার উপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

২০১১ সালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ ব্যাপারে ২৫ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। সে সুপারিশ আজো আলোর মুখ দেখেনি।

২০১১ সাল থেকে ক্রমাগত রাজধানী ও দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে যানজট তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে গত মঙ্গলবার প্রবল বর্ষণে রাজধানীর জনজীবনে নেমে আসে স্মরণকালের চরম বিপর্যয়। একই অবস্থা বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও। সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাগুলোয় নৌকা চলাচলের অবস্থা সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে বুধবার অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০১১ সালে ঢাকায় যানজট নিরসন বিষয়ে আমি একটি সুপারিশ করেছিলাম। সেটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। দিন যাচ্ছে আর নগরীর যানজটের অবস্থা খারাপ হচ্ছে, জনজীবনে ভোগান্তি বাড়ছে। এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’

যানজট নিরসনে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকায় যানজট সমস্যা এবং মহানগরীর নতুন আবাসন এলাকা নিয়ে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন। বর্তমানে ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ৬ শতাংশ। স্যাটেলাইট টাউন ও ছোট শহর এবং গ্রাম উন্নয়নে অগ্রগতি ঘটলে রাজধানীর ওপর এই চাপ অবশ্যই কমবে। আমাদের চিন্তা করতে হবে যে, আগামী ১০ বছরে রাজধানীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে সামান্য চিড় পড়বে। তবে আগামী ২৫ বছর এই রকম হার থাকবে না। সেই অনুযায়ী আমাদের মহানগরের জনসংখ্যার অন্ততঃ ২৫ বছরের একটি প্রক্ষেপণ করতে হবে।’

এতে বলা হয়েছে, এই জনসংখ্যার বিস্ফোরণের জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উপর। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ভাল হলে যানজটেরও নিরসন হয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কথা চিন্তা করলে আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে, এই নগরে পাতাল রেল ছাড়া উপায় নেই। তাই প্রথমেই আমার মনে হয় যে, ভবিষ্যতে ঢাকা মহানগরের জন্য পাতাল রেলের একটি রুটপ্ল্যান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যানজট নিরসনে আমাদের উড়াল রাস্তা, বাইপাস, রেলওয়ে. ওভারপাস অথবা আন্ডারপাস এইসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। উড়াল রাস্তা ব্যাপকভাবে করা যাবে না এবং তার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটই বিবেচনা করা উচিত হবে।’

মুহিত বলেন, ‘যানজট নিরসনের জন্য আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমার মনে হয় এদিকে নজর দিলে অতি সত্ত্বর যথেষ্ঠ পরিবর্তন সাধন করা সম্ভব। এ বিষয়টি হচ্ছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ। বিআরটিএ একটি ট্রাফিক ম্যানুয়েলের কাজ হাতে নিয়েছে। এ বিষয়টিতে আমার ব্যক্তিগত কিছু পরামর্শ নিয়ে আমি তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করবো। ট্রাফিক ম্যানুয়েল যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি জরুরি ট্রাফিক প্রশাসন। আমার বিবেচনায় ঢাকায় ট্রাফিক প্রশাসন কোনমতেই পুলিশের হাতে থাকা উচিত নয়। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা প্রয়োজন। অবশ্য এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক নিযুক্তি ব্যাপকভাবে পুলিশ থেকেই হবে।’

রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক প্রশাসনকে অর্থমন্ত্রীর ৯ দফা পরামর্শ :

১. ট্রাফিক ম্যানুয়েল শক্তভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

২. যানবাহনের ফিটনেস লাইসেন্স ঠিকমত প্রদান এবং নির্দিষ্ট বয়সসীমার বেশি যানবাহনকে রাস্তা থেকে বিদায় করতে হবে।

৩. ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইট শক্তভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বর্তমানে ট্রাফিক লাইট একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ যখন তখন লাইটের ব্যবহার নাচক করে দেয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ট্রাফিক লাইট স্বনিয়ন্ত্রিত নয়; তা চৌমাথায় অবস্থান করা পুলিশের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

৪. লেন পরিবর্তনে বিধি-নিষেধ আরোপ করে তার কঠোর প্রয়োগ;

৫. চৌরাস্তা বা কোন জংশনে কোনমতেই ট্রাফিককে থামতে দেওয়া উচিত না। অথচ আমাদের এখানে জংশনে যাত্রীর ওঠানামা হয় এবং রিকশা, অটোরিকশা, বাস ইত্যাদি সেখানেই পার্ক করা হয়। চৌরাস্তার অন্ততঃ ৫০০ গজের মধ্যে কোন যানবাহন সিগন্যাল অনুসরণ করা ছাড়া থামতে পারবে না।

৬. ওয়ানওয়ে রাস্তাকে অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে ওয়ানওয়ে হিসেবেই ব্যবহার করা দরকার। সেখানে অনেক সময় দুরত্বের বিষয় বিবেচনা করে অথবা শ্লথগতির যানবাহনের কথা বিবেচনা করে উল্টোপথে যানবাহন চলতে দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত বিপদজনক এবং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত।

৭. শ্লথগতির যানবাহনকে ক্রমান্বয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ করার উদ্যোগে গতি আনতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় শ্লথগতির যানবাহন ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা যায়। যেমন-মতিঝিল-দিলকুশা এলাকার দ্রুত গতিসম্পন্ন যানবাহন একেবারে নিষিদ্ধ করা যায় এবং সেখানে শ্লথগতির যানবাহন চলতে পারে। এ জন্য অবশ্য প্রয়োজন এই এলাকার চারপাশে বিভিন্ন বহুতল পার্কিং এলাকা গড়ে তোলা।

৮. যানবাহনের পার্কিংয়ের জন্য আইন-কানুন নির্দিষ্ট করা এবং শক্তভাবে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বহুতল ভবন বা বাজারের জন্য যথেষ্ঠ পার্কিং এরিয়া এইসব ভবনে নিশ্চিত করতে হবে। এখন দেখা যাক যে, অনেক ক্ষেত্রে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে কিন্তু তা যৎসামান্য অথবা তা নানাভাবে বেদখলে আছে। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ শক্তিশালী হওয়া উচিত।

৯. ব্যাপকভাবে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত যানবাহনের উপরে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ করা। যেমন পিকআওয়ারে অতিরিক্ত টোল, গাড়ির আরোহীর ন্যূনতম সংখ্যা নির্ধারন এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জন্য নির্ধারিত লেন ব্যবহার। এ বিষয়ে একটি প্রাসঙ্গিক কথা বলবো এবং তা হলো নির্ধারিত লেনে গাড়ি চালানোর জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন এবং তা প্রয়োগ। এখন যে ভাবে লেন পরিবর্তন হয়, তাতে মনে হয় যে, লেন নির্ধারণের পুরো বিষয়টি একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে।