মেইন ম্যেনু

প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ ভারতের কাশ্মির : পর্ব-৬ (শেষ)

যুদ্ধস্থান খ্যাত কার্গিল পেরিয়ে অপরূপ পাহাড়ি জনপদ লাদাখ

জাফরং বা জাফরান চাষ ও উৎপাদনে কাশ্মির নামটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়রা জানালেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জাফরং উৎপাদন হয় কাশ্মিরেই। স্বচোখে তার কিছুটা নমুনা দেখা গেলো। শ্রীনগর থেকে ৩০/৪০কি. দূরে পাম্পর নামক এলাকায় হাজার হাজার বিঘা জমিতে জাফরং বা জাফরান চাষ বা উৎপাদন করা হচ্ছে। রাস্তার দু’ধারের ওই জমিতে চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর দেখা যায় এর মাঠ। বছরে একবারই এটি উৎপাদিত হয় বলে জানা গেলো। স্থানীয়দের তথ্যমতে প্রতি কেজি জাফরং বা জাফরানের মূল্য ২লাখ ২০হাজার রূপি। এটি চাষ করেই অনেকে অত্যন্ত ধনী হয়ে গেলেও বছরের এসময়ে জাফরাং চাষ করে থাকেন মাঠের মালিকরা। বৃহৎ ওই এলাকার বিশাল ওই মাঠের অনেক স্থানে সেনা সদস্যদের দেখা মিললো।

শ্রীনগরের উপকন্ঠে পাকিস্তান থেকে চলে আসা প্রবাহিত ‘ঝিলাম’ নদী চোখে পড়বে। যদিও নদীটি এখন নাব্যতা হারিয়ে কিছুটা ছোট হয়ে পড়েছে।

পাকিস্তানের কথা যখন চলো আসলো এবার পাকিস্তান সীমান্ত সর্ম্পকে কিছু তথ্য জানা যেতে পারে। ভারতের কাশ্মিরের শ্রীনগর থেকে পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফারাবাদে সরাসরি বাস চলাচল করে। শ্রীনগর থেকে পাকিস্তান শাসিত আজাদ কাশ্মিরের মুজাফফারাবাদের দূরত্ব ১৬৪কি.মি.। ভারত-পাকিস্তান হাইওয়ে রোড দিয়ে শ্রীনগর থেকে পাকিস্তান বর্ডার যথাক্রমে উরি-মিরপুর সীমান্তের দূরত্ব ৭০কি.মি.। ভারতের পাশে উরি ও পাকিস্তানের পাশে মিরপুর সীমান্ত দিয়ে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস চালু রয়েছে। পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মিরের অর্থাৎ পাকিস্তানের ভৌগলিক, ধর্মীয়, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠান, জীবন-জীবিকাসহ অন্যান্য অনেক বিষয়ের সাথে ভারতের কাশ্মিরের জনগণের বেশ মিল রয়েছে বলে জানান স্থানীয় অনেকে।

বিশাল জাফরং ক্ষেতের একাংশ

বিশাল জাফরং ক্ষেতের একাংশ

ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মির (জে.কে) রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো ‘কার্গিল’ ও ‘লাদাখ’। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক, ভয়ংকর ও বৃহৎ যুদ্ধ হয়েছিল কার্গিলে। শ্রীনগর থেকে ২০৫কি.মি. দূরে দূর্গম কার্গিল শুধুই ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের জন্যই খ্যাত নয় বরং প্রাকৃতিক, ঠান্ডা, বরফের পাহাড়ি এলাকাসহ নানান দিক থেকে বিখ্যাত। এখানে বরফের মধ্যে সানসেট দেখা যায়।

লাদাখ ফাকা পাহাড়ের (স্থানীয়দের ভাষায় ল্যাংটা পাহাড়) জন্য বিখ্যাত। এখানকার পাহাড়গুলোতে গাছগাছালি নেই বললেই চলে। প্রাগৈতিহাসিক, সুন্দর ও টুরিস্ট এলাকা হিসেবে লাদাখের সৌন্দর্য সকলকে বিমহিত করে। বর্তমানে ওখানে বিভিন্ন ছবির শ্যুটিং করা হয়ে থাকে বলে জানা গেছে। লাদাখের বড় শহর হলো ‘লেহ’। লেহ শহর শ্রীনগর থেকে আরো প্রায় সাড়ে ৪’শ কি.মি দূরে। কার্গিল হয়ে লেহ যেতে হয়। লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা। গাড়িতে সময় লাগে ২/৩ দিন। সম্পূর্ণ পাহাড়ি দূর্গম রাস্তায় না গিয়ে অনেকে প্লেনে যাতায়াত করে থাকেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জম্মু ও কাশ্মিরের (জে.কে.) শীতকালীন রাজধানী জম্মুতে শতকরা ৬০ভাগ হিন্দু, ৪০ভাগ মুসলিম, গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর ও কাশ্মিরের অন্য ছোট শহরে ৯৫ভাগ মুসলিম ও বাকি অন্যান্য, কার্গিলে প্রায় শতভাগ মুসলিম, লাদাখে প্রায় শতভাগ বৌদ্ধ সম্প্রদায় বসবাস করে।

টুরিস্ট সংশ্লিষ্টরা জানালেন, কাশ্মির ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে সুন্দর সময় মার্চ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। ওই সময় প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মিরের সৌন্দর্য যেমন খুবই প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে তেমনি বরফ পরার ছোয়া পাওয়া যায়। প্রচন্ড ঠান্ডা থাকলেও ভূস্বর্গের ছোয়া ঠিকঠাক অনুভূত হয়। জম্মু থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত প্রায় ৩’শ কি.মি. দূর্গম পাহাড়ী রাস্তায় এ্যাডভেঞ্চার যেমন আছে কষ্টও তেমনি আছে। ওটি বাদ দিলে সবচেয়ে ভালো কোলকাতা কিংবা দিল্লি থেকে প্লেনে (বাই এয়ারে) শ্রীনগর যাওয়া। তাছাড়াও জম্মু থেকেও প্লেনে শ্রীনগরে যাওয়া যায়। শ্রীনগর থেকে কার্গিল কোন এয়ারপোর্ট না থাকলেও লাদাখের লেহ’তে এয়ারপোর্ট থাকায় সেখানেও প্লেনে যাতায়াত করা যায়। আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য প্লেনে যাতায়াতই সবচেয়ে ভালো কেননা সড়ক পথের ঝাক্কি ঝামেলা যেমন পোহাতে হয়না তেমনি সময়ও বাঁচে।

জম্মু ও কাশ্মিরের প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য মূলত শ্রীনগর ও কাশ্মিরের অন্যান্য এলাকাতেই বেশি। প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ অবলোকন করার লোভ যেমন আমি সামলাতে পারেনি তেমিন আমার মনে হয়েছে সকল ভ্রমণ পিপাসূদের বরণ করে নেয়ার জন্য ভূস্বর্গ কাশ্মির প্রায় সবসময়ই প্রস্তুত।

সামর্থ্য, সময়, সুযোগ ও মানসিকতা যখনই একসাথে মিলে যাবে তখনই নিজের মননকে আরো বিকশিত, ধারণা-জ্ঞানকে আরো আলোকিত, বিবেককে ইতিবাচক উচ্চতায়, দেহ-মন-ব্রেনকে উৎফুল্ল রাখার প্রয়াসে পৃথিবীর দর্শর্ণীয় এলাকা ঘুরে দেখা একটি পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গি বলে অনেকে মনে করেন।

শেষ

 

লেখক:
আরিফ মাহমুদ
সম্পাদক
আওয়ার নিউজ বিডি ডটকম

পর্ব-১ : জম্মু থেকে একমাত্র দূর্গম পাহাড়ি পথে রয়েছে আড়াই কি.মি’র জওহার ট্যানেল

পর্ব-২ : শ্রীনগরের ডাল লেক যেমন বিখ্যাত তেমনি ভেড়া-ছাগলের পালও প্রসিদ্ধ

পর্ব-৩ : এশিয়ার বৃহত্তম শ্রীনগর জামে মসজিদ, ঐতিহাসিক নিদর্শন হযরত বাল দরগাহ শরিফ মসজিদ

পর্ব-৪ : প্রকৃতির হৃদয়স্পর্শী অপরূপতায় সজ্জিত প্যাহেলগাম, গুলমার্গ

পর্ব-৫ : কাশ্মির নামের সাথেই জড়িয়ে আছে আপেল, শাল, উইলো গাছের ব্যাট



« (পূর্বের সংবাদ)