মেইন ম্যেনু

যে কারণে অভিবাসী নৌকা ভিড়তে দেয় না অস্ট্রেলিয়া

আজ ১২ আগষ্ট প্রথম আলোয় ‘অস্ট্রেলিয়ার পথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা’ শিরোনামের একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। এতে দেয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনী কর্তৃক ২৩ বাংলাদেশী সহ ২৫ জনের একটি নৌকাকে ইন্দোনেশিয়ায় ফেরত পাঠানোর তথ্য। সকালে রিপোর্টটি পড়ার পর প্রথম আলোর লিংকটি এদেশের চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেল এবিসি নিউজ টুয়েন্টিফোরকে পাঠিয়েছি। কারণ তারা এ ধরনের নিউজ প্রায় করে। চাইলে এ নিউজটির ফলো করতে পারবে। এখন আমি লিখতে চাইছি প্রথম আলোর রিপোর্টের পরের অংশ। কেনো এই নৌকাগুলো ভিড়তে দেয় না অস্ট্রেলিয়া।

বাংলাদেশে যেমন কিছু ইস্যু পত্রপত্রিকায় সব সময় থাকে, অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়ার এ ধরনের ইস্যুর নাম ‘বোট পিপল’! আগে সাগরের জলসীমায় অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে নতুন একটা বোট তথা নৌকা আসার খবর মিডিয়ায় পৌঁছবার পর হুলস্থুল পড়ে যেতো! আকাশ থেকে এ ধরনের নৌকা, তাদের যাত্রীদের উদ্ধার অভিযান অনুসরণ করতো অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া। এমন কোনো একটি নৌকা ডুবে গেলে উদ্ধারকর্মীদের তুলোধুনো করা হতো এসব মিডিয়া রিপোর্টে। কিন্তু অনেক দিন নতুন এমন কোনো নৌকা আসার খবর মিডিয়ায় নেই! মাঝে মাঝে কিছু নৌকা তাড়িয়ে দেয়ার খবর আসে। কিছুদিন আগে একটা রিপোর্ট নিয়ে এখানকার মিডিয়ায় খুব হৈচৈ হয়েছে। তাহলো ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা নৌকার চালকদের ৬ হাজার ডলার করে ঘুষ দিয়ে এর যাত্রীদের আবার ইন্দোনেশিয়ায় ফেরত পাঠিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনী! মিডিয়ায় এ বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ হবার কারণ ঘুষের বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ান সমাজে প্রচলিত বা পরিচিত না। আইনের চোখেও এটি গুরুতর অপরাধ। সরকারি লোকজন অবশ্য অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী বোঝাই সব নৌকা আগে মূলত আসতো ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকেই। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকেও আসতো অনেক নৌকা। একবার সিডনির এক ডিটেনশন সেন্টারে আমি এক শ্রীলংকান বন্দী যুবকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিলো তারা নৌকা নিয়ে শ্রীলংকা থেকে রওয়ানা হয়। পথে তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে তারা সাগরে ভাসতে থাকে। শ্রীলংকায় খবর পাঠালে সেখান থেকে নৌকা মেরামতের লোক আসে। বিকল নৌকাটি আবার সচল হয়ে চলতে থাকে। এরমাঝে তাদের এক সহযাত্রীর ম্যালেরিয়ায় মরমর অবস্থা হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার নৌসীমায় পৌঁছালে তারা তাদের মূমূর্ষ সহযাত্রীর কথা জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীকে একটি এসওএস পাঠায়। নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার এসে তখন তাদের উদ্ধার-গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

কিন্তু অভিবাসীদের নৌকা অস্ট্রেলিয়া পাঠাতে মানব পাচারকারী দালালদের জনপ্রিয় স্টার্টিং পয়েন্ট ইন্দোনেশিয়ার উপকূল। মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সহ নানা স্থান থেকে দালালরা এমন শিকার সংগ্রহ করতো। এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছানোর কথা বলে দালালরা তাদের কাছে থেকে ১৫-২০ হাজার ডলার করে নিয়েছে। আবার নৌকা ছাড়ার সময় ১০০ ডলারের যাত্রী পেলেও তাকে বা তাদেরকে বাদ দেয়নি! প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আসতে গিয়ে নৌকাডুবির ঘটনায়ও প্রাণহানির ঘটে। এর অন্যতম কারণ ক্রটিপূর্ণ পুরনো নৌকা! যেহেতু এই নৌকাটি আর কোনোদিন অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরবেনা, দালালরা তাই এসব পাচারে ভালো কোনো নৌকা দিতোনা। আবার এ নিয়ে মজার একটা গবেষনার তথ্যও শুনেছি। এখন সিডনির রকডেল এলাকায় থাকেন এমন এক বাংলাদেশী যুবকের সঙ্গে আলাপে তথ্যটি পাওয়া যায়। এই যুবক এক সময় মালয়েশিয়ায় থাকতেন। এমন একটি নৌকায় করে অস্ট্রেলিয়া এসেছিলেন। এই যুবকের গবেষনাটি হচ্ছে ইতালির দিকে যে নৌকা যায় সেগুলোর এক’শ নৌকার মধ্যে গড়ে একটি নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হয়। আর অস্ট্রেলিয়াগামী হাজার নৌকার মধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয় একটি নৌকা! গবেষনা বটে !

আগে এমন অভিবাসী বোঝাই নৌকা অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় পাওয়া গেলে অস্ট্রেলিয়ান নৌবাহিনীর সদস্যরা তাদের উদ্ধার-আটকের পর ক্রিসমাস আইল্যান্ড নামের এই দ্বীপে নিয়ে যেতো। এই দ্বীপটির সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মূল খন্ডের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ নেই। হেলিকপ্টার বা ছোট বিমানে পার্থ থেকে যেতে বেশ সময় লাগে। অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় বেআইনিভাবে গ্রেফতারকৃত এসব লোকজনকে রাখা হতো ক্রিসমাস আইল্যান্ডের ডিটেনশন সেন্টারে। অস্ট্রেলিয়ার জেলখানাগুলোর নাম ডিটেনশন সেন্টার, কারেকশন সেন্টার এসব। ক্রিসমাস আইল্যান্ডের ডিটেনশন সেন্টারে রেখে আটককৃতদের দেশত্যাগের কাহিনী শোনা- লেখা হতো। যদি রাজনৈতিক কারণে স্বদেশে কারো জীবন বিপন্ন মনে হতো তাদের পক্ষে নেয়া হতো রাজনৈতিক আশ্রয়ের দরখাস্ত। কারণ অস্ট্রেলিয়ার আইনটি এমন যদি কেউ এসে তার কাছে প্রমান করতে পারে যে তার জীবন বিপন্ন, তবে তাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য এ রাষ্ট্র। কিন্তু এই আবেদনটিই শেষ নয়। এসব কাহিনীর সত্যতা পরীক্ষা-তদন্ত করা হয় অস্ট্রেলিয়া সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ-অর্থায়নে। যেমন বাংলাদেশ থেকে কেউ এসে যদি বলে তার জীবন বিপন্ন তার আবেদনের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্ব দেয়া হবে ড. কামালের মতো কোন বড় আইনজীবীর প্রতিষ্ঠানকে। এরজন্যে এসব আইন সংস্থাকে উচ্চহারে পারিশ্রমিক দেয়া হয়। সে জন্যে ভবিষ্যতে এমন কাজ পাবার আশায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো কাজটি শতভাগ আন্তরিকতা, সততার সঙ্গে করে। কাজেই রাজনৈতিক হয়রানির বানানো কাল্পনিক কাহিনী এদের কাছে বলে লাভ নেই। বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোক মূলত দারিদ্র আর উন্নত জীবনের আশায় এভাবে জীবন হাতে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আসতে চায়। এসব অর্থনৈতিক অভিবাসন ইচ্ছুকদের অস্ট্রেলিয়ার আইনে সুবিধা পাবার কোনো সহজ পথ নেই।

এই নৌকা যাত্রী অভিবাসন প্রত্যাশীদের পিছনে এমন পদে পদে খরচ অস্ট্রেলিয়া সরকারের। প্রথমেই ডাক পড়ে একজন দোভাষীর। কারণ এসব লোকজন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইংরেজিতে কথা বলতে পারেনা। সরকারকে সে কারণে সবার আগে স্ব স্ব ভাষার একজন দোভাষীকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এমন একজন দোভাষীকে বিমানের টিকেট, থাকার ব্যবস্থা সহ নানাকিছু দিয়ে এদের কাছে নিয়ে যেতে হয়। দূরবর্তী স্পটগুলোতে এমন একজন দোভাষীর প্রতিদিনের পারিশ্রমিক পাঁচশ ডলার। শনি-রোববার তাদেরকে আট’শ ডলার করে দিতে হয়। এমন এদের ডাক্তারের খরচ, খাবার খরচ, ডিটেনশন সেন্টারগুলোর স্টাফ সহ পরিচালনার নানা খরচ। ডিটেনশন সেন্টারে আবার প্রতিটি বন্দীকে সাপ্তাহিক হাত খরচও দিতে হয়। ডিটেনশন সেন্টারে অনভ্যস্ত জীম করতে গিয়ে কোমর বা হাত-পা ভেঙ্গে ফেলেছেন, চিকিৎসাধীন এমন অনেক বন্দীও আছেন। এদেরকে দিতে হয় আইনজীবীর খরচও। যতদিন না মামলা শেষ হয় ততদিন এসব রাহা খরচ চালাতে হয় সরকারকে। এসব বন্দীরা আবার সরকারকে চাপে ফেলতে মানবাধিকার কর্মীদের তাদের পক্ষে টানতে নানা অভিযোগে মাঝে মাঝে ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেখানে দাঙ্গার পরিস্থিতিও তৈরি করে। এসব কারণে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিশেষ বিব্রত অস্ট্রেলিয়ার সরকার ও করদাতা জনগন! তাদের করের টাকায় এভাবে বিদেশ থেকে আসা অভিবাসন ইচ্ছুকদের খরচ সামাল দেয়া নিয়ে ভোটাররা ভীষন বিরক্ত।

অস্ট্রেলিয়ার গত লেবার পার্টির সরকারের আমলে নৌকায় করে এমন পঞ্চাশ হাজারের বেশি লোকজন এসেছিলো। গত নির্বাচনে যে লেবার পার্টি হেরে গিয়েছিল এর পিছনে এসব নৌকার লোকজনকে অন্যতম দায়ী মনে করা হয়। বলা হয় নৌকার ধাক্কায় পড়ে গিয়েছিল লেবার সরকার! বর্তমান ক্ষমতাসীন লিবারেল কোয়ালিশন সরকার এসব নৌকা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে নৌবাহিনীর একজন চার তারকা জেনারেলের নেতৃত্বে সাগর পাহারায় গঠন করে বিশেষ একটি স্কোয়াড। এই স্কোয়াডটির সর্বক্ষনিক নজরদারির কারণে এমন নৌকা আসা এক রকম এখন বন্ধ। মাঝেমধ্যে জানা যায় এমন যাত্রী বোঝাই নৌকা তাড়িয়ে দেয়া অথবা নৌকার চালকদের ম্যানেজ করে যাত্রী বোঝাই নৌকা ফিরিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়ায়। আবার এসব নৌকাযাত্রীদের নিরুৎসাহিত করতে এখন আর এমন লোকজনকে অস্ট্রেলিয়াতেও রাখা হয়না। গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাপুয়া নিউগিনি, নারু এসব দেশের বিশেষ জেলখানায়। সে জেলখানাগুলোরও রাহা খরচ চালায় অস্ট্রেলিয়া সরকার। এসব খরচ জোগাতে অনিচ্ছুক করদাতাদের মন রক্ষায় সরকার এসব নৌকাযাত্রীদের নিরুৎসাহ-রুখে দেবার সব চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।