মেইন ম্যেনু

যে কারণে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ, গ্রিনল্যান্ড নয়

অস্ট্রেলিয়া সমুদ্রঘেরা বিশাল আয়তনের দেশ হলেও গ্রিনল্যান্ড আজো একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশ বা অঞ্চল, যা ডেনমার্ক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। অস্ট্রেলিয়া স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ, তবে প্রতীকী অর্থে এখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ।

যদি গ্রিনল্যান্ডকে একটি দেশ ধরে নেওয়া হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ে। অস্ট্রেলিয়া শুধু দেশই নয়, একটি মহাদেশের নাম। প্রশান্ত মহাসগারীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপদেশ নিয়ে এই মহাদেশ গঠিত। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড মহাদেশ নয়। দেশটি স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ বা দ্বীপদেশ হিসেবে।

অস্ট্রেলিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের বিশেষ কিছু বিষয়ে সাদৃশ্য আছে। দেশ দুটির চারপাশ সমুদ্রের বিশাল জলরাশি দিয়ে ঘেরা। তাদের জনবসতি গড়ে উঠেছে প্রধানত সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায়। এর কারণ হলো- প্রাকৃতিক বৈরিতা। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় এই দুই দেশের জনগণকে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার সমস্যা বিশাল মরুভূমি আর গ্রিননল্যান্ডের সমস্যা বরফঢাকা বিশাল প্রান্তর। অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে, যার আয়তন ৭.৭৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। এটি পৃথিবীর ষষ্ঠ সর্ববৃহৎ দেশ। এদিকে গ্রীনল্যান্ড আর্কটিক সাগর এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে। এর আয়তন ২.১৬ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এবং এটি আয়তনের দিক দিয়ে পৃথিবীর ১২তম দেশ।

অস্ট্রেলিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে কিছু বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। জলবায়ুর পার্থক্য ছাড়াও এই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো জনসংখ্যা। অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ২২ মিলিয়ন (২ কোটি ২০ লাখ) এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে এটি পৃথিবীর ৫৫তম দেশ। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডে আছে মাত্র ৫৭ হাজার মানুষ। সে হিসাবে জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক দিয়ে এই দেশটির অবস্থান বিশ্বে ২০৫তম।

তবে জনবসতির হিসাবে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের স্বীকৃতি পেয়েছে, তা কিন্তু নয়। আসলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিচার করে মহাদেশের স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। যদি তাই হতো, তাহলে এন্টার্কটিকা কখনোই মহাদেশের স্বীকৃতি পেত না।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলকে বিভিন্ন মহাদেশে বিভক্ত করার জন্য যেসব শর্ত মেনে চলা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- নিজস্ব গঠনাত্মক প্লেট থাকতে হবে, থাকতে হবে নিজস্ব কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ, আর থাকতে হবে অন্যদের চেয়ে একেবারেই স্বতন্ত্র নিজস্ব সংস্কৃতি।

অস্ট্রেলিয়া এককভাবে একটি গঠনাত্মক প্লেটে অবস্থিত, যা অস্ট্রেলীয় প্লেট নামে পরিচিত। এর রয়েছে অনন্য কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণী, যা অন্য কোথাও দেখা যায় না। যেমন- অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে ক্যাঙ্গারু, ওম্ব্যাট ও তাসম্যানীয় ডেভিল নামক প্রাণী, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এ দেশের আদিবাসীদের সংস্কৃতিও অনন্য। তা ছাড়া দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া সবচেয়ে বেশি পাশ্চাত্য আদর্শের অধিকারী, যা একে এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে।

অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান হলো উত্তর আমেরিকান গঠনাত্মক প্লেটে। কিন্তু এই প্লেটটি ভূতাত্ত্বিকভাবে কানাডা থেকে আলাদা নয়। যদিও গ্রিনল্যান্ডে ১৫ প্রজাতির অনন্য কিছু উদ্ভিদ রয়েছে, কিন্তু এখানকার স্থানীয় কিছু প্রাণী যেমন- পোলার বিয়ার, হরিণ এবং আর্কটিক শেয়াল কানাডাতেও দেখা যায়। গ্রিনল্যান্ডের সংস্কৃতিকেও বৃহত্তর উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধরা হয়।

অনেকেই অবশ্য গঠনাত্মক প্লেটের বিষয়টিকে অনাবশ্যক মনে করেন। কারণ, ইউরোপ ও এশিয়ার বেশিরভাগ অংশটাই ইউরোশিয়ান গঠনাত্মক প্লেট নামে একটি একক গঠনাত্মক প্লেটে অবস্থিত। কিন্তু আমরা জানি, ইউরোপ ও এশিয়া দুটো আলাদা মহাদেশ। আবার ভারতেরও রয়েছে নিজস্ব গঠনাত্মক প্লেট!

তবে মহাদেশ হওয়ার ক্ষেত্রে এসব কিছু ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে সংস্কৃতির বিষয়টি। এই কারণে ইউরোপ ও এশিয়া দুটি আলাদা মহাদেশ। নিজস্ব গঠনাত্মক প্লেট থাকা সত্ত্বেও ভারত এশিয়া মহাদেশেরই অংশ।

সংস্কৃতিসহ উল্লিখিত বিষয়গুলোর বেশিভাগটাই পূরণ করতে হবে মহাদেশের স্বীকৃতি পেতে হলে। আর এই দিক দিয়ে সফল অস্ট্রেলিয়া। তাই অস্ট্রেলিয়া স্বীকৃতি পেয়েছে সবচেয়ে ছোট মহাদেশ হিসেবে। আর গ্রিনল্যান্ড মহাদেশ নয়, পেয়েছে সবচেয়ে বড় দ্বীপদেশের স্বীকৃতি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়া বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নও মহাদেশের স্বীকৃতি পায়নি।