মেইন ম্যেনু

যে কারণে এতো জনপ্রিয় জাকির নায়েক

জাকির নায়েকের জনপ্রিয়তার পেছনে ইসলামের বহুমুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিষয়টিকেই মুখ্য বলে মনে করেন তার অনুসারী-ভক্তরা। বাংলাদেশের কওমি আলেমরা তাকে ‘উগ্র সালাফি’ মতবাদের প্রচারক হিসেবে দেখলেও আগ্রহী-ভক্তরা বলছেন, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ হয়েও জাকির নায়েক ইসলাম ধর্মের ব্যাখ্যা, তুলনামূলক ধর্ম আলোচনাসহ অন্যান্য ধর্মগুরুদের বিতর্কে হারানোর যোগ্যতা অব্যাহতভাবে প্রমাণ করে চলেছেন।–বাংলা ট্রিবিউন।

এমনকী ১/১১ পরবর্তী মুসলমানদের দৈন্যদশার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিকল্পনা কাজ করেছে, সেটিও জাকির নায়েক প্রকাশ্যে তুলে এনেছেন বলে গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে এমন অভিমত জানান ভক্ত, আগ্রহী, সমালোচক ও কয়েকজন লেখক।

ইসলামী লেখক মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, জাকির নায়েক যে ধারায় ইসলামিক আলোচনা তুলে ধরেন, এটা আসলেই একটি নতুন ও চমৎকার ধারা। যদিও এই ধারার শুরুটা তিনি করেননি। শুরু করেছেন তার গুরু ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিক শায়খ আহমাদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫) গত শতকের মধ্যভাগে । যার মূলকথা হলো, বিভিন্ন ধর্ম ও বস্তুগত বিষয়ের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ব্যাখ্যা করা। পরবর্তী সময়ে ডা. জাকির নায়েক এই ধারার সঙ্গে মুসলিম সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার ও আচরণ-সম্পর্কিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে এই ধারাকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলেন ।

তবে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও লেখক ফরীদ আহমদ রেজা মনে করেন, চটকদার বক্তব্য যা ইসলামি ঘরানার বক্তাদের মধ্যে দেখা যায় না—এমন বক্তব্যেই জাকির নায়েক জনপ্রিয়। তার ভাষ্য, বাইবেল, বেদ-উপনিষদ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের রেফারেন্স, মুখস্থবিদ্যা, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আলোচনা করেন। রাজনীতিবিমুক্ত ইসলামি আলোচনার কারণেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন জাকির নায়েক।

জানা যায়, ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় জড়িত একজনের ফেসবুক স্ট্যটাসের সূত্রেই বাংলাদেশ-ভারতে আলোচনা-সমালোচনার পাদপ্রদীপে এসেছেন জাকির নায়েক। ইতোমধ্যে ভারত সরকার তার বাসা ও রিসার্চ সেন্টারে নজরদারি শুরু করার পাশাপাশি তার মালিকানাধীন পিস টিভি বন্ধ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। বন্ধের পথে বাংলাদেশে পিস টিভির সম্প্রচারও। জাকির নায়েকবিরোধী দুই সরকারের এই কঠোর অবস্থানের পরও জাকির নায়েকের জনপ্রিয়তায় বিরূপ প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করছেন তার ভক্তদের কয়েকজন।

রবিবার বিকেল সাড়ে তিনটা নাগাদ জাকির নায়েকের ফেসবুক পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ২৪ লাখ ৮ হাজার ৪৩০।

উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, ‘ডা. জাকির বলেন, তার লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষিত মুসলমানরা যারা তাদের নিজ ধর্মকে ত্রুটিপূর্ণ, সেকেলে বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলামের ওপর অপপ্রচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার বলতে যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১-এর আক্রমণ বা নাইন ইলেভেনের সাজানো নাটককে তিনি বোঝান। নায়েক আরও বলেন, তীব্র ইসলামবিরোধী প্রচারণা সত্ত্বেও ২০০১ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে ৩৪ হাজার মার্কিন নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করে। নায়েকের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলাম একটি কার্যকারণ ও যুক্তির ধর্ম, এবং কোরআনে বিজ্ঞান সম্পর্কিত ১০০০ বাণী রয়েছে, যা তিনি পশ্চিমা ধর্মান্তরিত মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

উইকিপিডিয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করা জাকির নায়েকের সফলতা সম্পর্কে মাওলানা মনযূরুল হক বলেন, তিনি সবচে’ বেশি সফলতা পান ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামক একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করার মাধ্যমে; যেটি পিস টিভি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে থাকে বিভিন্ন ভাষায় অন্তত ১৫০টি দেশে । টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি এমন একটি সময়ে ইসলাম প্রচারের কৌশল গ্রহণ করেন, যখন উপমহাদেশের ইসলামি পণ্ডিতরা টিভি চ্যানেলে বক্তব্য দেওয়া জায়েয হবে কিনা—তা নিয়ে দোদুল্যমনতায় ভুগছেন। অথচ এই সময়টাতেই সারাবিশ্বের মুসলিমরা ইসলামের মধ্যে নানাজনের নানামত ও আদর্শ এবং মুসলিম লিডারদের মধ্যে অনৈক্য ও কোন্দল দেখে ভ্রান্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন । সুতরাং মুসলমানরা যখন দেখলেন, জাকির নায়েক বিভিন্ন ভাষায় কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করছেন প্রতিটি টেকস্ট ও ভার্সন এবং একইসঙ্গে রেফারেন্স নম্বর উল্লেখ করে করে, তখন তারা নির্দ্বিধায় তার বক্তব্য লুফে নিতে থাকেন।

রাজশাহীর জাহিদুর রহমান জুয়েল বলেন, যেকোনও ধর্মের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতাই জাকির নায়েকের জনপ্রিয়তার কারণ।

উন্নয়নকর্মী তারেক মাহমুদ সজীব মনে করেন, কোরআনের আলোকে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে ইসলামের তুলনা করায় জাকির নায়কের আলোচনায় অমুসলিমরাও অনুপ্রাণিত হয়। এছাড়া তিনি মার্কিন, ইউকে এর ষড়যন্ত্র প্রকাশ করেন। জাকির নায়েক বলছেন, সন্ত্রাসী যেকোনও ধর্মেই আছে. তারা খ্রিস্টান, হিন্দু ইত্যাদি থেকেও আসছে কিন্তু সবসময় মুসলিমদের মিডিয়াতে হাইলাইট করা হয়।

সংবাদকর্মী ও ছড়াকার আবিদ আজম মনে করেন, সত্যিকার ইসলামের স্বরূপ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। ব্যাখ্যা করেছেন অন্য ধর্ম নিয়েও। ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা ও অপরিহার্যতার ব্যাপারে উচ্চকিত তিনি। ইসলাম, কোরআন ও হাদিসের আলোকে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমি ধারণা করি, জাকির কোনও এজেন্ডা নিয়ে নয়, সত্যিকারের ইসলামের মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও বিধানের ব্যাখাকারী। তিনি আল্লাহ ও রাসুলের ইসলামের অনুসারী। ‘টুপিতে-দাড়িতে-জামাতে’ ইসলাম নন তিনি। আর ইসলামে জঙ্গিবাদ, খুন হত্যা, ধর্ষণের বিন্দুমাত্র আশ্রয় নেই। জাকির নায়েক কোনও বিতর্কিত গোষ্ঠী কিংবা সিআইএ-এর এজেন্ড নন। শুধু মানবতার কল্যাণের প্রতিনিধিত্বকারী।

ঢাকা কলেজের স্নাতক শিক্ষার্থী ও মাসিক রাহমানী পয়গামের সহকারী সম্পাদক মাওলানা ইহসানুল হক বলেন, প্রথমত, জাকির নায়েকের আলোচনায় অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ থাকে। এটা শ্রোতাতের পছন্দ। দ্বিতীয়ত, তিনি সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হওয়ার কারণে শিক্ষিতমহলে তিনি জনপ্রিয়। তৃতীয়ত, তার কথাগুলো তিনি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। ভালো আলোচক অনেকেই আছেন। কিন্তু তারা মানুষের ঘরে ঘরে প্রবেশ করতে পারছেন না। যেটি তিনি পিস টিভির মাধ্যমে সম্ভব করেছেন।

চতুর্থত, অনেকক্ষেত্রে তিনি বিপরীতমুখী কথা বলেন। আর বিপরীত কথা মানুষকে বেশি আকর্ষণ করে। সর্বশেষ, তার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। মানুষ এ কারণেই ভাবেন, যে ইসলাম সম্পর্কে জানতে আর কারও কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ও ইসলামি চিন্তাবিদ ড. আহমদ আবদুল কাদের মনে করেন, জাকির নায়েক ভারতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার পেছনে কারণ হচ্ছে, তিনি কোরআন হাদিসের আলোকেই বক্তব্য দেন। ইসলামের প্রচারের তিনি নতুন পথ বের করেছেন। নতুন সব সময়ই জনপ্রিয় হয়। তুলনামূলক ধর্মের আলোচনাও তাকে জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়েছে।

সাংবাদিক মেসবাহ শিমুল বলেন, অকাট্য যুক্তি, কোরআন-হাদিসের পাশাপাশি সবগুলো ধর্মগ্রন্থের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসহ উদ্ধৃতি দেন জাকির নায়েক। কোনো ধরনের গোঁজামিল বা বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে না তার। এ কারণেই তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

ভারতের নাগরিক জাকির নায়েকের আলোচনা সমালোচনায় কথা উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। তার জনপ্রিয়তা নিয়ে লিখেছেন তার অনুরক্তরাও।

মৌলভীবাজারের দেলোয়ার হোসাইন বলেছেন, কী বলব? বলতে চাইতো অনেক কিছু। একজন জাকির নায়েক দূর থেকে আমাকে যা শিখিয়েছেন, তার মূল্য পৃথিবী সমান। অথচ এদেশের অসংখ্য আঁতেল আলেম নিজেদের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত।

উইকিপিডিয়া তথ্য দিচ্ছে, জাকির আবদুল করিম নায়েক ১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটার্স হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তারপর তিনি কিশিনচাঁদ চেল্লারাম কলেজে ভর্তি হন। মেডিসিনের ওপর টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড নাইর হসপিটালে ভর্তি হন। এরপর, তিনি ইউনিভার্সিটি অব মুম্বাই থেকে ব্যাচেলর অব মেডিসিন সার্জারি বা এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি ইসলাম-ধর্ম প্রচারের কার্যক্রম শুরু করেন এবং আইআরএফ প্রতিষ্ঠা করেন।

জাকির নায়েক ইসলাম ধর্মসম্পর্কিত অনেক বিষয়ে লেকচার দিয়েছেন ও বিতর্ক করেছেন। থমাস ব্লম হানসেন লিখেছেন যে, ডা. জাকিরের বিভিন্ন ভাষায় কোরআন ও হাদিস সাহিত্য মনে রাখার ভঙ্গি ও তার ধর্মপ্রচার কর্মকাণ্ড মুসলিমদের মাঝে তাকে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।।তার অন্যতম বিখ্যাত বিতর্ক হয় ২০০০ সালের এপ্রিলে ‘বিজ্ঞানের আলোয় কোরআন ও বাইবেল’ বিষয়ে শিকাগোতে উইলিয়াম ক্যাম্পবেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইসলাম একটি কার্যকারণ ও যুক্তির ধর্ম এবং কুরআনে বিজ্ঞানবিষয়ক প্রায় ১০০০ আয়াত আছে।’ সেখানে তিনি পশ্চিমা কনভার্টের সংখ্যা ব্যাখ্যা করেন। ডা. জাকিরের অন্যতম জনপ্রিয় থিম হলো বিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে কোরআনকে যাচাই করা। ২১ জানুয়ারি ২০০৬ ডা. জাকির শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের সঙ্গে ‘ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে ঈশ্বর’ বিষয়ে ব্যাঙ্গালোরে বিতর্ক করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সহ-সভাপতি শায়খুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী বলেন, তার কাজে নতুনত্ব আছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন বা আলোচনা আছে। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ হয়ে ধার্মিক হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছেন। আমি অসুস্থ, বিস্তারিত বলতে পারব না।

খাদিমুল ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম-সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান মনে করেন, জাকির নায়েক সাধারণদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ হচ্ছে, তার বক্তব্য প্রচারের মাধ্যম। তিনি তার বক্তব্য সহজে পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু তিনি প্রকৃত হকপন্থী নন। তাকে বুঝতে সময় লাগছে আলেমদের। তিনি সালাফি মতবাদেরও কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। তার মধ্যে ইসলামের আমল নেই। টাই পরা লোক। তার আক্বিদেই বলছে, যে তিনি ইসলামের মুখপাত্র হতে পারেন না।