মেইন ম্যেনু

যে কারণে ভাঙল জাসদ

দুই দিনের সম্মেলনের শেষ দিনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। সদ্য সাবেক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শরিফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশের অভিযোগ, সভাপতি হাসানুল হক ইনুর একগুঁয়েমি, গঠনতন্ত্র না মানা ও মন্ত্রী হওয়ার পর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার-প্রবণতার কারণে তাদের আলাদা হতে হয়েছে।

ইনুর অনুগত অংশটির অভিযোগ, নেতৃত্বের লিপ্সায় তারা (আম্বিয়ারা) দল ছেড়েছেন। তাদের আলাদা হয়ে যাওয়াটা রহস্যজনকও বলছেন এই অংশটি।

ইনুর বিরোধী অংশের নেতারা বলছেন, শুধু একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের বা দলীয় প্রধানের বিরোধিতা করাই জাসদের রাজনীতি নয়। জাসদ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করছে। কিন্তু দলীয় সভাপতি ইনুর একগুঁয়ে ভূমিকায় তৃণমূলে জাসদ দিন দিন জনপ্রিয়তা হারাতে বসেছে।

দলটির বেরিয়ে যাওয়া অংশের নেতারা মনে করেন, সভাপতির একগুঁয়ে আচরণের কারণে জোটের নেতৃত্বাধীন দলের নেতারা ও সংসদের বিরোধী দল তাদের সমালোচনা করতে পারছে। জাসদ যদি নিজস্ব রাজনীতিতে অটল থাকত, তাহলে এই রকম ঘটত না।

জাসদ ভেঙে যাওয়ার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইনু-আম্বিয়ার পরস্পরের প্রতি দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা ক্ষোভ জাসদকে দুই ভাগ করেছে। একসময় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও নেতৃত্ব দিতে এসে একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাননি। পরস্পরকে শায়েস্তা করতে সম্মেলনকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে নেন দুজনই। ইনু সভাপতি থাকতে চেয়েছেন। আবার শরীফ নুরুল আম্বিয়াও চেয়েছেন সাধারণ সম্পাদক থাকতে। তবে আম্বিয়াকে কোনোভাবেই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চাননি ইনু।

জাসদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদকে কেন্দ্র করেই মূলত শনিবার রাতে আরেক দফা ভেঙেছে জাসদ।

জাসদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া নেপথ্যের আরও কিছু কারণ উঠে এসেছে, যেগুলো জাসদের ভাঙনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বঞ্চনা, একনায়কতন্ত্র, অগণতন্ত্রিক আচরণ।

ফলে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে একটা বড় অংশ বের হয়ে গেছে ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ থেকে।

আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশটি অভিযোগ তুলেছে, ‘পার্টি পলিসিতে’ তাদের অংশের নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। তাই দলের আদর্শ সমুন্নত রাখতে ও গণতন্ত্রের চর্চা অক্ষুণ রাখতে ইনুর নেতৃত্ব থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন একাধিক নেতা বলেন, ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ দুর্বল হতে শুরু করেছে। সমাজতান্ত্রিক ধারণা থেকে বিচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছে জাসদের। দলের অসংখ্য নেতাকর্মী জাসদের সম্ভাব্য দৈন্যদশা দেখতে চান না। দলকে বাঁচানোর তাগিদ থেকে নতুন নেতৃত্ব যাত্রা শুরু করেছে। এ নেতৃত্ব আবার মশালের আলো জ্বালাবে।

বেরিয়ে যাওয়া অংশটি আরও মনে করে, ইনুর নেতৃত্বে জাসদে তারা বঞ্চনার শিকার। তাই ইনুর নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে শরীফ নুরুল আম্বিয়াকে সভাপতি, নাজমুল হক প্রধানকে সাধারণ সম্পাদক ও মঈনুদ্দিন খান বাদলকে কার্যকরী সভাপতি ঘোষণা করে বঞ্চিত অংশটি আরেকটি জাসদ গঠন করেছে।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের ছয়জন সাংসদ নির্বাচিত হন। শরিক দল হিসেবে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভায় নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইনু মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমে দলের সব নেতাই খুশি হন। কিছুদিন পর জাসদের কার্যকরী সভাপতি মঈনুদ্দিন খান বাদলকে মন্ত্রিসভায় নিতে সরকারকে রাজি করাতে ইনুর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন দলের একটি অংশ। কিন্তু ইনু তাদের প্রস্তাব আমলে নেননি। অভিযোগ আছে, বাদলকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভায় জায়গা দিতে চাইলেও ইনু তাতে সম্মতি দেননি। জাসদের বেরিয়ে যাওয়া অংশটি ইনুর ওপর নাখোশ হন মূলত এ কারণে। ফলে বাদলের বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন ইনু।

এদিকে প্রায় ছয় মাস ধরে চরম বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক চলছে ইনু-আম্বিয়ার মধ্যে। এর অন্যতম কারণ জাসদের সাধারণ সম্পাদক পদ। শুধু তাই নয়, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আম্বিয়াকে নিষ্ক্রিয় করতে থাকেন ইনু। ধীরে ধীরে তা প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। একপর্যায়ে আম্বিয়া ভেতরে ভেতরে তার অনুসারী গোছাতে শুরু করেন।

জাসদের সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ সম্মেলনে আম্বিয়াকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে না রাখার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু। তিনি শিরীন আক্তারকে দলের সাধারণ সম্পাদক প্রায় চূড়ান্ত করে রাখেন। মন্ত্রী হতে না পেরে বাদল ও সাধারণ সম্পাদক না হওয়ার ক্ষোভে আম্বিয়া দুজনই ইনুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। তারা দুজন একমত হয়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাজমুল হক প্রধানকে জাসদের কাউন্সিল অধিবেশনে প্রার্থী করেন। কিন্তু ইনু চান শিরীন আক্তারকে সাধারণ সম্পাদক করতে।

যেহেতু ভোটাভুটিতে জাসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হবে, সেই হিসেবে সারা দেশে কাউন্সিলর ও ডেলিগেটও করা হয় ইনুর অনুসারীদের।

আম্বিয়া গ্রুপের অংশটি নিশ্চিত হয় যে তাদের পক্ষের নেতারা পদ-পদবি পাচ্ছেন না। তাই সম্মেলনের শেষপর্যায়ে বিদ্রোহ করেন সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া। রাতেই জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে পৃথক কমিটি ঘোষণা করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের তিনজন সংসদ সদস্যও। তারা হলেন মঈনুদ্দিন খান বাদল, নাজমুল হক প্রধান ও রেজাউল করিম তানসেন।

এদিকে রবিবার দুই পক্ষই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মঈনুদ্দিন খান বাদল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান। মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, হাসানুল হক ইনুর স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অস্বচ্ছতা ও ব্যক্তিগত অনুরাগের কারণে জাসদ আবার ভাঙল।

এরপর বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাসানুল হক ইনু বলেন, “যারা আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলেছেন, তারা গত ছয় বছর ধরে আমাদের দলের সর্বোচ্চ পরিষদ স্থায়ী কমিটিতে ছিলেন। আমার জানা মতে, সেখানে একটি রেজুলেশন বই রয়েছে। সেখানে আমার বিরুদ্ধে আর্থিক অসততা এবং সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে কোনো প্রস্তাব তারা উত্থাপন করেননি। বরং তাদের বিভিন্ন রকম অসাংগঠনিক কর্মকা- নিয়ে আলোচনা করতে দেইনি তাদের সম্মান রক্ষার্থে। আমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।”