মেইন ম্যেনু

যে গ্রামের কোন ঘরে দরজা নেই এবং অদ্ভুত কিছু প্রথা নিয়ে আছে এখনো

এমন একটি গ্রামের কথা কল্পনা করা যায় কি, যে গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়ি, দোকান এমনকি ব্যাংকের দরজায় নেই কোনো তালা বা সুরক্ষা ব্যবস্থা। আর এই বিষয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন গ্রামবাসীরা। ভাবছেন এ আবার কি করে সম্ভব। হ্যা, এমন অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে পাশ্বর্বর্তী দেশ ভারতের মহারাষ্ট্রের শনি সিঙাগাপুর গ্রামের আধিবাসীরা। তাদের মতে, তাদের গ্রাম পাহাড়া দেয়ার দায়িত্বে আছেন স্বয়ং শনি দেবতা। যদি ঘরের দরজায় তালা লাগানো হয় তাহলে শনি দেবতা অসন্তুষ্ট হয়ে গ্রাম জুড়ে অকল্যাণ নেমে আসবে। কেউ দূরে কোথাও বেড়াতে গেলেও ঘর খোলা রেখেই চলে যান। এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে হিন্দুদের এই শনি দেবতা কি করে পুরো গ্রামের দেখভালের দায়িত্বে আছেন? আর গ্রামবাসীই বা ব্যাপারটি জানলো কিভাবে তা একটু বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

প্রায় ৩০০ বছর আগের কথা। গ্রাম জুড়ে প্রবল বর্ষণে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। তখন বন্যার পানি চলে যাওয়ার পর পানসালা নদীর তীরে বড় আকৃতির একটি পাথর(কথিত) ভেসে উঠেছিল। অদ্ভুত আকৃতির বিশাল পাথরটি দেখে গ্রামবাসীরা একটি লাঠি দিয়ে পাথরটি খোঁচা দিলে তা থেকে রক্ত বের হয়। আর এই ঘটনায় গ্রামবাসী বিস্মিত হয়ে পরে। এরপরের দিন গ্রামপ্রধান রাতে স্বপ্নে শনি দেবতাকে দেখতে পান। স্বপ্নে শনি দেবতা বলেন, এই পাথরটি আমারই প্রতিকৃতি। আমি চাই তোমরা এটা খোলা ছাদের নীচে প্রতিস্থাপন কর।’ কিন্তু স্থাপনের আগে দেবতা একটি শর্ত জুড়ে দিয়ছিলেন আর তা হলো গ্রামে কোন প্রকার গোপনীয়তা রাখা যাবে না এবং বিনিময়ে শনি এই গ্রামকে অর্থ-সম্পদে সমৃদ্ধ করে দেবেন।

এরপর থেকেই যত ঘর তৈরি করা হয় সেগুলো সবই দরজা ছাড়া। এমনকি বাথরুমেও ব্যবহার করা হয় না কোন দরজা। শুধু আড়াল হিসেবে একটি পর্দা ব্যবহার করা হয়। গ্রামে একটি ব্যাংক আছে সেখানেও নেই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গ্রামবাসীর ধর্মীয় বিশ্বাসে যাতে আঘাত না আসে তাই ব্যাংকের ভেতরে সব লকার ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক লক সিষ্টেম করা হয়েছে। বিধায় বাহিরে দরজা লাগানো না থাকলেও ভিতরে কোন কিছু চুরির ভয় নেই। কথিত আছে, গ্রামেরই একজন ঘরে তালা দিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন ফিরে আসার পথে তিনি দূর্ঘটনায় মারা যান। সেই থেকে গ্রামবাসীরা ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আছেন।

গ্রামে ২০১৫ সালে সেখানে একটি পুলিশ স্টেশন স্থাপন করা হয়েছিল কিন্তু এ যাবৎ পর্যন্ত চুরির কোন অভিযোগ দাখিল হয়নি থানাতে। তাই বলে কি গ্রামে সত্যিই চুরি হয়না? যদি এ ভেবে থাকেন তাহলে সম্পূর্ণ ভুল। ২০১০ সালে গ্রামেরই একটি বাড়ি থেকে ৩৫ হাজার রুপি এবং কিছু স্বর্ণ খোয়া যায়। আবার ২০১১ সালে আরো একটি বাড়িতে ৭০ হাজার রুপি সেই সঙ্গে কিছু স্বর্ণ চুরি হয়। এ নিয়ে তারা পুলিশের কাছে মামলা করলে গ্রামের প্রধাণ মামলাটি নিষ্পত্তি করে তাদের পাশের গ্রামে বিতাড়িত করেন। মূলত গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়ার ভয়েই অনেকে কিছু চুরি হলেও মুখ খোলেন না। কারণ যে গ্রাম পাহাড় দিচ্ছেন খোদ শনি সে গ্রামেতো চুরি হতে পারে না। আর চুরি হলে প্রশ্ন উঠবে দেবতার নিরাপত্তা দেয়ার ওপর।

থিত আছে, অনেকেই এরকম নজির দেখেছে। কিন্তু সত্য যাই হোক না কেন পুরণো এই প্রথা পরিবর্তনের সময় এসেছে বলে মনে করেন গ্রামবাসীরা। এই নিয়ে গ্রামের পঞ্চায়েতে বিভিন্ন কথা উঠলেও তেমন পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। অনেকেই আছেন যারা এই প্রথা পালন করতে চায় আবার অনেকেই এর বিরোধীতা করছেন। মাঝে মাঝে দুই পক্ষের মতবিরোধ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। তবে সংঘর্ষের পরেও এখন পর্যন্ত এই প্রথাটি গ্রামে বহাল আছে। যা থেকে উত্তরণের জন্য পথ চেয়ে আছে গ্রামবাসীরা।