মেইন ম্যেনু

যে ছবিতে কাঁদছে বিশ্বঃ ‘শিশুটিকে দেখে নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম’

আয়লান কুর্দি। কোনো ঘূর্ণিঝড়ের নাম নয় এটি। এ নামে কোনো ভূমিকম্প বা উল্কাপিণ্ডও আঘাত হানেনি বিশ্বকে। তবু দু’দিন ধরে এ নামেই কাঁপছে পৃথিবী। আবার এ নামেই থেমে যাচ্ছে বিশ্ববিবেক। সৈকতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আয়লানের যে ছবি সবার হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে, তার চিত্রগ্রাহক ছিলেন নিলুফার দেমির। তার ভাষায়, শিশুটিকে দেখার পর তিনি নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।

আয়লান কুর্দি তিন বছরের এক শিশুর নাম, যে বাবামায়ের হাত ধরে নৌকায় চেপে বসেছিল সংঘাতময় সিরিয়া থেকে বাঁচতে। কিন্তু যে সুন্দর জীবনের সন্ধানে অবুঝ এই শিশু সাগরে ভেসেছিল, তার দেখা পাওয়ার আগেই তাকে পাড়ি জমাতে হলো না ফেরার দেশে। আর বিশ্ব মানবতাকে করে গেল প্রশ্নবিদ্ধ।

২ সেপ্টেম্বর তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্র সৈকত থেকে উদ্ধার করা হয় আয়লানের মৃতদেহ। গত ১ সেপ্টেম্বর ১২ সিরীয় ইউরোপ পাড়ি জমাতে তুরস্কের বোদরাম উপদ্বীপ থেকে গ্রিসের এজিয়ান দ্বীপের উদ্দেশে দু’টো নৌকায় চেপে রওয়ানা হয়। এই ১২ জনের মধ্যে ছিল আইলানও। কিন্তু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়া তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছুতে দিলো না। মায়ের কোল থেকে শিশুটিকে যেন ছিনিয়ে নিল সমুদ্র। ভাসিয়ে নিল তুরস্কের সৈকতে। আর তার মা ভেসে গেলেন দূরের অন্য এক সৈকতে।

তুর্কি সংবাদসংস্থা দোগান’র (ডিএইচএ) ফটো-সাংবাদিক নিলুফার দেমির ২ সেপ্টেম্বর তুরস্কের মুগলা প্রদেশে আকিয়ারলার সৈকতে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন। তখন স্থানীয় সময় সকাল ৬টা। দু’টো নৌকাডুবির ঘটনায় সৈকতে অভিবাসন প্রত্যাশীদের লাশ ভেসে আসছিল।

নিলুফারের মুখেই শোনা যাক সেদিনের ঘটনা বর্ণনা। তিনি জানান, ২ সেপ্টেম্বর আমি ও আমার সহকর্মীরা পাকিস্তানি একটি গ্রুপের ছবি তুলছিলাম। তারা গ্রিস যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎ এক মর্মান্তক দৃশ্যের অবতারণা হলো আমাদের সামনে। আমরা দেখলাম, প্রাণহীন এক শিশুর দেহ মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে সৈকতে। হতভম্ব হয়ে গেলাম। সবার কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছাড়া ওই মুহূর্তে আমার করণীয় আর কিছুই ছিল না।

তিনি বলেন, শিশুটির পরনে ছিল লাল টি-শার্ট, গাঢ় নীল হাফ প্যান্ট ও পায়ে কেডস। আমি নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম ওকে দেখে।

সৈকতে শুধু আয়লানের মরদেহই ভেসে আসেনি। এসেছে তার বড়ভাই গালিপের মরদেহও। ওই মুহূর্তটার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিলুফার দেমির বলেন, আয়লানের থেকে বড়জোর একশ মিটার দূরে পড়ে ছিল গালিপের মরদেহ। আমি তার দিকে গেলাম। দেখলাম, তার পরনে কোনো লাইফজ্যাকেট নেই। এমনকি সমুদ্রে ভেসে থাকার মতো কিছুই ছিল না তার সঙ্গে।

নিলুফার জানান, তিনি ও তার সহকর্মীরা ওই এলাকায় ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। তাদের কাজের মূল বিষয়বস্তু হলো, অবৈধভাব অভিবাসন প্রত্যাশীদের সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা।

তিনি জানান, গত দুই-তিন মাস ধরে এই এলাকা দিয়ে ‍অভিবাসন প্রত্যাশীদের সমুদ্র পাড়ির চেষ্টা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তুরস্কের টারগাট্রিজ ও আকিয়ারলার এলাকা দিয়ে এ হার বেশি।

তিনি বলেন, ২০০৩ সাল থেকে এই অঞ্চলে আমি কাজ করছি। ওই সময় থেকে অভিবাসী সংকটের বহু ঘটনার ছবি তুলেছি আমি। তাদের মৃত্যুর, তাদের কষ্টের সাক্ষী হয়েছি। আমি আশা করছি, আয়লানের এ মর্মান্তিক ঘটনার পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করবে।