মেইন ম্যেনু

যে বছর কোনো গ্রীষ্মকাল ছিল না

বাংলাদেশকে বাদ দিলে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মানুষ প্রতিবছর সাধারণত চারবার ঋতুর পরিবর্তন উপভোগ করে। বাংলাদেশই একমাত্র ছয় ঋতুর দেশ। ১৮১৬ সালটি ছিল অন্য যেকোনো বছর থেকে একেবারেই ভিন্ন। এ বছর পৃথিবীতে আগমন ঘটেনি গ্রীষ্ম ঋতুর।

১৮১৫ সালের ১০ এপ্রিল, ইন্দোনেশিয়ার সুম্বাউয়া দ্বীপে অবস্থিত তাম্বোড়া পর্বতে ভয়ানক অগ্নুৎপাত হয়। এর ফলশ্রুতিতেই পৃথিবীর জলবায়ুতে ঘটে যায় বিরাট এক পরিবর্তন। এক হাজার ৬৩০ বছরের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়ানক অগ্নুৎপাতের ঘটনা। প্রচ- শক্তিশালী আগ্নেয়গিরির এই বিস্ফোরণের ফলে পর্বতটির শিখরের এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে এর উত্তপ্ত ছাই ও ছোটবড় পাথর ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ধোঁয়া ও ছাইয়ের মেঘের ১৩ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। আশপাশের এলাকার বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা পরবর্তী সময়ে এই বিষাক্ত গ্যাস, ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে ফুসফুসজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন। পর্বতের আশপাশে ৭৫ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে উত্তপ্ত ছাইয়ের ১০০ সেন্টিমিটার উঁচু স্তর জমে যায়।

1

১৮১৫ সালের ১৫ জুলাই এই অগ্নুৎপাতটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই বছর আগস্টের ২৩ তারিখ পর্যন্ত ওই পর্বতের চূড়া থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। চার বছর পর অর্থাৎ ১৮১৯ সালের আগস্ট মাসে এই অগ্নুৎপাতের ফলস্বরূপ ছোটবড় কিছু ভূকম্পন সৃষ্টি হয়।

এই বিশাল অগ্নুৎপাত ও কম্পনের ফলে প্রচুর ছাই, ধোঁয়া ও সালফিউরিক এসিড বায়ুম-লে জমা হয়। যার ফলে সূর্যরশ্মি পৃথিবী পৃষ্ঠে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে ১৮১৬ সালে বসন্ত ও গ্রীষ্মের মৌসুমে উত্তর গোলার্ধে তীব্র শীত অনুভূত হয়। পুরো বিশ্বের গড় তাপমাত্রা তখন শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে শূন্য দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যায়।

শুধু উত্তর গোলার্ধ নয়, জলবায়ুর এই বিরাট পরিবর্তনের প্রভাব গোটা পৃথিবীতেই পরিলক্ষিত হয়। উত্তর গোলার্ধের অধিকাংশ দেশের প্রচুর ফসল বিনষ্ট হয়। নিউইয়র্ক, লেবানন, কানাডা প্রভৃতি অঞ্চলে জমে যাওয়ার মতো তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়। মে মাসে কানাডায় ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু বরফের স্তর পড়তে দেখা যায়।

১৮১৬ সালের পুরোটা জুড়েই উত্তর গোলার্ধের জলবায়ুর নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। একদিন যদি তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তো পরের দিনই জমে যাওয়ার মতো ঠান্ডা পড়ত। জলবায়ুর এই দ্যোদুল্যমান অবস্থার প্রভাব পড়ল কৃষিক্ষেত্রে। ফসল উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেল। তখন যাতায়ত ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছিল। ফলে খাদ্যশস্য ও জ্বালানী কাঠের তীব্র অভাব দেখা দেয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য এতো বেড়ে গেল যে, মানুষ সামান্য পরিমাণ খাবার জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছিল।

index

উত্তর গোলার্ধের বাইরেও এর প্রভাব কম ছিল না। জলবায়ুর তারতম্যের কারণে হাঙ্গেরিতে বাদামি রঙের এবং ইতালিতে লাল রঙের বরফ পড়তে দেখা যায়। মৌসুম পরিবর্তনের সময়ের তারতম্যের কারণে ভারতবর্ষে কলেরা রোগ মহামারি আকার ধারণ করে। যা গঙ্গা নদীর মাধ্যমে বঙ্গেও ছড়িয়ে পড়ে। সুদূর মস্কো পর্যন্ত কলেরার প্রকোপ দেখা যায়। তাম্বোড়া পর্বতের সেই অগ্নুৎপাতের ফলে ১৮১৭ সালেও তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হয়। সে বছর নিউইয়র্কের তাপমাত্রা মাইনাস ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়।

পৃথিবীর ইতিহাসে ১৮১৬ সালটি একমাত্র বছর যে বছরটিতে কোনো গ্রীষ্মকাল অনুভূত হয়নি। শুধু ১৮১৫ সাল নয়, তার ৭০ হাজার বছর পূর্বে তোবা অগ্নুৎপাত ছিল আরো বেশি ভয়াবহ। সেটাও ঘটেছিল ওই ইন্দোনেশিয়ায়। সেটা নিয়ে না হয় অন্য একদিন আলোচনা করা যাবে।