মেইন ম্যেনু

যে যুক্তিতে ৩০ লাখ শহীদ বাহুল্য নয়

আমাদের দেশে একটা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়ে থাকে, বঙ্গবন্ধু নাকি মিলিয়ন এবং লক্ষের পার্থক্য বুঝতেন না। সে জন্য পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাংবাদিকদের কাছে শহীদের সংখ্যা ‘থ্রি লাখ’ বলতে গিয়ে ‘থ্রি মিলিয়ন’ বলে ফেলেছিলেন। এটা যে মিথ্যা একটি বক্তব্য সেটা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। একাত্তর সালেই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লগ্নে অর্থাৎ মার্চে পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রথম বলেছিলেন, ‘ওদের ত্রিশ লক্ষ হত্যা কর, বাকিরা আমাদের থাবার মধ্যে থেকেই নিঃশেষ হবে।’ (Robert Payne, Massacre, The Tragedy of Bangladesh and the Phenomenon of Mass Slaughter Throughout History; P:50; Nwe York, Macmillan, 1973).

যদি এই সংখ্যাটা ভুল হয়ে থাকে তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রথমে এই ভুলটা বঙ্গবন্ধু নন, বরং করেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া। কিন্তু তিনিই শেষ নন, মাওলানা ভাসানী যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়েই দশ লক্ষ হত্যাকাণ্ডের কথা তার বক্তব্যে বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর খালেদ মোশাররফ কানাডার গ্রানাডা টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে দশ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’ কবি আসাদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় লিখেছেন ‘বারবারা বিডলারকে’ তার কয়েকটা লাইন তুলে দেই : ‘তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খানের ছবি ছাপা হয়/বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখ/ওটা একটা জল্লাদের ছবি/পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হত্যা করেছে।’ যুদ্ধের সময় শহীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছিল উপরের লেখাগুলো তাই প্রমাণ করে। এবার আসুন দেখি বিদেশি কিছু পত্রিকা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কী লিখেছে শহীদের সংখ্যা নিয়ে:

১. Times একাত্তরের এপ্রিলের শুরুতেই লিখেছে নিহতের সংখ্যা ৩ লাখ ছাড়িয়েছে এবং বাড়ছে।

২. News Week এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ১৯৭১ লিখেছে নিহত ৭ লাখ।

৩. The Baltimore sun ১৪ মে ১৯৭১ লিখেছে সংখ্যাটা ৫ লাখ।

৪. The Momento, Caracas জুনের ১৩ তারিখে লিখেছে ৫ থেকে ১০ লাখ।

৫. কাইরান ইন্টারন্যাশনাল ২৮ জুলাই লিখেছে ৫ লাখ।

৬. Wall Street Journal ২৩ জুলাই রিপোর্ট করেছে, সংখ্যাটা প্রায় ১০ লাখ।

৭. Times সেপ্টেম্বরের বলছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক।

৮. দি হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট এক্সপ্রেস, লন্ডন ১ অক্টোবর ১৯৭১ বলেছে শহীদের সংখ্যা ২০ লাখ।

বারবার বলছি এসব যুদ্ধচলাকালীন সময়ের কথা। যুদ্ধের সময় অর্ধপূর্ণ তথ্যসূত্র নিয়েই এসব নিউজ করা হয়েছে। ডিসেম্বরের আগে পূর্ণ খবর পাওয়া অসম্ভব ছিল।

এবারে আসুন দেখা যাক ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর আর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের পত্রিকা (বঙ্গবন্ধু দেশে আসার আগ পর্যন্ত)। যেমন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম আর আখতার মুকুল চরমপত্রের শেষ পর্বে তিরিশ লাখ শহীদের কথা বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো জানতেনও না দেশ যে স্বাধীন হয়েছে।

এর ছয় দিন পর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ২২.১২.১৯৭১ তারিখে ‘ইয়াহইয়া জান্তার ফাঁসি দাও’ শিরোনামে লেখা হয়, ‘হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ লোক ও দুই শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’ এটা বঙ্গবন্ধু দেশে আসার আঠারো দিন আগের কথা। এরপর রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা পত্রিকা ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখ ৩০ লাখ শহীদের বিষয়টি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করে। তাও বঙ্গবন্ধু দেশে আসার ৭ দিন আগে। জানুয়ারি মাসের ৪ তারিখ তিরিশ লাখ শহীদের কথা প্রকাশ করে মর্নিং নিউজ, বঙ্গবন্ধু দেশে আসার ৬ দিন আগে। তারা লেখে, Over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months’.

ঢাকার পত্রিকা দৈনিক অবজারভার শিরোনাম করে এভাবে, ‘Pak Army Killed over 30 lakh people’ যেটা প্রকাশিত হয় ০৫.০১.১৯৭২ বঙ্গবন্ধু দেশে আসার ৫ দিন আগে। দৈনিক বাংলা পত্রিকা তিরিশ লাখ শহীদের কথা লেখে ‘জল্লাদের বিচার করতে হবে’ শিরোনামের নিবন্ধে জানুয়ারি মাসের ছয় তারিখ। বঙ্গবন্ধু দেশে আসার ৪ দিন আগে। তথ্য প্রমাণে এটুকু তো পরিষ্কার যে তিরিশ লাখ শহীদ কোনো স্বপ্নে পাওয়া কিংবা কারো ভুল উচ্চারণের ফলাফল নয় বরং বাস্তবসম্মত পরিসংখ্যান।

লেখার এই অংশে আমরা কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণার, থিসিস, এনসাইক্লোপিডিয়া, ডিকশনারির দিকে দৃষ্টিপাত করি। প্রথম মনে করিয়ে দেই ১৯৮১ সালে ইউএন ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটসের ডিকলেয়ারেশনের কথা, যেখানে লেখা হয়েছে, ‘মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে এর মধ্যে বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যায় স্বল্পতম সময়ে সংখ্যার দিকে সর্ববৃহৎ। গড়ে প্রতিদিন ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এটি হচ্ছে গণহত্যার ইতিহাসে প্রতিদিনে সর্বোচ্চ নিধনের হার।’

পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই কাজ (দিনপ্রতি ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার বাঙালি নিধন) করেছে মোটামুটি ২৬০ দিনে (একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত)। অর্থাৎ বাঙালি নিধনের লোওয়ার লিমিট : ৬০০০ x২৬০= ১৫,৬০,০০০ (১৫ লাখ ৬০ হাজার)। আর নিধনের আপার লিমিট : ১২০০০ x২৬০=৩১,২০,০০০ (৩১ লাখ ২০ হাজার)। এই ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটসের ডিকলেয়ারেশান কিন্তু ১৯৮১ সালের অর্থাৎ স্বাধীনতার ১০ বছর পরের। সুতরাং কোনো বিভ্রান্তি কিংবা মিস স্পেলিংয়ের সুযোগ নেই।

এবারে নিচের পয়েন্টগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক :

১. Encyclopedia Americana তাদের ২০০৩ সালের সংস্করণে বাংলাদেশ নামক অধ্যায়ে একাত্তরে মৃত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছে তিরিশ লাখ।

২. পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী লেখিকা Samantha Power’ এর লেখা গণহত্যা সম্পর্কিত সর্বাধিক বিক্রি হওয়া একটি বই A Problem from HellÕ : America and the Age of Genocide এই বইয়ের ভেতর ১৯৭১ সালে শহীদের সম্পর্কে সংখ্যাটি ৩০ লাখ বলা হয়েছে। এটা গণহত্যা নিয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ।

৩. গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুসারে বাংলাদেশের গণহত্যা এই শতকের সর্বোচ্চ পাঁচটির একটি, The Guinness Book of Records lists the Bangladesh Genocide as one of the top 5 genocides in the 20th century.

৪. প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক লিও কুপার জেনোসাইড নামে একটি বই লিখেছেন। বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছে কিছু সংখ্যা দিয়ে। লেখা হয়েছে ১৯১৫ : ৮০০,০০০ আর্মেনিয়ান। ১৯৩৩-৪৫ : ৬০ লাখ ইহুদি। ১৯৭১ : ৩০ লাখ বাংলাদেশি। ১৯৭২-৭৫ : ১০০,০০০ হুটু। নিচে লাল কালিতে বড় করে লেখা জেনোসাইড। এই অঙ্কের মানুষ গণহত্যার শিকার।

৫. Dr. Ted Robert Gurr Ges Dr. Barbara Harff কে বলা হয়ে থাকে রাজনীতি বিজ্ঞানের দুই দিকপাল। তাদের গবেষণা পুস্তক Towards Empirical Theory of Genocides and Politicies বইতে উল্লেখ করেছেন ১৯৭১ সালের সংঘাতে ১২,৫০,০০০ থেকে ৩০,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে।

৬. ড. রুডলফ যোসেফ রামেল হাওয়ায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তাকে বলা হয় বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত গণহত্যা বিশেষজ্ঞ। তার লেখা STATISTICS OF DEMOCIDE বইটিকে দাবি করা হয়ে থাকে বিশ্বে গণহত্যা নিয়ে সংখ্যাগতভাবে অন্যতম কমপ্রিহেনসিভ বই। বইটির অষ্টম অধ্যায়ে Statistics Of PakistanÕs Democide Estimates, Calculations, And Sources নিবন্ধে তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে সর্বোচ্চ সম্ভাবনার ঘরে মৃত্যু হয় ৩০,০৩,০০০ মানুষের। বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী Rudolph Joseph Rummel ev R.J. Rummel Zvui ‘China’s Bloody Century’ Ges `Lethal Politics : Soviet Genocide and Mass Murder Since 1917’ নামের দুটি গবেষণাধর্মী বইয়ের পরিশিষ্টে গণহত্যার পরিসংখ্যান কীভাবে করতে হয় সেটির একটা মেথডোলজি দিয়েছেন আগ্রহীরা, পুরোটা পড়তে পারেন।

সবশেষে বলি মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা তিরিশ লাখ হতে হলে তৎকালীন মোট জনগোষ্ঠীর ৪% শহীদ হতে হয়। একাত্তরে পাঁচজনের পরিবার চিন্তা করলে সংখ্যাটা ০.১৬। অনেককেই বলতে শোনা যায়, ‘কই আমার পরিবারে তো কেউ শহীদ হয়নি।’ যারা এমন প্রশ্ন তোলেন তারা ভুলে যাচ্ছেন এখন সালটা ১৯৭১ না ২০১৫। একাত্তরের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্ম আপনি। একাত্তরে বিশটা পরিবারের ভেতর একজন শহীদের খোঁজ করা মানে এখনকার ১০০/১৫০/২০০ পরিবারে একজন খুঁজে পাওয়ার সমান।- সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে