মেইন ম্যেনু

যৌনকর্মীদের লেনদেনে ৩০ কোটি টাকা!

আজ থেকে বছর বিশেক আগে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১৩ জন যৌনকর্মী মিলে গড়ে তোলেন একটি সমবায়। ‘ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ নামের এই সমবায়ের আজ সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজারেরও বেশি। আর এই সমিতিতে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার।

আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৩-৯৪ সালে মাত্র ১৩ জন যৌনকর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’। মূলত ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য টাকা জমাতে না পারার অসুবিধা থেকেই এই সমবায় তৈরিতে এগিয়ে আসেন যৌনকর্মী। কারণ, কোনো পরিচয়পত্র বা নাগরিক স্বীকৃতি না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের টাকা জমাতে হতো তোষকের নীচে বা ‘বাবু’দের হেফাজতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই টাকা মেরে দেয়া হতো। তাছাড়া যৌনকর্মীদের প্রয়োজনে চড়া সুদে টাকা ধার দিত কিস্তিওয়ালা-চটাওয়ালারা। আর এক বার ধার করলে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকা সুদের কবল থেকে মুক্তির কোনো উপায় থাকতো না। ধারের বোঝা বইতে হতো আমৃত্যু।

যৌনকর্মী শেফালী রায় আনন্দবাজারকে জানান, কয়েক জন যৌনকর্মী মিলে একটা সমবায় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তারা। যেখানে তারা তাদের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাতে পারবেন, প্রয়োজনে ধার নিতেও পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে পুলিশ থেকে শুরু করে বাড়ির মালিক এবং মহাজনরা আমাদের উপর অত্যাচার করতো। যেকোনভাবে হোক আমরা এর থেকে মুক্তি পেতে চাইছিলাম। চাইছিলাম স্বাবলম্বী হতে।

আনন্দবাজার পত্রিকাকীভাবে চলে এই সমবায়?
ঊষার ফিন্যান্স ম্যানেজার শান্তনু চট্টোপাধ্যায় জানান, এই সমবায়ে টাকা রাখার জন্য যৌনকর্মীরা যেকোন সময়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন, নিজের ইচ্ছে মতো টাকা জমাতে পারেন, তুলতেও পারেন। প্রয়োজনে সরকার স্বীকৃত সরল সুদে ধারও নিতে পারেন। তিনি আরো জানান, ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে যৌনকর্মীরা ঊষা থেকে ধার নিয়েছেন ৭ কোটি টাকা। কেন টাকা ধার করেছেন যৌনকর্মীরা? সমবায়ের কর্মকর্তারা দেখেছেন, ধার নিতে আসা যৌনকর্মীদের ৪২ শতাংশই ধার নিয়েছেন সন্তানদের শিক্ষার জন্য।

কেমন ছিল শুরুর দিনগুলো?
যৌনকর্মীদের কথায়, সহজ ছিল না লড়াইটা। শুরু থেকেই একের পর এক বাধা এসেছে। কখনও বাড়ির মালিক বাড়ি-ছাড়া করার ভয় দেখিয়েছে আবার কখনও বা কিস্তিওয়ালাদের ভাড়া করা গুন্ডা হুমকি দিয়েছে প্রাণে মারার। অন্য যৌনকর্মীরাও ভেবেছেন, এটাও বুঝি আর এক রকম টাকা মারার ফন্দি। ধীরে ধীরে সকলের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়েছে। শান্তনু চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘সবচেয়ে বড় বাধাটা এসেছিল সমবায় মন্ত্রকের তরফে। ১৯৯৫ সালে যৌনকর্মীরা সমবায়টির সরকারি স্বীকৃতির জন্য আবেদন করলে সমবায় মন্ত্রকের আধিকারিকেরা আবেদন নাকচ করে দেন। কারণ ১৯৮৩ সালের সমবায় আইনে বলা আছে উন্নত চরিত্রের অধিকারী না হলে সমবায় গঠন করা যায় না।’

প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের ৬ জেলায় এবং পরে ২০০৯-এ সারা পশ্চিমবঙ্গের যৌনকর্মীদের এই সমবায়ের আওতায় আনার অধিকার অর্জন করে ঊষা। সে বছরই লোকসভা নির্বাচনের আগে ঊষার পাশ বই দেখে দর্জিপাড়া গণভবনে এক দিনে ৭০০ যৌনকর্মীর নাম ভোটার তালিকায় তোলেন নির্বাচন কমিশন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সে দিন নাগরিক স্বীকৃতি পেলেন যৌনকর্মীরা।

এই সমবায়ে টাকা জমিয়ে যৌনকর্মীদের কেউ বোলপুর বা সুন্দরবনে বাড়ি করেছেন, ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, কেউ বা মা-বাবাকে ঘুরিয়ে এনেছেন পুরী-হরিদ্বার। শেফালী দেবী বলেন, ‘মেয়ের বিয়ে দেয়ার সময় আমি কিচ্ছু লুকাইনি। এখন আমি আমার পেশা নিয়ে লজ্জিত নই। ঊষা আমায় মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে।’