মেইন ম্যেনু

যৌন অপরাধীদের তথ্যপঞ্জি বানাবে ভারত

ভারতের সরকার ঘোষণা করেছে যে যৌনঅপরাধীদের একটা জাতীয় তথ্যপঞ্জি তৈরি করা হবে দেশটিতে। এ নিয়ে প্রাথমিক আলাপ আলোচনা শুরু করেছে সেদেশের সরকার।

সেখানে অপরাধীদের নাম, ছবি, ঠিকানা, আঙুলের ছাপ, টেলিফোন নম্বর, বিদেশ ভ্রমণের বিবরণ, এমনকী ডিএনএ নমুনাও প্রকাশ করা হবে। খবর-বিবিসি’র।

বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে যৌন অপরাধীদের এধরনের জাতীয় তথ্যপঞ্জি রয়েছে। তবে এই তথ্যপঞ্জির যৌক্তিকতা আর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।

ভারতের জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর অধীনে থাকা এই তথ্যপঞ্জি পুলিশ বা বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা যেমন ব্যবহার করতে পারবে, তেমনই সাধারণ মানুষও ওই যৌন অপরাধীদের ছবি সহ গোটা তালিকাটাই দেখতে পাবেন।

যৌন অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট পেশ হয়ে গেলেই এই তথ্যপঞ্জিতে নাম তুলে দেওয়া হবে। তবে ১৮ বছরের কমবয়সী যৌন অপরাধীদের ক্ষেত্রে বিচার চলাকালীন নয়, সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই তালিকায় নাম তোলা হবে।

যৌন অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করছিলেন নারী পাচার রোধে সক্রিয় একটি সংগঠন শক্তি বাহিনীর প্রধান ঋষিকান্ত।

তার কথায়, “এটা সরকারের একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। যৌন অপরাধীদের মনে একটা ভয় তৈরি হবে – যে ধর্ষন বা যৌন হয়রানির জন্য তার শুধু সাজাই হবে তা নয়, তার নাম ঠিকানা, পরিচয় – সব কিছুই জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে যাবে।“

সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন যে যৌন অপরাধীদের এই জাতীয় তথ্যপঞ্জি তৈরির প্রক্রিয়াটা এখনও প্রাথমিক স্তরেই রয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রক আর সংগঠনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালানো হচ্ছে এ নিয়ে।

তবে ইতিমধ্যেই এই তথ্যপঞ্জি তৈরি নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

কলকাতার নারী আন্দোলনের কর্মী অধ্যাপিকা শ্বাশতী ঘোষ বলছিলেন তথ্যপঞ্জি তৈরির উদ্যোগে আপত্তির কিছু নেই, তবে তার আগে যৌন অপরাধের বিচারের সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে সরকার আর আদালতগুলিকে, নাহলে এই তথ্যপঞ্জি কোনও কাজে লাগবে না।

“নিম্ন আদালতে তো কেউ দোষী প্রমাণিত হয়ে যেতেই পারে, কিন্তু উচ্চ আদালতে তো নির্দোষ বলেও প্রমাণ হতে পারে কোনও অভিযুক্ত। আর চূড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া অবধি যদি কারও নাম তুলে দেওয়া হয়, তাহলে তো সে প্রশ্ন তুলবেই যে চূড়ান্তভাবে দোষ প্রমাণ হওয়ার আগেই কেন তথ্যপঞ্জিতে তার নাম তুলে দেওয়া হল। আর আমাদের দেশে তো গড়ে একটা ধর্ষণের মামলা চূড়ান্ত ফয়সালা হতে ১২-১৩ বছর লেগে যায়। সরকার আর আদালতগুলোকে তাই আগে যৌন অপরাধ বিচারের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে,” বলছিলেন শ্বাশতী ঘোষ।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে একটি চলন্ত বাসে এক প্যারা মেডিক্যাল ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার পরেই সরকার চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল এধরণের একটি জাতীয় তথ্যপঞ্জি তৈরি করার।

দিল্লিতে ওই গণধর্ষণের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন যারা, তাদেরই একজন – নারী আন্দোলনের নেত্রী কভিতা কৃষ্ণান আবার এই তথ্যপঞ্জি তৈরির সরাসরি বিরোধীতা করছেন।

মিজ. কৃষ্ণান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “অনেক সময়েই দেখা যায় যে গরীব পরিবারে পুরুষদের ওপরে যৌন অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। এদের যদি নিম্ন আদালতে সাজা হয়ে যায়, আর অর্থের অভাবে যদি তারা উচ্চতর আদালতে আপিল করতে না পারেন , তাহলেই তো সারাজীবন যৌন অপরাধের মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে থাকতে হবে, আবার তথ্যপঞ্জিতে নাম উঠে যাওয়ার জন্য হেনস্থাও হতে হবে। এটা তো ঠিক না।”

এই প্রশ্নও উঠছে, যে কোনও বিচার ব্যবস্থার মূল ধারণাটাই হল যে অপরাধীরা বিচারে শাস্তি পাওয়ার বা জেলে থাকার পরে শুধরিয়ে যাবে। তাহলে আবার কেন সেই অপরাধীর নাম ছবি প্রকাশ করে দিয়ে সারাজীবন সেই অপরাধের গ্লানি বইতে বাধ্য করা হবে। সে তো তার কৃতকর্মের সাজা পেয়েই গেছে!