মেইন ম্যেনু

রডের পরিবর্তে বাঁশ: ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ ৩জনের বিরুদ্ধে মামলা

শামীম রেজা, জেলা প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা: চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সত্যতা পেয়েছে দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফরিদুর রহমান প্রকাশিত খবর সত্য বলে উলেলখ করেছেন। রবিবার (১০ এপ্রিল’২০১৬) ইউএনও স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ এপ্রিল দর্শনা উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের সম্পূর্ন ভবন নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি, রডের বদলে বাঁশের কাবারি দিয়ে ঢালাই; ইটের খোয়ার বদলে নি¤œ মানের সুরকি ব্যবহার করে ভবন নির্মাণ কাজ চলছে, সংক্রান্ত সংবাদ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার পর ওই দিনই সকাল ৯টার দিকে তিনিসহ চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মির্মল কুমার দে, দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুফি মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান এবং সংশিলষ্ট কৃষি বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারি নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে নির্মাণাধীন ওই ভবনের লুপ ঢালাইয়ে রডের বদলে বাঁশের কাবারি এবং ইটের খোয়ার পরিবর্তে পরিত্যক্ত সুরকিসহ নি¤œমানের উপকরণ ব্যবহার করার বিষয়ে সত্যতা পাওয়া যায়।

সোমবার (১১ এপ্রিল’২০১৬) বেলা ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভায় দর্শনা উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের সর্ম্পূন ভবন নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ও ইটের খোয়ার স্থলে অত্যান্ত নি¤œমানের সুরকি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাককে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের আরও একটি তদন্ত দল গঠন করা হয়। কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। এ ছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহমুদুল হক পাটোয়ারীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সোমবার (১১ এপ্রিল’২০১৬) দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। তবে ওই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।

প্রকল্প– সংশিলষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিদেশ থেকে কৃষিজাত পণ্যের মান যাচাই ও বালাই পরীক্ষার জন্য ভবনটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের অধীন বাংলাদেশ ফাইটোসেনেটারি ক্যাপাসিটি শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতাধীন ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের (ইসিএল) তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয় ইন্টারন্যাশনাল ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কার্যালয় ও গবেষণাগার নির্মাণ কাজ শুরু করে। ২০১৫ সালের ৫ নভেম্বর শুরু হওয়া ভবনটির ৭০ ভাগ কাজই ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী জুন মাসে ভবনটি হস্তান্তর হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ভবন নির্মাণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

এ দিকে সোমবার (১১ এপ্রিল’২০১৬) দুপুরে ঢাকা থেকে আগত কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মাহমুদুল হক পাটোয়ারীর নেতৃত্বে পরিদর্শণকারীদল ঘটনাস্থল পরিদর্শণ শেষে প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং এন্ড ইভ্যুলেয়শন অফিসার মেরিনা জেবুন্নাহার বাদী হয়ে সংশিলষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটার মনি সিং (৬৪/এ মনিপুরী পাড়া তেজগাঁও ঢাকা), ইঞ্জিনিয়ার্স কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের (ইসিএল) ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো: আবদুস সাত্তার (৮৭০ শেওড়া পাড়া মিরপুর ঢাকা) এবং প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ মো: আয়ুব হোসেন (ফ্লাট-২/৫২ তেজকুনিপাড়া তেজগাঁও ঢাকা) এই তিন জনের বিরুদ্ধে দামুড়হুদা মডেল থানায় সোমবার (১১ এপ্রিল’২০১৬) রাত ৮ টার দিকে মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-১৩, তারিখ ১১/০৪/২০১৬।

মামলায় বলা হয়েছে, কৃষি মন্ত্রনালয়ের আওতাভূক্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশে ফাইটোসেনেটারী ক্যাপাসিটি শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের অধীনে উদ্ভিদ সংগ নিরোধ কেন্দ্র, স্থলবন্দর, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা অফিস ভবন নির্মাণ কল্পে গত ১২/০৭/২০১৫ ইং তারিখে ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্রে অংশগ্রহনকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সমূহের দরপত্র মূল্যায়ন করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনাল ৬৪/এ মনিপুরী পাড়া তেজগাঁও ঢাকা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। প্রকল্প পরিচালকের স্মারক নং-ফাইটো-৪১/২০১৫ (অংশ)/৭৮৪ তারিখ ২৫/১০/২০১৫ মোতাবেক মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয় (পরিশিষ্ট-১)। কাজের চুক্তিমূল্য ধার্য হয় ২ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ২২৭ টাকা ২২ পয়সা। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত মতে চুক্তি সম্পাদনের দিন থেকে ১২ মাসের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার কথা। এ নির্মাণ কাজের ডিজাইন, স্থাপত্য নকশা, কাঠামোগত ডিজাইন তৈরী ও নির্মাণ চলাকালীন সকল প্রকার কাজের গুনগতমান নিশ্চিত করার জন্য ইঞ্জিনিয়ার্স কনসোর্টিয়াম লি:(ইসিএল) ৮৭০ শেওড়াপাড়া, মিরপুর, ঢাকা নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে যথাযথ নিয়মপদ্ধতি অনুসরণ করে নিয়োগ প্রদান করা হয়। সেই সঙ্গে প্রকল্পের সকল প্রকার ক্রয় কার্যক্রমে প্রকল্প পরিচালককে সহায়তা করার জন্য মো: আয়ুব হোসেনকে এই প্রকল্পের ক্রয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

এ ছাড়া কৃষি সম্প্রারণ অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইংয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও আইসিটি ব্যবস্থাপনা শাখার পক্ষ থেকে উক্ত নির্মাণ কাজটি দেখাশুনার জন্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেনকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বর্নিত নির্মাণ কাজটি গত ০৫/১১/২০১৫ ইং তারিখে শুরু হয়ে অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যেই নির্মাণ কাজের মূল ভবনসহ ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ অবস্থায় বিগত ৬/০৪/২০১৬ ইং তারিখে নির্মাণাধীণ উক্ত ভবনের সম্মুখ অংশে লুবার নির্মাণকালে অনুমোদিত ডিজাইন উপেক্ষা করে অনুমোদিত রডের পরিবর্তে বাঁশের কাবারি ও ইটের খোযার বদলে নি¤œমানের সুরকি ব্যবহারের বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে এলে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় তারা ঘটনাটি তুলে ধরেন। পরবর্তীতে কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় এবং টেলিভিশন চ্যানেলে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার নানা ধরনের খবর পরিবেশিত হয়। যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এবং কৃষি মন্ত্রনালয়ের গোচরীভূত হয়।

এ ঘটনাটি এমন এক সময়ে প্রচার মাধ্যমে গুরুত্ব পায় যখন বর্তমান সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার নানা দৃষ্টান্ত দেশে এবং বিদেশে বিপুলভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশেষ করে দানাজাতীয় খাদ্য শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জণ, আলু , ভূট্টা, শাকসবজী ও ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় ও তৎসংশিলষ্ট প্রতিষ্ঠান সমূহের অবদান দেশ বিদেশে দারুণভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হচ্ছে। ঠিক এমনি সময়ে, ভবন নির্মাণের ঢালাই কাজে বাঁশের কাবারি ব্যবহার এমন এক ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড যা গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে প্রবলভাবে ইন্ধন যুগিয়েছে। এতে প্রমানিত হয় যে, উক্ত নির্মাণ কাজের সাঙ্গে সংশিলষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠানসমূহের একক বা সম্মিলিত যোগসাজসে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। এতে আরও প্রমানিত হয় যে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইসিএল এবং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স জয় ইন্টারন্যাশনাল প্রকল্পের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করেছে। কাজের গুনগত মান তদারকি করার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও যথাযথভাবে তাদেও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

সম্পূর্ন ভবন নির্মানে ব্যাপক দূর্র্নীতির বিষয়ে দামুড়হুদা মডেল থানায় মামলা রুজুর ঘটনাটি নিশ্চিত করেছে ওই থানার অফিসার ইনচার্জ লিয়াকত হোসেন।

উলেলখ্য,চুয়াডাঙ্গা জেলার ভারত সীমান্তবর্তী দর্শনায় নির্মাণাধীন উদ্ভিদ সংগনিরোধ ভবনে রডের বদলে বাঁশ আর ইটের খোয়ার বদলে সুরকি দিয়ে গোটা ভবনের নির্মাণ করা হয়েছে এমন অভিযোগ জানাজানি হলে বৃহস্পতিবার (০৭ এপ্রিল’২০১৬) চুয়াডাঙ্গার সংশিলষ্ট কর্মকর্তারা ভবন পরিদর্শন করে কাজ বন্ধ করে দেন।

নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশের বাসিন্দারা জানান, বুধবার (০৬ এপ্রিল’২০১৬) বিকালে কাজচলাকালীন এলাকাবাসী দেখতে পায় ভবনের গুরুত্বপুর্ন ঢালাই কাজে রডের বদলে বাঁশর আর ইটের খোয়ার বদলে সুরকি দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এসময় প্রতিবাদ করলে কাজ ফেলে গা ঢাকা দেয় উপস্থিত প্রকৌশলীসহ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও শ্রমিকরা। এ চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনাটি বিভিন্ন ইলেট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার হলে শুক্রবার (০৮ এপ্রিল’২০১৬) সকালে ঢাকা থেকে এক প্রতিনিধিদল দর্শনায় এসে ভবন পরিদর্শন করে। ওই সময় দূর্নীতি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা খামারবাড়ি উদ্ভিদ সংগ নিরোধ উইং এর পরিচালক সৌমেন সাহাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। সদস্যদ্বয় হলেন, ফাইটো স্যানিটরি ক্যাপাসিটি শক্তিশালীকরন প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ মোঃ আইয়ুব হোসেন ও চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নির্মল কুমার দে।

পরিদর্শনে আসা ঢাকার খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান প্রাথমিক তদন্ত শেষে বলেছিলেন, তদন্তে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তদন্তে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় উদ্ভিদ সংগনিরোধ ভবন নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতির প্রমান মেলায় সংশিলষ্ট ঠিকাদারসহ তিন জনের বিরুদ্ধে দামুড়হুদা মডেল থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে।