মেইন ম্যেনু

রবি ঠাকুরের সেই কাছারি বাড়ি হতে পারে এক আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র

কাজী আনিছুর রহমান, রাণীনগর (নওগাঁ) থেকে : “আমাদের ছোট ছোট নদী/ চলে বাঁকে বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হাটু জল থাকে” বিশ্বকবির সেই বিখ্যাত “ আমাদের ছোট নদী” কবিতা যা কবি নওগাঁর আত্রাইয়ের পতিসরে তার কাছারী বাড়িতে এসে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকা-বাঁকা নাগর নদীকে নিয়ে লিখেছিলেন।

এছাড়াও বিশ্বকবি তার বিখ্যাত কবিতা “দুই বিঘা জমি” “সন্ধ্যা”সহ অসংখ্য জগত বিখ্যাত সাহিত্য কর্ম রচনা করেছেন এই পতিসরের কাছারী বাড়িতে এসে। রবি ঠাকুরের এই পতিসরের কাছারী বাড়িটি এক অন্যন্য পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে স্থান পেতে পারে। আমাদের দেশের পর্যটন শিল্পের মধ্যে। এটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠলে শুধু কবির জন্মোৎসবে নয় বছরের যে কোন সময়ে দেশি-বিদেশী রবীন্দ্র ভক্ত পর্যটকরা এখানে আসবেন যার বিনিময়ে সরকার রাজস্ব হিসাবে আয় করতে পারবেন অর্থ।

প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ এই পতিসর কাছারী বাড়িতে বিশ্বকবির জন্মোৎসব সরকারি ভাবে জাতীয় পর্যায়ে উদযাপন করা হয়। প্রায় এক বিঘা জমির উপর অবস্থিত কবির এই কাছারী বাড়ি। এখানে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র। সূত্রে জানা, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বকবির পতিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর এই কালিগ্রাম পরগনাকে ক্রয় করে ঠাকুর পরিবারের জমিদারীর অংশে অন্তভূক্ত করেন।

এরপর বিশ্বকবি ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জানুয়ারী প্রথম আসেন তার এই পতিসরের কাছারী বাড়িতে জমিদারী দেখাশুনা ও খাজনা আদায় করতে। সেই সময় এই পরগণা খেকে খাজনা আদায় হত প্রায় ৫০,৪২০টাকা। বিশ্বকবি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর তার পুরস্কারের অর্থ থেকে তিনি এই পরগণার প্রজাদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য ৭৫ হাজার টাকা তৎকালীন সময়ে এখানে অবস্থিত কৃষি ব্যংকের মারফত পাঠিয়েছিলেন। এই প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকার প্রজাদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌছে দেয়ার লক্ষে কবি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে পতিসরে এসে তার ছেলে রবীন্দ্রনাখ ইনিষ্টিটিউশনস্থাপন করে এবং এই প্রতিষ্ঠানের নামে ২শত বিঘা জমি দান করেন। আর এই ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কবি শেষ বারের মতো এসেছিলেন তার পতিসরের কাছারীর বাড়িতে।

কবি ছেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে এই এলাকার প্রজাদের জন্য সর্বপ্রথম আধুনিক সময়ের কলের নাঙ্গল এনেছিলেন। পরবর্তি সময়ে তৎকালীন সরকার ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে এক অডিন্যান্স বলে কালিগ্রাম পরগণার জমিদারী কেড়ে নিলে ঠাকুর পরিবারের এই জমিদারী হাতছাড়া হয়ে গেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বস্ত্রীক পতিসর যাতায়াত বন্ধ করে দেন।

তৎকালীন রবীন্দ্র বিরোধী পাকিস্থান সরকার ১৯৪৭ হতে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এখানে কোন অনুষ্ঠান করতে দেয়নি। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে সেই সময়ের তার ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জনাব তাহের উদ্দিন ঠাকুর সর্বপ্রথম অতিখি হিসাবে এখানে এসেছিলেন। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে সরকারি ভাবে পতিসরে এই রবীন্দ্র কাছারী বাড়ি প্রত্মতত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে আসা হয় এবং সরকারি ভাবে পতিসরের এই রবীন্দ্র কাছারী বাড়ি প্রত্মতত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে আসা হয় এর্ব সরকারি ভাবে প্রতিবছর এখানে বিশ্বকবির জন্মোৎসব উদযাপন করা হয়।

এখানে বর্তমান একটি দৃষ্টি নন্দন ডাকবাংলো, একটি কৃষি কলেজ ও কাছারী বাড়ি সংলগ্ন পূর্ব দিকে নির্মাণ করা হয়েছে দেবেন্দ্র মঞ্চ। এছাড়াও কমির স্মৃতি সাক্ষর বহণকারী ঘর -দরজাও অনেকটা মেরামত করা হয়েছে। গত বছরের ১ এপ্রিল হতে এখানে টিকেটের ব্যবস্থা করা হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫টাকা, মাধ্যমিকের পর হতে সকল পর্যায়ে ১৫ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকের জন্য ৫০ টাকা এবং ইউরোপের নাগরিকের জন্য ১০০টাকা হিসাবে টিকেটের পরিমান নির্ধারণ করেছে। প্রত্মতত্ব অধিদপ্তর। নওগাঁ সদর থেকে পতিসরের দূরত্ব ৩৬ কিলোমিটার এবং আত্রাই হতে ৪৬ কিলোমিটার। নওগাঁ এবং আত্রাই হতে মাইক্রোবাস ,বাস, সিএনজি যোগে পতিসরে যাওয়া যায়।

বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক আল মামুন বলেন, কবিগুরু তার জমিদারীর অবহেলিত কৃষকদের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য যে কাজ করে গেছেন তা চিরস্মরণীয়। তিনি শুধু একজন কবিও ছিলেন না তিনি সর্বগুনের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন বাঙ্গালী জাতির প্রেরণার উৎস। তার আগমনে আমাদের এই অবহেলিত পতিসর ধন্য হয়েছে। বর্তমানে শুধু একবার কবির জন্মোৎসব পালন করে এই পতিসরকে ঠিকে রাখা হয়েছে। কিন্তু এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কবির কুঠিবাড়ি এলাকাকে আরো সংস্কার ও আকর্ষনীয় করা হলে এটি একটি আধুনিক মানসম্মত পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে বিশ্ববাসীর কাছে গণ্য হতে পারে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম বলেন, রবী ঠাকুরের স্মতিধন্য পতিসর এখন আর নিভৃত পল্লী হিসাবে পরিচিত নয়। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়ায় আধুনিক শহরে পরিনত হতে চলেছে। ইতিমধ্যেই এখানে আধুনিক মানসম্মত অনেক কিছুই স্থাপন করা হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পাকা সড়কের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নাগর নদীর উপড় ব্রিজ নির্মাণ করে নাটোরের সিংড়ার সঙ্গে আত্রাইয়ের সরাসরি যাতায়াত ব্যবস্থা বর্তমান সরকারের আমলেই শেষ হয়েছে। বর্তমান পতিসর কাছারী বাড়ি প্রত্মতত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। এখানে আধুনিক মানসম্মত আকর্ষনীয় পর্যটন কেস্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে আরও উন্নয়ন মূলক কাজ করা হবে।