মেইন ম্যেনু

রহস্যময় মিশরীয় লিপি হা্য়ারোগ্লিফিক সম্পর্কে দারূণ মজার কিছু তথ্য

মিশরীয় মমি আর রহস্যময় পিরামিডের গল্প আমরা সবাই জানি। বিভিন্ন সিনেমা, এনিমেশন, কার্টুনে এর রহস্যময় ভৌতিক ব্যবহার আমরা অনেক দেখেছি। সেইসব দৃশ্যে পিরামিডের দেয়ালে দেখা মেলে মিশরীয় চিত্রলিপির, যার নাম হায়ারোগ্লিফিক। প্রাচীন সকল সভ্যতায় লেখলেখির শুরুটা চিত্রলিপি দিয়েই হয়েছে। কিন্তু হায়ারোগ্লিফিক যেন তাদের মাঝে অনন্য। মিশরীয় সভ্যতা ও তার বিকাশই এই অনন্যতা্র পেছনের মূল কারণ। আসুন জানি হায়ারোগ্লিফিক সম্পর্কে না জানা মজার কিছু তথ্য।

হায়রোগ্লিফিক মানে কি?

গ্রিক “হায়ারোগ্লিফ” শব্দের অর্থ ‘উৎকীর্ণ পবিত্র চিহ্ন’। গ্রিকরা যখন মিশর অধিকার করে তখন তাদের ধারণা হয় যে, যেহেতু পুরোহিতরা লিপিকরের দায়িত্ব পালন করেন, আর মন্দিরের গায়ে এই লিপি খোদাই করা রয়েছে,এই লিপি নিশ্চয়ই ধর্মীয়ভাবে কোনো পবিত্র লিপি। গ্রিক ‘হায়ারোগ্লুফিকোস’ থেকে পরবর্তি ল্যাটিন ‘হায়ারোগ্লিফিকাস’ হয়ে ফরাসি ‘হায়রোগ্লিফিক’ থেকে ইংরেজি ‘হায়ারোগ্লিফিক’ শব্দটি এসেছে। গ্রিক উপসর্গ ‘হায়ারোস’ অর্থ ‘পবিত্র’, আর ‘গ্লুফি’ অর্থ ‘খোদাই করা লেখা’।

হায়রোগ্লিফিকের মজার বৈশিষ্ট্য

১। এই চিত্রলিপিতে কোন স্বরবর্ণ ছিল না। অক্ষরলিপি হিসেবে ছিলো প্রায় ২৪টি একক ব্যঞ্জনধ্বনি এবং তার সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু ঊহ্য কোনো এক স্বরধ্বনি। যেহেতু স্বরধ্বনির আলাদা অস্তিত্ব ছিলো না, তাই তার চিহ্নও ছিলো ঊহ্য। একটি ব্যঞ্জনধ্বনি যেকোনো স্বরধ্বনিসহযোগে উচ্চারিত হতে পারতো, যেমন: ল্যাটিন ব্যঞ্জনধ্বনি m দিয়ে উদাহরণ দিলে ma, me, mi, mu ইত্যাদি।

২। হায়ারোগ্লিফিকে ছিলো প্রায় ৮০টির মতো দ্বিব্যঞ্জনধ্বনি এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন অবস্থানে ঊহ্য থাকা যেকোনো স্বরধ্বনি। যেমন দ্বিব্যঞ্জনধ্বনি tm দিয়ে উদাহরণ দিলে তার সাথে স্বরধ্বনি থাকতে পারে tama, tuma, tame, tima ইত্যাদি বিভিন্ন রূপে। দ্বিব্যঞ্জনধ্বনির জন্য ছিলো একটিমাত্র চিহ্ন।

৩। প্রতিটি মিশরীয় শব্দের শুরু ব্যঞ্জনধ্বনি দিয়ে। কিছু কিছু শব্দের শুরুতে অবশ্য স্বরধ্বনি রযেছে, যেমন: Amon, Osiris ইত্যাদি। কিছু ক্রিয়াপদের শব্দের শুরুতেও থাকে স্বরধ্বনি। তবে এগুলো থাকে ব্যঞ্জনধ্বনির হ্রস্ব উচ্চারণের ক্ষেত্রে এবং তাও ঊহ্য অবস্থায়। শ্রুতির ঐতিহ্য অনুসারে মানুষ বুঝে নিতো কোথায় কোন স্বরধ্বনি বসিয়ে নিয়ে কোন মানেটা বুঝতে হবে। যেমন নেফারতিতির নাম লেখার সময় হায়ারোগ্লিফিকে লেখা হতো nfrtt -শ্রুতির ঐতিহ্য অনুসারে মিশরীয়রা স্বরধ্বনি বসিয়ে নিয়ে বুঝতো Nefertiti।

৪। হায়ারোগ্লিফিক কখনও ডান থেকে বামে, কখনও বাম থেকে ডানে যেতো। কখনওবা উপর থেকে নিচে। আরেকটি পদ্ধতি ছিলো, যাকে বলা হয় ‘হলাবর্ত পদ্ধতি’, অনেকটা কৃষক যেমন করে জমিতে লাঙল দেন, তেমন করে ডান থেকে বামে, আবার বাম থেকে ডানে এমনিভাবে। তবে বোঝার পদ্ধতি হলো: মানুষ অথবা প্রাণীবাচক চিত্রের মুখ যেদিকে আছে অথবা হাত পা যেদিকে মুখ করে আছে, সেই দিকটাই হলো লিপি পঠনের শুরু আর তা এখন যেদিকেই যাক।

৫। প্রাচীন মিশরীয় ভাষায় সমস্বর শব্দের সংখ্যা অনেক বেশি। যেমন মিশরীয় ভাষায় শুধু SS চিহ্নে লিখিত শব্দটির অর্থ “লিপিকর” এবং “দলিল” দুটোই। এখন কোথায় লিপিকর আর কোথায় দলিল বোঝাবে, তা ঠিক করে নির্ধারক চিহ্ন। SS এর সাথে যখন একজন ‘মানুষের ছবি’ থাকে তখন তা বোঝায় ‘লিপিকর’, আর যখন SS এর সাথে থাকে ‘লেখার ফলক’ বা ‘লেখার পাতা’, তখন তা বোঝায় ‘দলিল’।

৬। মিশরীয় লিখনপদ্ধতি চিত্রলিপি ও ভাবলিপির স্তর পেরিয়ে শব্দ ও অক্ষরলিপিতে পরিণত হলেও সংখ্যাবাচক চিহ্নের বেলায় তা ভাবলিপির স্তরেই থেকে যায়। এরকম অবস্থা এখনো যেমন রোম সংখ্যাচিহ্নে দেখা যায়: I, II, III, IV, V ইত্যাদি। সংখ্যা খুব বড় হয়ে গেলে তা বোঝাতে জ্যামিতিক ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হতো।

৭। মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক চিত্ররূপময়। এই লিপিতে সর্বশেষ ৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে ফিলিতে অবস্থিত দেবী আইসিসের মন্দিরের গায়ে লেখা হয়। হায়ারোগ্লিফিক লিপি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উৎকীর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর ষষ্ঠ শতকে আইসিসের মন্দিরে বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে মিশরীয় লিপির দ্বীপশিখা নিভে যায়।

কিভাবে হাজার বছর পুরনো হায়রোগ্লিফিক পড়া সম্ভব হল?

গ্রিকরা যখন মিশর দখল করে নেয়, তখন তাদের বিশ্বাস ছিলো হায়ারোগ্লিফিক পবিত্র লিপি। আর এই ‘পবিত্রতা’ কথাটা যতদিন কাজ করছিলো গবেষকদের মাথায়, ততদিন কোনো না কোনোভাবে ভুল পাঠোদ্ধার হচ্ছিলো এই লিপির। এতে আরো রহস্যমন্ডিত হচ্ছিলো মিশরীয় ইতিহাস। গ্রিক ঐতিহাসিক প্লুতার্ক (খ্রিষ্টপূর্ব ১২০-খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬) মিশরীয় লিপিকে ধর্মীয় পবিত্র বিষয়াদি লেখার লিপি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। যদিও প্রায় তাঁর সমসাময়িক ইহুদি ঐতিহাসিক যোসেফাস মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে লিখিত বিষয়াদি ধর্মীয় ব্যাপার নয় এবং মূলত এর মধ্যে ছোটবড় যুদ্ধ, অবরোধ ইত্যাদি ঐতিহাসিক বিবরণ রয়েছে বলে মনে করতেন।

সেকালের আরেক ঐতিহাসিক হোরোপোল্লো তাঁর “হায়ারোগ্লিফিক” বইতে মিশরীয় লিপির পাঠোদ্ধার সম্পর্কে প্রলুব্ধকর, অথচ ভ্রান্ত সমাধান তৈরি করে যান। সে সময়কার ইউরোপীয় গবেষকগণ অনেকটা অন্ধের মতোই হোরোপোল্লো’র ঐতিহাসিক বিবরণ আর হায়ারোগ্লিফিকের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করেছিলেন, কেননা হোরোপোল্লো জাতিতে মিশরীয় ছিলেন। তিনি তাঁর বইতে অনেকগুলো হায়ারোগ্লিফের গ্রিক অনুবাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশই ছিলো আসলে ভুল, যা আঠারশ বছর পর ধরা পড়ে সত্যিকার পাঠোদ্ধারের পর। তাঁর এই গবেষণা-দুর্ঘটের মূল কারণ ছিলো তিনি তথ্যের সাথে বিপুল কল্পনা মিশিয়ে ছিলেন।

তারপর এই লিপির পাঠোদ্ধারে এগিয়ে আসেন গণিত ও প্রাচ্যভাষার অধ্যাপক আথানিয়াস কির্শার। তিনি কপ্টিক ভাষা ও গ্রিক ভাষা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন যে, কপ্টিক ভাষা আসলে হায়ারোগ্লিফিকেরই বিবর্তিত রূপ। তাই তিনি কপ্টিক ভাষার মাধ্যমে হায়ারোগ্লিফিকের অনুবাদ করতে গেলেন। কিন্তু তিনিও বিশ্বাস করতেন এই ভাষা পবিত্র, আর তাতেই তিনি তাঁর অনুবাদকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিলেন। তিনি শব্দলিপিকে ভাবলিপি ধরে নিয়ে ধর্মসংশ্লিষ্ট অনুবাদ দাঁড় করালেন একটি স্মৃতিস্তম্ভের গায়ের সাতটি হায়ারোগ্লিফিক চিহ্নকে।

হায়ারোগ্লিফিকসহ অন্যান্য প্রাচীন মিশরীয় লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে আগের ভুল ধারণাগুলো ভাঙার শুরু অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে। তখনই অনেক গবেষক হায়ারোগ্লিফিককে শব্দলিপি বলে সন্দেহ করতে থাকলেন। তখন গবেষকদের হাতে এলো উপবৃত্তাকার এক প্রকারের ফ্রেম, যার ফরাসি নাম কার্তুশ। তাঁরা ধারণা করলেন এগুলোতে হয়তো ফারাও অথবা তাঁদের পত্নিদের নাম লেখা থাকতে পারে। যোহান গেয়র্গ ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর একটি বইয়ে এরকম অনেকগুলো কার্তুশের সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য তুলে ধরে জানান, সদৃশ কার্তুশগুলো একই ব্যক্তির নাম আর বৈসদৃশ কার্তুশগুলো ভিন্ন ভিন্ন নাম।

এরপর ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন মিশর আক্রমণ করেন এবং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর সৈন্যরা বিখ্যাত রোসেটা কৃষ্ণশিলাপট উদ্ধার করেন। রোসেটা কৃষ্ণশিলাপট আসলে একটি শিলালিপি। এতে একই সাথে রয়েছে তিনটি স্তর ও তিন স্তরে তিন লিপি: প্রথম স্তরে মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপি, দ্বিতীয় স্তরে হায়রাটিক লিপি, আর তৃতীয় স্তরে গ্রিক লিপি। কিন্তু লেখার ভাষা ছিলো দুটি: মিশরীয় আর গ্রিক ভাষা। টলেমি রাজবংশের রাজা পঞ্চম টলেমি এপিফানেস ১৯৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এক ফরমান জারি করেন, যা মিশরীয় পুরোহিতদের তত্ত্বাবধানে রোসেটা কৃষ্ণশিলাপটে উৎকীর্ণ হয়। এই দ্বিভাষিক ত্রিলিপি অঙ্কিত শিলালিপিটিই খুলে দিয়েছিলো মিশরীয় লিপি ও ভাষা পঠনের দুয়ার।

পরবর্তিতে হায়ারোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার করেন ফরাসি জাঁ ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিয়ঁ এবং ব্রিটিশ পদার্থবিদ টমাস ইয়ং। তার মাধ্যমে শুধু ধর্মীয় গন্ডিই পেরোনো হয় না একই সাথে সমাপ্তি ঘটে হায়রোগ্লিফিক সংক্রান্ত ভৌতিক অপব্যাখ্যারও।