মেইন ম্যেনু

রাজধানীর সড়কে থৈ থৈ পানিতে তীব্র যানজট

টানা বর্ষণে থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন রাজধানীর সড়কগুলো। জলজটের কারণে যানজটও আগের চেয়ে তীব্র হয়েছে। ফলে ছুটির দিনেও পথ চলতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় নগরবাসীকে।

শনিবার সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কগুলো ঘুরে দেখেছেন প্রতিবেদকরা। ভাঙাচোরা, খানাখন্দে ভরা সড়কগুলোয় জমে ছিল হাঁটু সমান পানি। রিকশা ও সিএনজি চালকদের এসব সড়কে চলাচলের সময় গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে দেখা গেছে। অনবরত বর্ষণ, জলজট আর যানজটের কারণে রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা এবং টেক্সিক্যাবগুলো দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করেছে। যাত্রীসাধারণ জলজটের কবল থেকে বাঁচতে সামান্য পথ পাড়ি দিতে অতিরিক্ত ভাড়া সানন্দে মেনে নিয়েছেন।

কুড়িল বিশ্ব রোডের যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে কথা হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমেরিকান অ্যাম্বাসির সামনে থেকে বসুন্ধরা গেটে গাড়িতে আসতে সময় লাগে ৫-৭ মিনিট। কিন্তু সড়কে পানির কারণে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় লেগেছে আধাঘণ্টা।

লালবাগের বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, আমার অফিস উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে। দুপুর ১২টায় অফিসের জরুরি বৈঠক ছিল। সে কারণে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসা থেকে বের হই। বেলা ১১টার দিকে বনানী ওভারপাস এলাকার সড়কগুলোতে হাঁটু সমান পানি দেখেছি। এই পানি মাড়িয়ে চলাচল করা চালকদের জন্য সত্যিই কঠিন ছিল। তিনি বলেন, অত্যন্ত সতর্ক হয়ে এই পথ পাড়ি দিয়েছি। যদিও নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ৩ হাজার কিলোমিটার সড়কের ৬০ ভাগই এখন ভাঙাচোরা। নিয়মানুযায়ী বর্ষার মৌসুমে রাজধানীর সড়ক খোঁড়া বন্ধ থাকার কথা হলেও রাজধানীর ২০ ভাগ এলাকায় চলছে এ খোঁড়াখুঁড়ি।

জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এসব খোঁড়াখুঁড়ির কাজ করছে। অসময়ে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। কিন্তু এসবের প্রতি কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই ঢাকা ওয়াসা বা ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের।

সরেজমিন দেখা গেছে, মহানগরীর সদরঘাট, লক্ষ্মীবাজার, শ্যামবাজার, সোয়ারীঘাট এলাকায় বৃষ্টির কারণে কিছু কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দোকানের মধ্যেও পানি ঢুকে যেতে দেখা গেছে। তবে বৃষ্টির মধ্যে সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। সদরঘাটের মানুষ ছাতা মাথায়, অনেকে পলিথিন মাথায় দিয়ে দৈনন্দিন কাজে নেমে পড়েন। ওইসব এলাকায় ফুটপাতের দোকানিরা পলিথিন মাথায় নিয়েই ইফতার সামগ্রী ও ফল বিক্রি করেছেন। তবে অনেক জায়গায় নিু আয়ের মানুষকে কাজ না পেয়ে অলস বসে থাকতেও দেখা গেছে।

দেখা গেছে, রাজধানীর মুগদা থানার গলি ভাঙাচোরা। বৃষ্টির কারণে এই এলাকা এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোনো যানবাহন তো চলছেই না, যাচ্ছে না কোনো রিকশাও। টিটিপাড়া মোড়েও পানি জমে গেছে। রাজধানীর শান্তিনগরেও বরাবরের মতো পানি জমে একাকার হয়ে আছে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে মানুষ। এ ছাড়া মতিঝিলের ঢালু জায়গাগুলোতে পানি উঠে গেছে। পানি উঠেছে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচেও। ফ্লাইওভারের নিচের খানাখন্দ পানিতে ডুবে যায়।

নতুন বাজার মোড় থেকে বসুন্ধরা গেট পর্যন্ত সড়ক কয়েক মাস আগেও পরিপাটি ছিল। ঢাকা ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বুসন্ধরা গেটসহ আশপাশের এলাকায় এখন তৈরি হয় হাঁটু সামান কাদাপানি। এই সড়কে চলাচলে চরম ভোগান্তির কবলে পড়ছেন নগরবাসী।

কেন জলাবদ্ধতা হচ্ছে? : নগর সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রাজধানীতে সড়ক রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। এরমধ্যে ২৫০০ কিলোমিটার সড়কে পানি নিষ্কাশনের খোলা ড্রেন রয়েছে সিটি কর্পোরেশনের, যা প্রয়োজনের তুলনায় ৫০০ কিলোমিটার কম। আর ঢাকা ওয়াসার পানি নিষ্কাশনের গভীর ড্রেন রয়েছে মাত্র ৩৪৬ কিলোমিটার, যা প্রয়োজনের তুলনায় ২৬৫৪ কিলোমিটার কম।

জানা গেছে, সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানীর সড়কে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত ‘ড্রেনেজ সিস্টেম’ না থাকা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৭৫ পানি নিষ্কাশন ড্রেন থাকলেও ঢাকা ওয়াসার আছে মাত্র ২৫ ভাগ ড্রেন। রাজধানীর সব এলাকা ড্রেনেজ সিস্টেমের আওতায় না আসায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে এখনও যে পরিমাণ ড্রেন রয়েছে এগুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না আমরা। এর কারণ হল, সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনগুলোয় গৃহস্থালি এবং ভবন নির্মাণ সামগ্রীর আবর্জনা ফেলা হয়। ফলে সিটি কর্পোরেশনের ড্রেনগুলো আবর্জনায় ভরে থাকে। বৃষ্টির সময় এসব ড্রেন দিয়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে সড়কে পানি জমে থাকে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন পবার তথ্যমতে, রাজধানীতে যেহারে মানুষ বেড়েছে সেহারে পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়েনি। অন্যদিকে পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক চ্যানেলগুলো নষ্ট করা হয়েছে।

পবার তথ্যে আরও জানা গেছে, ষাটের দশকেও রাজধানীতে প্রায় অর্ধশত খাল এবং বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় ডোবা, নালা ছিল। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসার ড্রেনের পাশাপাশি খাল এবং অন্যান্য জলাধারগুলো পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু খাল-পুকুর-ডোবা-নালা ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক নিয়মে পানি নিষ্কাশন হতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।

পবার জরিপের তথ্যে আরও জানা গেছে, বর্তমান সময়ে রাজধানীর পরিধি বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। এই নগ্ন প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। কেননা, পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমানভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হবে না। জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসডিএম কামরুল আলম চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতার নানা কারণ রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া।

এছাড়া ঢাকা ওয়াসার যেসব ড্রেন রয়েছে তা গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার অনেকে চেষ্টা করেও এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমেছে, ভারী বর্ষণ হলে মহানগরীর বিভিন্ন সড়কে জলজট তৈরি হয়। যার ফলে কিছু সময়ের জন্য রাজধানীবাসীকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’