মেইন ম্যেনু

রাজনীতি সবসময় ’বড় ভাই’দের কবলেই!!

দেশের রাজনীতি এখন বড় ভাইদের কবলে। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দখলদারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে তৎপর হয়ে উঠেছে এই বড় ভাইয়েরা। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কলুষিত হচ্ছে দেশের রাজনীতি। কমবেশি প্রতিটি দলেই বড় ভাইদের অবস্থান ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে রাজনীতিতে তৈরি হচ্ছে গভীর সংকট। অপরাধবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে নিরাপত্তা কিংবা আইনবিশেষজ্ঞ সবাই বলছেন, এ মুহূর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনোভাবেই এই অপসংস্কৃতি থেকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। শুধু রাজনীতি রক্ষার জন্যই নয়, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে একমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই পারে বড় ভাইয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে।

জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের একটি বড় অংশই আজ নিজেদের বড় ভাই বলে মনে করছে। বিভিন্ন দলে বিভক্ত হলেও তাদের চরিত্র একই। নির্ভয়ে নির্দ্বিধায় তারা হাতে তুলে নিচ্ছেন আইনের শাসন। এসব বড় ভাইদের ইশারা ছাড়া মাঠপর্যায়ের কোনো টেন্ডারই হচ্ছে না। টেন্ডারবাজির স্বার্থে কেউ বাসস্ট্যান্ড কিংবা হাসপাতালে বসে বড় ভাই সাজছেন। কেউ আবার এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জেলা পরিষদ কিংবা করপোরেশনে গিয়ে বড় ভাই সেজে বসে পড়ছেন। তাদের খপ্পর থেকে বাদ যাচ্ছে না পৌরসভাও। একচ্ছত্রভাবেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এই টেন্ডরবাজরা। এখানে বসে বসেই নিজেদের অনুসারীদের ভেতর কাজ বিতরণ করছেন তারা।

জানা গেছে, ক্ষমতাধর এই বড় ভাইয়েরা বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। সবচেয়ে ওপরের পর্যায়ের বড় ভাইদের রয়েছে উপরিপর্যায়ের লবিং ও ক্ষমতা। রয়েছে বড় রাজনীতিক দল বা দলের নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। এ পর্যায়ের বড় ভাইয়েরাই থাকেন সবচেয়ে দাপুটে অবস্থানে। রাজনৈতিক নেতার ছত্রচ্ছায়ায় তারা নিজেদের বাহিনী গড়ে তোলেন। এমনকি এই দাপুটেদের সরকারি দল বিরোধীসহ ছোট-বড় সব দলের সঙ্গেই যোগাযোগ থাকে। সে কারণে আইনের শাসনকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যা খুশি তা-ই করে চলেন।

জানা গেছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতারাই এসব বড় ভাই বানানোর সবচেয়ে বড় কারিগর। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বড় ভাই বাহিনী। এদের অনেকে চরমপন্থি হিসেবেও খ্যাত। কারণে-অকারণে প্রতিপক্ষকে গুলি করে হত্যা করেন এই সন্ত্রাসীরা। আরেক ধরনের বড় ভাই বাহিনী আছে, যারা মূলত রাজধানীসহ শহরাঞ্চলগুলোতে বিশেষ উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করার জন্যই তারা বিভিন্ন খুন-খারাবিতে লিপ্ত হন। পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে কেবল জনগণের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হচ্ছে না, পাল্টে যাচ্ছে পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। অথচ ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন এই ক্যাডাররা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে ও বিচার-বিশ্লেষণে জানা গেছে, আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গডফাদাররূপী এই বড় ভাইয়েরা কেবল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই নয়, ব্যবসার স্বার্থে গড়ে তোলেন বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সাম্রাজ্য। এদের মধ্যে বড় একটি অংশ জড়িয়ে পড়ে মাদক ব্যবসায়। রাতারাতি হয়ে যায় বিশাল মাদক ব্যবসায়ী। এর পরও রাজনৈতিক খোলস থাকার কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী সাদিকা হালিম মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ভাইনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমরা ছোট ভাই বড় ভাই গণ্ডির মধ্য দিয়ে বড় হই। এমনকি মাদক সেবন ও মাদকের ব্যবসার ক্ষেত্রে এই বড় ভাই সংস্কৃতির রীতি চালু রয়েছে। ফলে সম্প্রতি বিদেশি হত্যার দায় স্বীকার করা অপরাধীরা যে বড় ভাইয়ের কথা বলেছেন, সেটি অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। বরং এই বড় ভাইদের নেপথ্যে কারা আছেন, কারা কলকাঠি নাড়ছেন সেটিই চিন্তার বিষয়। নতুন করে ভেবে দেখার বিষয়।’
সাবেক এই তথ্য কমিশনার বলেন, ‘বড় ভাই, বড় চাচা, বড় মামা বুঝি না, আমরা বুঝি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। আর সে কারণে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে এ মুহূর্তে সরকারকে যে করেই হোক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজেরও ভূমিকা রাখতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জানা যায়, সম্প্রতি দখলবাজি, চাঁদাবাজির শতভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংঘটিত হচ্ছে বড় ভাইদের ইশারায়। এরই সঙ্গে দিন দিন বাড়ছে বড় ভাইনির্ভর রাজনীতির পরিসর।
অপরাধ-বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ভাইনির্ভর রাজনীতিতে সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট বড় ভাইয়েরাই থাকেন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে। সুযোগসন্ধানী এই সন্ত্রাসী বাহিনী সব সময়ই প্রস্তুত থাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাতে। অন্যদিকে বিরোধী দলের আশীর্বাদপুষ্ট বড় ভাইয়েরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৎপর থাকেন পরিকল্পিত ইস্যু তৈরির জন্য। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা ধরা পড়ে যান। কখনো কখনো আবার চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অব.) এম রশিদ বলেন, ‘কিছু দুর্বৃত্ত, যারা সহিংসতা করার ক্ষমতা রাখে, তারাই একদিন বড় ভাই হয়ে ওঠে। অপরাজনীতির কারণে এই বড় ভাইদের আবির্ভাব। এদের ক্ষমতা এতই বেশি যে, তারা কোনো দল বা সংগঠনের গোপন আর্মস ক্যাডার বা সশস্ত্র গোষ্ঠীকেও নিয়ন্ত্রণ করে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি দুই বিদেশি হত্যার সঙ্গে যে বড় ভাইদের কথা আমরা শুনেছি, তারা এ ধরনেরই। তাদের নির্দেশে হত্যা ও সহিংসতার মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করছে।’ তিনি বলেন, বড় ভাইদের নির্দেশে বিদেশি হত্যা পেশাদার খুনিরা টাকার বিনিময়ে করেছে। এটি তেমন উদ্বেগের বিষয় নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে. শীর্ষ নেতারা যদি এই বড় ভাইদের মাঠে নামান। তাদের মস্তিষ্ক থেকে যদি এমন সহিংস রাজনীতির বিষয় আসে, সেটি আমাদের জন্য ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়।’ বিভিন্ন চাঁদাবাজি, দখলের সঙ্গেও বড় ভাইদের নাম আছে উল্লেখ করে মেজর জেনারেল (অব.) রশিদ বলেন, বিদেশি হত্যাকাণ্ডে যে বড় ভাই, তার সঙ্গে ছোটখাটো চাঁদাবাজ-দখলবাজদের এক করে দেখা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিয়াউর রহমান মনে করেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বড় ভাইয়ের আধিপত্য আগের তুলনায় কমেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে পোস্ট-পজিশন পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বড় ভাই সংস্কৃতি নতুন করে বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবকেই দায়ী করছেন অধ্যাপক জিয়াউর রহমান।