মেইন ম্যেনু

রাজস্ব হিসাবে গরমিল : মুখোমুখি এনবিআর ও সিজিএ

২০১৪-১৫ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের হিসাবে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও প্রধান হিসাব রক্ষণ কার্যালয়ের (সিজিএ) হিসাবে এই গরমিল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। যদিও প্রতিষ্ঠান দুটির হিসাবে পার্থক্য নতুন কিছু নয়। গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তবে প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায়ের পার্থক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এই পার্থক্যে সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সিজিএর এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে তাদের ও এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের পার্থক্য ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে পার্থক্য ছিল ৩ হাজার ৪২৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পার্থক্য ছিল ৫ হাজার ৬৭২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পার্থক্য ছিল ৯ হাজার ৩৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই পার্থক্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। সিজিএর একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে এনবিআর সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে বলে দাবি করে, যা ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছে। যেখানে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুল্ক খাতে ৩৮ হাজার ২৩৫ কোটি, ভ্যাটে ৪৮ হাজার ৬৩৮ দশমিক ১ কোটি এবং আয়কর ও ভ্রমণে ৪৯ হাজার ৩৯৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।

তবে জমা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসাব রক্ষণ কার্যালয় বলছে, এনবিআর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৮৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। আর ওই টাকাই এনবিআর সিজিএতে জমা দিয়েছে। এতে করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায়কারী ও জমা গ্রহণকারী এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি ২০ লাখ টাকার ফারাক দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে রাষ্টীয় দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোপনে একাধিক চিঠি চালাচালিও হয়েছে। চিঠিতে এনবিআর বলছে, তারা রাজস্ব আদায় করে সময় মতো জমা দিয়েছে ও তাদের হিসাব সঠিক।

অন্যদিকে সিজিএ বলছে, এনবিআর এক রাজস্ব চালান একাধিকবার হিসাব করেছে ও জমা দিয়েছে। যার কারণে রাজস্ব আদায়ের হিসাব বেড়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, গত বছর প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। সিজিএর এ হিসাবে এনবিআর প্রায় পৌনে ১৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় বেশি দেখিয়েছে। তবে সিজিএর এ হিসাবের সঙ্গে একমত নয় এনবিআর।

খাতওয়ারি হিসেবে সিজিএ ও এনবিআরের মধ্যে পার্থক্য হলো

মূসক : এনবিআর গত অর্থবছরে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বাবদ ৪৯ হাজার ১৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। যেখানে সিজিএর মতে এনবিআর উল্লেখিত বছরে ৪২ হাজার ৪৬৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের মতপার্থক্যে মূসক খাতে ৬ হাজার ৫৪৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার রাজস্ব গিরমিল পাওয়া যায়।

আয়কর : এনবিআরের হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর বাবদ ৪৯ হাজার ৯৯৩ কোটি ১১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। অথচ সিজিএ বলছে, এনবিআর উল্লেখিত অর্থবছরে ৪১ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের মতপার্থক্যে আয়কর খাতে ৭ হাজার ৫০৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার দেখা দিয়েছে।

শুল্কখাত : আমদানি শুল্ক খাতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সিজিএর মতে গত অর্থবছরে এনবিআরের দেওয়া হিসাবের চেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। সিজিএর মতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি শুল্ক বাবদ ৪০ হাজার ৩৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অন্যদিকে এনবিআর বলছে এ খাতে ৩৮ হাজার ৩৩৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাব পাথর্ক্যে এ খাতে ১ হাজার ৭০২ কোটি ৬২ লাখ টাকা দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ রাইজিংবিডিকে বলেন, সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আদায়ে এই উদ্বেগজনক। কেন এমন হচ্ছে, বিষযটি এনবিআর ও সিজিএ দুই পক্ষকেই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত। কেননা সরকার এনবিআরের আয়ের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের কর্ম পরিকল্পনা করে থাকে।

তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে এত বড় দেখা দিলে সরকারি আয়-ব্যয়ের প্রভাব পড়বে। বছর শেষে যদি বলা হয়, ১৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কম আদায় হয়েছে, তখন এ টাকা সরকার অনবে কোথা থেকে? সরকার ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে খরচ করে ফেলেছে।

আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম মনিটরিংয়ের জন্য (২০০৭-০৮ অর্থবছর) বিশেষ টিম করে দিয়েছিলাম। বর্তমানে কেন এমন গরমিল হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা উচিত।’