মেইন ম্যেনু

রাজ্জাক ফিরেছেন ইজ্জত কি ফিরেছে?

অবশেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র নায়েক আবদুর রাজ্জাক দেশে ফিরেছেন। মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পুরো ৯দিন পর দু দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে পতাকা বৈঠকের পর আমরা ফিরে পেয়েছি তাকে। রাজ্জাককে অপহরণ, আটকে রাখা এবং সবশেষে ফেরত পাওয়া, এ নিয়ে এখন নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। ইতোমধ্যেই অনেকে বিষয়টিকে সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য বলে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ হাঁটছেন একেবারেই উল্টো পথে। বলছেন, পুরো ঘটনাটাই সরকারের একটা বিশাল ব্যর্থতা।

সম্ভবত এই দুই ধরনের সিদ্ধান্তের মধ্যেই কিছুটা বাড়াবাড়ি রয়েছে। আর তাছাড়া প্রতিটা ঘটনার মধ্যেই সাফল্য বা ব্যর্থতা খুঁজতে হবে কেন? এর বাইরেও তো কিছু থাকতে পারে, যা থেকে আত্মোপলব্ধি হতে পারবে।

তবে এটা মানতে হবে, রাজ্জাককে বিজিপি ধরে নিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে মানুষের মধ্যে তথ্যগত নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। বিজিবি নামের এই বাহিনীটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সেই মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যকেই তো সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে মানতে হবে। তো স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একেবারে শুরুতে কি বললেন? তিনি বললেন, একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটি হয়েছে। শিগগিরই আমরা রাজ্জাককে ফেরত পেয়ে যাব। দু’দিন, তিনদিন, চারদিন পরও যখন রাজ্জাককে ফেরত পাওয়া গেল না বরং মিয়ানমারের পক্ষ থেকে উদ্ভট সব দাবি আসতে থাকল, তখন আবার বিরক্ত হয়ে এই প্রতিমন্ত্রীই একদিন বললেন, মিয়ানমার বাড়াবাড়ি করছে। হুম, এটা ঠিক আছে, বাড়াবাড়ি করছে কি করছে না সেটা বুঝতে দিন কয়েক সময় লাগতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, একেবারে শুরুতে যে ‘ভুল বোঝাবুঝি’র কথাটা বললেন, সেটির ভিত্তিটা কি?

কক্সবাজার বিজিবি’র কর্মকর্তারা কিন্তু শুরু থেকেই বলছিলেন রাজ্জাককে বিজিপি’র লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে। কেবল একেবারে বাংলাদেশ সীমানার মধ্যে ঢুকে ধরে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ সহজ বাংলায় যাকে রীতিমতো অপহরণই বলা যায়। আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর একজন সদস্যকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ‘ভুল বোঝাবুঝি’ কোথায় দেখলেন, সে বিষয়টিও সম্ভবত পরিষ্কার হলো না।

পরবর্তী সময়ে পুরো ঘটনাটা জানা গেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়। ১৭ জুন ভোরে নাফ নদীতে বাংলাদেশের জলসীমায় একটি নৌকায় তল্লাশি চালাতে যায় বিজিবি’র সদস্যরা। যে এলাকায় তারা এই তল্লাশি করছিল, সেটিকে স্থানীয়রা ইয়াবা পাচারের রুট হিসেবেই জানে। এই তল্লাশির সময়ই হঠাৎ করে একটি স্পিডবোটে করে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা সেখানে হাজির হয়। তারা তল্লাশিতে বাধা দেয় এবং বিজিবি’র সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে লিপ্ত হয়। এরই মধ্যে তারা গোলাগুলিও শুরু করে। তাদের গুলিতে সেখানে থাকা বিজিবির সদস্য বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। এরপর তারা নৌকা ও এর মাঝি লালমোহন, মাঝির সহকারী ১২ বছরের জীবন দাসসহ নায়েক রাজ্জাককে মিয়ানমারে ধরে নিয়ে যায়। ওই দিন সন্ধ্যায় মাঝি ও তার সহকারীকে (ভাগনে) ছেড়ে দেওয়া হয়।

নৌকার মাঝি জানায়, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বিজিপি নাকি রাজ্জাককে দেখিয়ে তার কাছে জানতে চেয়েছিল, এই লোক হাবিলদার লুৎফর কি না। অর্থাৎ ওদের লক্ষ্য নায়েক রাজ্জাক ছিল না, অপহরণ করতে চেয়েছিল তারা হাবিলদার লুৎফরকে। লুৎফরের ব্যাপারে তাদের এই আগ্রহের বিষয়টি বোঝা যায় প্রেস কনফারেন্সে বিজিবি প্রধানের বক্তব্য থেকেই। রাজ্জাককে ফেরত পাওয়ার পর বিজিবি’র ডিজি জেনারেল আজিজ জানান, গত বছর এই এলাকা থেকে ১২ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ইয়াবা উদ্ধারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিটি হচ্ছেন হাবিলদার লুৎফর। সেজন্য তাকে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কৃতও করা হয়েছিল।

বিজিবি’র ডিজি’র বক্তব্য থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় তা হচ্ছে, ওই এলাকায় অপরাধ বলতে যা কিছু ঘটে তা এই মাদক, অস্ত্র আর মানবপাচারকে কেন্দ্র করেই। যে ব্যক্তি, তা সে সরকারি হোক বা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী হোক, এই পাচার কর্মকা-ে বাধার কারণ হবে, তাকেই পড়তে হবে অপরাধীদের রোষানলে। হাবিলদার লুৎফর সেই রোষানলে পড়েছেন। নায়েক রাজ্জাককে হাবিলদার লুৎফর মনে করায় তাকেই এই ৯ দিন ভোগ করতে হয়েছে নরক যন্ত্রণা।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার কিংবা ইয়াবা পাচারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হওয়ার কারণে বিজিবি’র কোনো সদস্যের উপর মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বিজিপি কেন ক্ষুব্ধ হবে? মাদক পাচার বন্ধের ক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল সভ্য দেশই তো বদ্ধপরিকর। মাদক পাচারকে কোনো কোনো দেশ মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে, এর জন্য সর্বোচ্চ সাজার ব্যবস্থা পর্যন্ত রয়েছে। এই তো মাত্র কয়দিন আগে ইন্দোনেশিয়াতে মাদক পাচারের দায়ে একজন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিককে মৃত্যুদ- পর্যন্ত দেওয়া হয়। এ নিয়ে দুদেশের সম্পর্কে অবনতির আশঙ্কা সত্ত্বেও সাজা কার্যকরে পিছপা হয়নি ইন্দোনেশিয়া। তাহলে মাদক পাচারে বাধাদানকারীদের উপরেই ক্ষুব্ধ কেন হচ্ছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা? জেনারেল আজিজ অবশ্য এ প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, আপনারা যা বোঝার বুঝে নিন।

আসলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আমাদের সঙ্গে তাদের সীমান্ত চরিত্র, এসবের দিকে তাকালে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। মিয়ানমারে সামরিক শাসন চলছে কয়েক দশক ধরে। খুবই কঠিন সামরিক শাসন সেখানে। এতদিন তারা দুনিয়ার কোনো দেশকে পাত্তা দিত না, চলত নিজেদের মতো করে। ২০১০ সালের নির্বাচনের পর থেকে সেখানে একধরনের সীমিত গণতন্ত্রের চর্চা হতে শুরু করে। কিন্তু সেটা এতটাই গণতন্ত্র যে, দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দল সুচি’র ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসিকে নির্বাচনেই অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। তারা একটা সংবিধান করেছে ২০০৮ সালে। তাতে এমন বিধান রাখা হয়েছে যে, সুচি কখনোই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সেখানে রয়েছ দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট, যে পার্লামেন্টের আবার ২৫ শতাংশ আসন সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। সংখ্যায় ২৫ শতাংশ হলেও, এরাই সম্ভবত বেশি ক্ষমতাবান। এরা ভেটো দিলে কোনো আইন পাস হতে পারবে না।

কেবল সামরিক শাসনের কারণেই নয়, ইতোমধ্যে দুর্নীতি এবং জাতিগত নৃশংসতার কারণেও তারা দুনিয়াজুড়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। পৃথিবীর ১৭৭টি দেশের মধ্যে দুর্নীতির মাপকাঠিতে মিয়ানমারের অবস্থান ১৫৭তম। বলা হয়ে থাকে, সেনাবাহিনী যেহেতু দেশটির প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে, সে কারণে তাদের মধ্যেই আসলে রয়ে গেছে দুর্নীতির মূল ভিত্তিটা। দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে তাদের সেনাবাহিনীতেও। তো দেশব্যাপী দুর্নীতির সেই প্রতিযোগিতায় তাদের সীমান্তরক্ষী বিজিপি-ই বা পিছিয়ে থাকবে কেন?

জেনারেল আজিজ সরাসরি না বললেও, বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি যে, এই যে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা নামক ভয়ঙ্কর মাদক ঢুকছে বাংলাদেশে, তার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে মিয়ানমারের বিজিপি। মজার ব্যাপার হলো, ইয়াবা কিন্তু মিয়ানমারে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় থাইল্যান্ডে। সেখান থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে। বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বড় সীমান্ত হলো ভারতের। মিয়ানমারের সীমান্ত খুবই সামান্য, মাত্র ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬৪ কিলোমিটার হচ্ছে নাফ নদী। নদীর একপাড়ে বাংলাদেশ অপর পারে মিয়ানমার। বাকি যে স্থল সীমান্ত আছে, তার বেশিরভাগের রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া। নদীর মাঝে তো আর বেড়া দেওয়া যায় না, তাই এই ৬৪ কিলোমিটারই হচ্ছে চোরাচালানের সহজতম রুট। এই পথেই আরও অনেক কিছুর সঙ্গে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ঢুকে ইয়াবা। মাদকের বিরুদ্ধে ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণে ভারতের পরিবর্তে চোরাকারবারিরা নিরাপদ রুট হিসেবে মিয়ানমারকেই বেছে নিয়েছে।

ওদিকে মিয়ানমার ও তার লোকজন দুর্নীতিপরায়ণ সেটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু আমরা করছিটা কি? আমাদের লোকজন কতটা দুধে ধোয়া তুলসী পাতা। ইয়াবা কি আমাদের ঢাকায় এসেও মিয়ানমারের লোকেরাই বিক্রি করে? ওদের পাঠানো চালানগুলো কক্সবাজারে কারা গ্রহণ করে? তাদের কি আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি? কক্সবাজারের স্থানীয় যে কোনো লোককে জিজ্ঞাসা করুন, কে জড়িত এই মাদক চোরাচালানে, উত্তর পেতে কোনোই কষ্ট হবে না। সবাই জানেন, কে কে করছে, কিভাবে করছে। কিন্তু চিহ্নিত এই লোকগুলোকে ধরা হচ্ছে না। লোক দেখাতে দু-একবার ধরা হলেও আবার ছেড়েও দেওয়া হচ্ছে। এদেরকে না ধরে, সীমান্তে বিজিপি’র নাকের ডগায় লুৎফর বা রাজ্জাককে ইয়াবা ধরতে পাঠানো তো প্রকারান্তরে তাদেরকে মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দেওয়া। আমাদের ভাগ্য ভালো রাজ্জাককে এবার জীবন্ত ফিরে পেয়েছি। মিজানুরকে কিন্তু মৃত ফেরত পেয়েছিলাম। মিজানুরও ছিলেন বিজিবি’র সদস্য, নায়েক সুবেদার। গত বছর ২৮ মে বান্দরবানের পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকা থেকে মিজানুরকে অপহরণ করে নিয়ে যায় বিজিপি। নিয়ে তাকে হত্যা করে তারা। দুই দিন ধরে অনেক দেন দরবার শেষে আমরা কেবল মিজানুরের লাশটা ফেরত পেয়েছিলাম। সেই লাশ আনতে গিয়েও বিজিবি সদস্যরা উল্টো বিজিপি’র গুলির মুখে পড়ে। রাজ্জাক না হয়ে যদি এবার লুৎফর অপহৃত হতো, তাহলে কি হতো কে জানে?

প্রাণে না মারলেও রাজ্জাককে নিয়ে অপমান কিন্তু কম করা হয়নি। তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে, হাতে হাতকড়া পড়ানো হয়েছে। প্যান্ট খুলে তাকে লুঙ্গি পরানো হয়েছে। এই অবস্থায় ছবি তুলে বিজিপি তাদের ফেসবুকে তা আপলোড করেছে। আমাদেরকে দেখতে হয়েছে বিজিবি’র অর্ধেক পোশাক পরিহিত রাজ্জাক হাতকড়া পরে দাঁড়িয়ে আছে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমাদের করণীয় কি? আমাদের সরকার, সরকারের মন্ত্রীরা যা করছেন, করেছেন, তা কি সন্তোষজনক? তাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কি এতটুকুই ছিল? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী যে কোনো খবরই রাখেন না, এলোমেলো কথা বলে বরং মানুষকে বিভ্রান্ত করেন, সেটা তো ইতোমধ্যেই প্রমাণিত। কিন্তু অন্য মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যরাই বা কি করলেন। রাজ্জাক অপহরণের এই ঘটনা যখন পুরো জাতিকে বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত, লজ্জিত করছিল, তখন দেশের জাতীয় সংসদ চলছিল। সেখানে সম্মানিত এমপিগণ ততধিক সম্মানিত নেতা-নেত্রীর স্তুতিতে মহাব্যস্ত। মানি, এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও এই ঘটনাটি কি একবারের জন্য সংসদের আলোচনায় আসতে পারত না। কোনো একজন সংসদ সদস্যের মনেও নিশ্চয়ই বিষয়টি বিন্দুমাত্র দাগ কাটেনি, নাহলে নিশ্চয়ই তিনি এ নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। এই জায়গাটিতে আমাদের জনপ্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। জনগণের ভোট ছাড়াই যারা কেবলমাত্র ব্যক্তি বিশেষের বদান্যতায় ‘জনপ্রতিনিধি’ বনে গেছেন, তাদের কাছ থেকে অবশ্য এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করা যায় না। -সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।