মেইন ম্যেনু

রানা প্লাজার আহত সেজে বিস্ময়কর প্রতারণা! (ভিডিও)

জীবনে কত রকমের প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা চাক্ষুষ করার অভিজ্ঞতা আমাদের হয়। কিন্তু হাসপাতাল, দেশি-বিদেশি সংস্থা থেকে শুরু করে খোদ সরকার- একই সময়ে সবার সঙ্গে টানা মাসের পর মাস প্রতারণা করে যাওয়ার গল্প কজনের জানা আছে!

এমনই বিস্ময়কর এক প্রতারণার জন্ম দিয়েছেন রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দের একজন জনপ্রতিনিধি। নাম তার ইউনুস আলী সর্দার ওরফে ইউসুফ।

বিশ্বজুড়ে আলোচিত রানা প্লাজা ধসের ঘটনার আহত উদ্ধারকারী পরিচয় দিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর অনুদানসহ পকেটে পুরেছেন কোটি টাকার সহায়তা। সঙ্গে ১৬ কোটি মানুষের সহানূভুতি তো আছেই। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কারো নজরে আসেনি ইউসুফের প্রতারণার ছক।

সহায়তার অর্থ দিয়ে ইউসুফ গোয়ালন্দের নূরু মণ্ডলের পাড়ায় চার লাখ টাকা খরচ করে বাড়ি বানিয়েছেন, যেখানে সহায়তা করেছে ডেনমার্কের একটি এনজিও। এ ছাড়া ইউসুফ গড়ে তুলেছেন একটি গরুর খামার। ১২ লাখ টাকা খরচ করে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। রানা প্লাজার প্রতারণা করে জমানো টাকার হিসাব-নিকাশ করার জন্য রেখেছেন ব্যক্তিগত সহকারী।

দুটি ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে জানা গেছে।

অথচ ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রানা প্লাজা ধসের দিন ইউসুফ গোয়ালন্দে একটি গাছ থেকে পড়ে মাথায় ও ঘাড়ে গুরুতর আঘাত পান। আর একে পুঁজি করে ‘সুচতুর’ প্রতারণার ঘুঁটি সাজান ইউসুফ।

সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েন্টিফোরে প্রচারিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে ইউসুফের এই প্রতারণার ইতিবৃত্ত।

ইউসুফের পরিবার, গোয়ালন্দের জনপ্রতিনিধি,এলাকাবাসী ও একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

এতে বলা হয়, ইউসুফ গোয়ালন্দের একজন ইউপি সদস্য। পেশায় গাছ ব্যবসায়ী। রানা প্লাজা ধসের দিন তিনি তার এলাকায় একটি গাছ কাটতে গিয়ে মগডাল থেকে পড়ে যান। এতে তার মাথায় বড় ধরনের আঘাত লাগে। প্রথমে তাকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিছুদিন সেখানে চিকিৎসা দেয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে ইউসুফকে আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

প্রতারণার শুরুটা এখান থেকেই। সার্জারি বিভাগের রোগী হলেও ঢাকা মেডিকেলে ইউসুফ ভর্তি হন মেডিসিন বিভাগে। এমনকি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নাম নিবন্ধনও করেননি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মনে করে, একটি চক্র তাকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে সহায়তা করেছে।

ওই সময় সাভারের এনাম মেডিকেল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল রানা প্লাজায় আহত অসংখ্য শ্রমিকের। ইউসুফ স্থায়ী ঠিকানা গোপন করে নিজেকে পরিচয় দেন সাভারের বাসিন্দা ও রানা প্লাজায় হতাহতদের উদ্ধারকারী হিসেবে।

এর পরই বদলে যায় ইউসুফের জীবন। তিন দিন ঢাকা মেডিকেলে থাকার পর বিজিএমইএর তত্ত্বাবধানে তাকে নেয়া হয় অ্যাপোলো হাসপাতালে। সেখানে ২৫ দিন চিকিৎসা নেয়ার পর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য নেয়া হয় সাভারের সিআরপিতে। সেখানে প্রায় ১৭ মাস তাকে চিকিৎসা দেয়া হয় রানা প্লাজার আহত উদ্ধারকারী হিসেবে।

এরই মধ্যে ইউসুফ তখন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ‘রানা প্লাজার বীর’। তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে গণমাধ্যমগুলো। বিজিএমইএও তাদের তালিকায় ইউসুফের নাম তোলে রানা প্লাজার উদ্ধারকারীদের তালিকায়।

এই সময়ে ও পরে ‘রানা প্লাজার আহত ’ হিসেবে দেশি-বিদেশি নানা সহায়তা পান গাছ থেকে পড়ে আহত ইউসুফ।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেয়া ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কয়েক লাখ টাকা পাওয়ার কথা ইউসুফের পরিবার স্বীকার করলেও এলাকায় তিনি কোটিপতি বলে পরিচিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ছাড়াও ইউসুফকে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া হয়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা। তার পেছনে চিকিৎসা বাবদ বিজিএমইএ খরচ করেছে আট লাখ টাকা।

মোট কথা, সরকারি-বেসরকারি অনুদান ও বিদেশি বিভিন্ন এনজিও, দাতা সংস্থার দেয়া কোনো অর্থসহায়তা থেকে বঞ্চিত হননি ইউসুফ। অথচ কত কত আহত কিংবা নিহতের পরিবার সামান্য সহায়তা পাওয়ার জন্য হা-পিত্তেশ করে দোয়ারে দোয়ারে ধরনা দিচ্ছে।

রানা প্লাজার আহত সেজে সহায়তা নেয়ার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ইউসুফের সঙ্গে। কিন্তু অন্য সময় কথা বলতে পারলেও এ সময় মুখ খোলেননি তিনি। এর মাধ্যমে বোঝাতে চান কথা বলতে পারেন না তিনি।

তার স্ত্রীর কাছে জানা যায়, কম বললেও সময় সময় তিনি (ইউসুফ) কথা বলেন। আর কীভাবে কী হয়েছে তা তাদের জানা নেই বলে জানান ইউসুফের স্ত্রী।

ইউসুফের বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথা। তার দাবি, পোশাকশিল্পে এমন দুর্ঘটনার সময় কিছু চক্র প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে।

সাত মিনিটের এই প্রতিবেদন প্রচার করায় নিজের প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বার্তা বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মাকসুদ উন নবী।তিনি বলেন, “রানা প্লাজা ধসের দিন থেকে টানা ১৫ দিন ঘটনাস্থলে থেকে কাজ করেছি। আহতদের আতর্নাদ, স্বজনহারাদের কান্না দেখেছি। কাজ করতে গিয়ে নিজেও আহত হয়েছি। সে কারণে এমন একটি বিষয় নিয়ে প্রতারণা মানতে পারিনি। তার (ইউসুফের) কারণে বঞ্চিত হয়েছে একজন আহত বা নিহত কেউ। তাই বিবেকের তাড়নায় অনুসন্ধান শুরু করে সত্য ঘটনা তুলে আনার চেষ্টা করেছি।”

তরুণ এই সংবাদকর্মীর দাবি, প্রশাসন ও বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান করে এই ভয়াবহ প্রতারণার সঙ্গে কোনো চক্র জড়িত আছে কি না, তা বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে।