মেইন ম্যেনু

গোপনে বিয়ে, অত:পর মা হলেন রানা প্লাজার সেই মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমা

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকেঃ মৃত্যুঞ্জয়ী রেশমা কন্যা সন্তানের মা হয়েছেন। চুপিসারে তার প্রেমিক রাব্বিকে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেয়ার পর মেয়ের বিয়ের খবর জানতে পেরেছে রেশমার মা জোবেদা খাতুন। তবে প্রেমিক রাব্বিকে নিয়ে ৬ মাস আগে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট বেরিয়ে গেছেন রেশমা। সন্তান জন্ম দেয়ার প্রায় ৪০ দিন অতিবাহিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন, রেশমা’র সৎ বাবা আরজন আলী বাবু। তিনি বলেন, সন্তান জন্মের খবর পেয়ে ২২ মার্চ তার স্ত্রী জোবেদা খাতুনসহ তিনি রাজধানীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে গিয়েছিলেন রেশমা ও তার কন্যা সন্তানকে দেখতে। রেশমার স্বামী রাব্বি একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করেন। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। চলতি মাসের ২৬ তারিখে রেশমা দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মায়ের বাড়ি আসবেন। সেখানেই নাম রাখা হবে সদ্য জন্ম নেয়া তার কন্যা সন্তানের।

সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আটকে পড়ার প্রাায় ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তুপের নিচ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল পোশাক শ্রমিক রেশমা আক্তারকে। টানা ১৭ দিন অন্ধকারের ভেতর খাবার ও পানি ছাড়াই বেঁচে থাকার পর সুস্থভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে রেশমার বেরিয়ে আসার ঘটনা পৃথিবীর বুকে জন্ম দিয়েছিল আরেকটি অলৌকিক ঘটনার। দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিলো এনিয়ে। রেশমাকে নিয়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে“ রানা প্লাজা”।

এই ঘটনা শুধু যে দেশের মানুষকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, চমকে উঠেছিল গোটা বিশ্ব। কারণ যে দুর্ঘটনায় এক হাজার ১’শ ৩৮ জন নিহত এবং দুই হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন, সেই দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর পর্যন্ত খাবার ও পানি ছাড়া অন্ধকারের মধ্যে থেকে তারপর ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে বেঁচে ফেরাটা সম্ভব নয় কিছুতেই, অন্তত আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তো তাই বলে। তাই সেদিন রেশমা পেয়েছিলেন ‘অলৌকিক কন্যা’র আখ্যা।

আর সেই ‘অলৌকিক’ ঘটনার পর পালটে গেছে রেশমার জীবনও। এক দরিদ্র পোশাক শ্রমিক জীবন থেকে রেশমা উঠে এসেছেন স্বচ্ছল মধ্যবিত্তদের কাতারে। সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর একজন জীর্ন, বিধ্বস্ত পোশাক শ্রমিক থেকে রেশমা জাতীয় নায়কের পদে আসীন হয়েছেন, উঠে এসেছেন সংবাদপত্রের প্রথম পাতার শিরোনামে।

তবে ধ্বংসস্তুপ থেকে বেঁচে ফেরা বাকি হাজারো শ্রমিকের মতোই সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্মৃতি আজো রেশমাকেও কাঁপিয়ে তোলে, নিদ্রাহীনতা আর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ব্যথার যন্ত্রণায় তিনিও এখনো ভুগছেন।

কিন্তু তাও তার জীবনেও এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন, আর তা অবশ্যই ইতিবাচক। রাজধানীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে নিজের নতুন কাজও দারুণ উপভোগ করছেন তিনি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ‘অলৌকিক কন্যা’ এই কাজটি পেয়ে এখন আর সেই হাড়ভাঙা খাটুনির জীবনে নেই, বরং বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর জীবনযাপন করছেন।

আর কখনো পোশাক কারখানায় ফিরে যাবেন না উল্লেখ করে রেশমা বলেন, “আমার এখনকার কাজটা আমার অনেক ভালো লাগে। গার্মেন্টস কারখানায় যে কাজ করতাম আমি, তার ঠিক উল্টো কাজ করি এখন। আমার এখনকার কাজ অনেক আরামের আর সম্মানের।”

সেই দুর্ঘটনাস্থল থেকে কয়েক মিটার দূরেই অবস্থিত নিজের বোন আসমার বাসায় বসে রেশমা জানান, দুর্ঘটনাটি ঘটার মাত্র ২২ দিন আগেই রানা প্লজায় অবস্থিত পাঁচটি পোশাক কারখানার একটি কাজে ঢুকেছিলেন তিনি। দৈনিক ১০ ঘণ্টা কাজের বিপরীতে তখন তার মূল বেতন ছিল মাসিক চার হাজার সাতশ’ টাকা।

দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান ও পুনর্বাসনের জন্য তহবিল থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ নেননি রেশমা।তিনি বলেন, “শুধু প্রধানমন্ত্রী এবং কিছু বেসরকারি উৎস থেকে কিছু টাকা পেয়েছি আমি।”

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তারপর থেকে অনেকটাই ধার্মিক জীবনযাপন করছেন রেশমা। প্রত্যাহিক জীবনে নামাজ পড়ার সময় পোশাক খাতে কর্মরত মানুষ এবং তার নিহত সহকর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রার্থনাও করেন জানিয়ে রেশমা বলেন, “আমি দোয়া করি যেন আমাদের পোশাক কারখানাগুলো নিরাপদ হয় এবং আর কাউকে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে না হয়।

এদিকে ইট ভাঙছেন রেশমা’র মা জোবেদা খাতুন। ভাটা থেকে টুকরো ইট কিনে এনে তা ভেঙ্গে খোয়া বানিয়ে বিক্রি করেন তিনি।রেশমার গ্রামের বাড়ী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কোশিগাড়ীতে এখন ব্যস্ত রেশমার মা। ইতোমধ্যে পাল্টে গেছে,তাদের বাড়ি’র চিত্র। তিনটি পাকা ঘর তুলেছেন। আরো দু’টি পাকা ঘর তৈরির প্রস্তুতি চলছে।

রেশমা ঢাকায় যাওয়ার সময় ৬ মাস আগে ৩ হাজার টাকা দিয়ে যান মায়ের কাছে।

এছাড়া প্রতিমােেস ২ টাকা বিকাশের মাধ্যমে মায়ের কাছে পাঠায় রেশমা।

সরকারিভাবে প্রাাপ্ত ৫০ হাজার, রানা প্লাজার ৫০ হাজার এবং বাড়ির জমি সংক্রান্ত বিরোধের সমঝোতায় এক ব্যক্তির কাছে প্রাপ্ত ৫০ হাজার এই মোট দেড় লাখ টাকায় ৩টি পাকা ঘর তুলেছেন রেশমার মা। আরো ২টি ঘর তোলার প্রস্তুতি চলছে।

এদিকে রেশমার বাড়ির সামনের মহাসড়কের ধারে স্থান পেয়েছে মৃতুঞ্জয়ী রেশমার ছবি সম্মিলিত বিশাল সাইন বোর্ড।

ঘোড়াঘাট উপজেলার ৩ নং সিংড়া ইউনিয়নের কোশিগাড়ী গ্রামের কৃষক মৃত আনসার আলী ও গৃহিনী জোবেদা খাতুনের ২ ছেলে ৩ মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট রেশমা (২০)। বিয়ের পর স্বামী আব্দুর রাজ্জাক, মা জোবেদা, ভাই জয়েদুল, সাদেক ও মোঝো বোন আসমাসহ ৪ বছর ধরে রেশমা অবস্থান করেছে ঢাকায়। এখন রেশমার মা গ্রামের বাড়িতেই আছেন। ছোট ভাই সাদেক ঢাকায় এক স্যুয়েটার ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করেন। বড় ভাই জাহিদুল ঘোড়াঘাটে করেন ভাংড়ির ব্যবসা। বড় বোন আসমা ঢাকায় থাকেন। কাজ করেন এক গার্মেন্স ফ্যাক্টরীতে। তার স্বামী রিক্সা চালান ঢাকায়। বোন ফাতেমার অবস্থান ঘোড়াঘাটেই। তার স্বামী কৃষি শ্রমিক। রেশমার সৎ পিতা আরজন আলী বাবু খাবার হোটেল শ্রমিকের কাজ করেন।

রেশমার মা জোবেদা তার সম্পর্কিত এক নাতি আরজন আলী বাবু বিয়ে করেন। রেশমা স্বামীর সাথে পৃথক হওয়ার পর ৪ মাস আগ থেকে সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টেসে কাজ শুরু করে।

২০১৩ সালের এপ্রিলে সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন রেশমা। তাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল তার পরিবারের লোকজন। পরে প্রায় ১৭ দিন পর রেশমাকে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করা হয়।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম আকাশ বলেন, “রেশমা সারা বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু রেশমার জন্মস্থান দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে এখনো তেমন কোনো স্মৃতি স্থাপনা নির্মাণ হয়নি। যা দেখে আমরা গর্ব করবো। রেশমার উন্নয়ন হলেও তার পরিবার এখনো বেহাল দশায় জীবনযাপন করছে।”তিনি আরো বলেন, “আমরা চাই রেশমার পরিবারেরও উন্নয়ন হোক। রেশমার বড় ভাই জাহিদুল এখন ফেরি করে বারো ভাজা বিক্রি করছে কষনও ভাংড়ির ব্যবসা করছে। ছোট ভাই সাদেক ঢাকায় স্যুয়েটার ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করেন ।রেশমার পালিত বাবা আরজন আলী খাবার হোটেলে শ্রমিকের কাজ করছে। তাদের অবস্থার উন্নতি হলে আমরা স্বার্থক হতাম।”

এদিকে রেশমার পালিত বাবা আরজন আলী বাবু জানায়, তাদের বাড়ির সামনে এক ব্যক্তি একটি ক্লিনিক তৈরি করছে। ক্লিনিকের প্রাচীর তাদের জায়গায় ঢুকে যাওয়ায় স্থানীয় সমঝোতা বৈঠকে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে তাদের। ওই টাকা দিয়েই তারা আরো পাকা ঘর তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে।