মেইন ম্যেনু

রাষ্ট্র লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে এসব প্রসিকিউটর রেখেছে কেন?

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত মীর কাসেম আলীর শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘আমরা মর্মাহত। আপনাদের এসব মামলা পরিচালনা দেখে আমাদের খারাপ লাগে। আমাদের কষ্ট হয়।’

আজ মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত শুনানি হয়।

বেঞ্চের অপর চার সদস্য হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান। শুনানি শেষে আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি করা হয়।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রাষ্ট্র লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রসিকিউশন টিম নিয়োগ করেছে। কিন্তু তাঁরা মামলা পরিচালনায় দক্ষতা দেখাতে পারেননি। বরং সাক্ষী হাজির করার পর তাঁরা শুধু টেলিভিশনের সামনে চলে আসেন। প্রসিকিউশন বসে বসে এসব নিয়ে শুধু রাজনীতি খেলছেন?’

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, প্রসিকিউশন টিম এ চার্জের (অভিযোগ) বিষয়ে হয়তো ভালোভাবে কাজ করতে পারেনি। এ ছাড়া মীর কাসেম আলী তো লন্ডন থেকেও লবিস্ট নিয়োগ করেছেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘তাহলে রাষ্ট্র লাখ লাখ টাকা খরচ করে এসব প্রসিকিউশন রেখেছে কেন? এদের সরিয়ে দেন।’

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, সেটা দেখা হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মীর কাসেম আলীর অভিযোগের (৯ নম্বর) বিষয়ে আপনাদের দেওয়া পেপার কাটিংয়ে দেখা যায় এ চার্জের ঘটনার সময় মীর কাসেম আলী ঢাকায় ছিলেন। তিনি ঢাকায় বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়েছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে নির্যাতন করেছেন। ২৩ নভেম্বর ঢাকা থেকে গিয়ে তিনি নির্যাতনে অংশ নেন। এ ছাড়া বিবৃতি দিয়ে ও সংবাদ প্রকাশ করা যায়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ওই সময় তো (১৯৭১ সালে) মিডিয়ার অবস্থা এত উন্নত ছিল না। এখন যেভাবে মুহূর্তে সংবাদ প্রকাশ করা যায়, সে সময় চাইলেও সংবাদ সম্মেলন করা যেত না। মীর কাসেম আলী ওই সময় ঢাকায় ছিলেন, বক্তব্য দিলেন ওসব তো আপনাদের দেওয়া পেপারে রয়েছে।’

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিবৃতি পাঠিয়েও সংবাদ প্রকাশ করা যায়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশে তখন মুক্তিযোদ্ধারা ঝেঁকে বসেছে। এ ছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো ছিল না। এত অল্প সময়ে যাওয়া কি সম্ভব?

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে বলেন, যাওয়া অসম্ভব নয়। মীর কাসেম আলী ডালিম হোটেলে গিয়ে নির্যাতন করেছেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমরাও সিলেট থেকে ট্রেনে ঢাকায় আসতাম। কিন্তু তখন যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো ছিল না। সহজে গাড়ি-ট্রেন চলত না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো ছিল না, কিন্তু মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামে চলে যান।

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল প্রসিকিউশনের নথি পড়া শুরু করেন। নথিতে তিনি বলেন, বদর দিবস উপলক্ষে ১৯৭১ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে বক্তব্য দেন মীর কাসেম আলী। পরের দিন ৮ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তানসহ তৎকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় সে খবর প্রকাশিত হয়। খবরে মীর কাসেম আলীর নাম ও বক্তব্য ছাপা হয়।

১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘বদর দিবসের সমাবেশে ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতির ভাষণ।’ প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘আল-বদর দিবস উপলক্ষে গতকাল বিকেলে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ইসলামী ছাত্রসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে পাকিস্তানের সংহতি ও অখণ্ডতা রক্ষায় জনগণের দৃঢ সংকল্পের পুনরুক্তি করা হয়।’

সমাবেশে যাঁরা বক্তব্য দেন তাঁদের নামের তালিকায় মীর কাসেম আলীর নাম রয়েছে ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। একই তারিখে দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকায় ‘বদর দিবস পালিত’ শিরোনামে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সমাবেশের খবর ছাপা হয় এবং তাতেও মীর কাসেম আলীর নাম ও বক্তব্য ছাপা রয়েছে।

১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর ছাত্রসংঘের সভাপতি আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও সেক্রেটারি জেনারেল মীর কাসেম আলীর যুক্ত বিবৃতি প্রকাশিত হয় জুমাআতুল বিদা দিবস পালনের আহ্বান জানিয়ে। ঢাকা থেকে এ বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত আরেকটি ছাত্রসমাবেশে বক্তব্য দেন মীর কাসেম আলী। ১১ ডিসেম্বর দৈনিক আজাদের শিরোনাম হলো ‘হিন্দুস্তানি হামলার বিরুদ্ধে গণসমাবেশ।’ এ খবরেও মীর কাসেম আলীর বক্তব্য ছাপা হয়।

১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর দৈনিক আজাদসহ আরো কয়েকটি পত্রিকায় ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত বিবৃতির শিরোনাম ছিল ‘ছাত্র সমাজের প্রতি ডাক-হিন্দুস্তানি হামলার বিরুদ্ধে গণসমাবেশ’। খবরে বিবৃতি প্রদানকারী হিসেবে ছাত্রসংঘের সভাপতি আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক মীর কাসেম আলীর নাম রয়েছে।

প্রসিকিউশনের পক্ষে এসব নথির বিষয়ে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান এনটিভি অনলাইনকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে সরকার পক্ষে (প্রসিকিউশন) উপস্থাপিত ডকুমেন্টে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধকালে মীর কাসেম আলী চট্টগ্রামে ছিলেন না। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। প্রসিকিউশনের দাখিল করা ১৯৭১ সালের দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনগুলোতে মীর কাসেম আলীর বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি এবং নাম উল্লেখ রয়েছে। কাজেই চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলকেন্দ্রিক অপরহণ, নির্যাতন এবং হত্যার যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার সাথে মীর কাসেম আলীর কোনো রকম সম্পর্ক নেই। আপিলের শুনানিতে মীর কাসেম আলীর আইনজীবী এস এম শাহজাহান যুক্তি উপস্থাপনকালে এ কথা বলেছেন।

মামলার শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মীর কাসেম আলীর মামলা নিয়ে আদালত প্রসিকিউশন টিমের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার ক্ষেত্রেও আমাকে আদালতে এভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।’

এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে শুনানি হয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আসা এটি হলো সপ্তম মামলা।

২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় মীর কাসেম আলীর পক্ষে আপিল করেন জয়নুল আবেদীন তুহিন। মীর কাসেমের পক্ষে ১৮১টি প্রেক্ষাপটে মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস চেয়ে এ আপিল করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনা মোট ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়। এগুলো হলো ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ। এর মধ্যে দুটিতে (১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে ) মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চারটি অভিযোগে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

১১ নম্বর অভিযোগে রয়েছে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমসহ ছয়জনকে আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ। এ অভিযোগে বিচারকরা সর্বসম্মতিক্রমে মীর কাসেমকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। ১২ নম্বর অভিযোগে রয়েছে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ। এ অভিযোগে বিচারকদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেওয়া হয়। ১১ ও ১২ নম্বর ছাড়া বাকি ১২টি অভিযোগই অপহরণের পর আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ মীর কাসেমের বিরুদ্ধে।

প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাঁকে সাত বছর করে মোট ৪২ বছর কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ নম্বর অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই আটটি অভিযোগে তাঁকে সর্বমোট ৭২ বছর কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস (অব্যাহতি) দেওয়া হয়।