মেইন ম্যেনু

রায়মঙ্গলে জলদস্যুদের সঙ্গে!

রায়মঙ্গল নদীর উপরে সকাল থেকেই অন্তঃস্বত্ত্বা মেঘেরা ঘোরাঘুরি করছে। মেঘের পেট ফেটে বর্ষা সন্তান রায়মঙ্গলের বুকে নেমে আসবে সেই প্রতীক্ষায় নদী আর মেঘের মাঝে অপেক্ষায় থাকা দোপেয়ে মানবের দল। নৌকোয় থাকা মানব সন্তানেরা যাদের আমরা এখানে জেলে হিসেবে দেখছি, তারা মাছ ধরার জাল গুটাতে ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার ফাঁকেই তারা এদিক ওদিক তাকাতে ভুল করছে না। যেকোনো মুহূর্তে হয়তো রায়মঙ্গলের কিনার থেকে জেলেদের উপর ঝাপিয়ে পরবে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবু এরই মাঝে কয়লা রংয়ের নৌকাগুলো নিয়ে একেবেঁকে এগিয়ে চলে তারা।

ভারত এবং বাংলাদেশের সুন্দরবন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কথা বলছি আমরা। পুরো অঞ্চলটিকে যদি একটি নামে ডাকতে হয় তাহলে বলতে হবে, এই জায়গাটির নাম হেমনগড়। বাংলাদেশের এই প্রান্ত হলো বাংলাদেশি জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। সম্প্রতি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরা এই অঞ্চলটি এবং এখানে বসবাসরত মানুষের উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনটিরই বিশেষ বিশেষ অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

নদী তীরে দাড়িয়ে থাকা সতর্ক স্ত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের স্বামীদের বিদায় দিচ্ছেন সাগরের ভয়াল অভিযানের জন্য। একেবারে শেষে দাড়িয়ে থাকা সীতা মন্ডলের চোখের কালো মনি যেন দুলে উঠছিল। হঠাৎ করেই তিনি নদীতে স্বামীর উদ্দেশ্যে ঝাপিয়ে পরলেন এবং স্বামী স্ত্রীকে বলতে লাগলেন, ‘এবারই শেষবারের মতো আমি সাগরে যাচ্ছি। এই কাজ আমি চিরদিনের মতো ছেড়ে দেবো এবং তামিলনাড়ুতে কাজের জন্য চলে যাবো।’ কথাগুলো চল্লিশ বছর বয়সী এক জেলে তার স্ত্রীকে বলছিলেন।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জলদস্যুদের হাতে অপহরণের শিকার হয় সীতা মন্ডলের স্বামী। সুন্দরবনের খালে যখন তারা মাছ ধরছিল তখনই মূলত জলদস্যুরা তাদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার কয়েকদিন পরেই জানা যায়, কেন্দু দ্বীপের কাছাকাছি জলদস্যুরা গুলি করে কয়েকজনকে হত্যা করেছে। অন্যান্য সজ্জন জেলের মতো সীতা মন্ডলের স্বামীর মোটরচালিত মাছধরার নৌকা ছিল না, যে কারণে ১৪জনের জলদস্যু দলটি যখন অস্ত্র উচিয়ে তাদের দিকে আগাচ্ছিল তখন তাদের আর কিছুই করার ছিল না।

স্মৃতি হাতড়ে মন্ডল বলেন, ‘যখন আমরা ফিরে আসছিলাম তখনই আমাদের বন্দুকের মুখে অপহরণ করে জলদস্যুরা। এরপর বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশের গভীরে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। আমাকেসহ মোট তিনজনকে তারা পনবন্দী হিসেবে ধরে রাখে এবং বাকী তিনজনকে ছেড়ে দেয় আমাদের খবর জানানোর জন্য। আমাদের প্রত্যেক পরিবারের কাছে এক লাখ রুপি করে চাওয়া হয়েছিল।’

2015_09_16_16_54_58_9Hj7NyF2ezeMKTdCdyy3UwZDCjKDIQ_original

একটা সময় মন্ডলের পরিবার ও অন্যান্যরা মিলে মাথাপিছু পঞ্চাশ হাজার রুপি করে মোট দেড়লাখ রুপি জোগার করে। পুরো অর্থ ভারত থেকে স্থানান্তরিত করা হয়। সীমান্তে অর্থ পাচারের অবৈধ উপায় হলো ‘হাওয়ালা’। এই পন্থাতেই দেড়লাখ রুপি এই জলদস্যুদের হাতে আসলে তবেই তারা অপহৃত জেলেদের মুক্তি দেয়। এভাবেই অনেক নিরীহ জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপন নেয়া হয়। স্থানীয় প্রশাসন এবিষয়ে কিছু প্রকল্প নিয়েও কোনো সুবিধা করতে পারছে না।

স্বামীর মুক্তিপনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন সীতা মন্ডল। ‘আমার যাবতীয় গহনা সব বিক্রি করে দিয়েছি। এমনকি রুপোর তৈরি সর্বশেষ গহনাটিও। তারপরেও টাকা হচ্ছিল না। তাই শেষমেষ এক প্রতিবেশির কাছ থেকে চড়াসুদে ঋণ নিয়েছি। এখন আমরা জানি না, এই ঋণ কিভাবে আমরা পরিশোধ করবো। দুবছর ধরে যা উপার্জন করলাম তা সবই একদিনের মধ্যে মুক্তিপন দিতে শেষ হয়ে গেল। আমাদের অবস্থা এখন এমন যে, সমুদ্রে না গেলে পেটে ভাত জুটছে না। বাঘ, কুমির অথবা জলদস্যুদের চেয়েও বড় হিংস্র এই ক্ষুধা।’

৪৮ বছর বয়সী নগেন মন্ডলও তিনবার জলদস্যুদের খপ্পরে পরেছিলেন। তার ভাষ্যমতে, ‘আপনি বণ্যপ্রাণীর সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন কিন্তু একমাত্র বোকারাই এই সশস্ত্র লুটেরাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা ভাবে। একটা ছোটো গুলি আপনার মাথা ভেদ করে দিতে পারে সহজেই।’