মেইন ম্যেনু

রূপকথার রাজপুত্তুর

এক দেশে ছিল এক রাজপুত্তুর…। রূপকথার এই রাজপুত্র আদৌ আছে বা ছিল কি না সে প্রশ্ন উঠেনি কখনো। উঠবেই বা কেন, সব অসাধ্য সাধন করে মানুষের মনে স্বপ্ন জাগাতে পারে তো স্বপ্নের সেই নায়কই। এই রূপকথার চরিত্র হঠাৎ যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে হঠাৎ আবির্ভাব হয়েছে চমকে দেওয়া এক তারকার। কেবল টাইগারভক্তরাই নয়, তার দ্যুতিতে মুগ্ধ গোটা ক্রিকেট-বিশ্ব। বিশ্ব ক্রিকেটে অভিষেক কেবল এক বছর হলো। এরই মধ্যে ২০ বছরের এই তরুণের তুলনা চলছে কিংবদন্তী বোলারদের সঙ্গে। তিনি মুস্তাফিজুর রহমান, আমাদের আদরের মুস্তাফিজ। লিটল মাস্টার শচিন টেন্ডুলকার, ক্রিকেটের বরপুত্র ব্রায়ান লারার পর ক্রিকেট দুনিয়ায় আরও এক বিস্ময় বালকের আবির্ভাব হয়েছে মানছেন ক্রিকেট বোদ্ধারা। এখন কেবল ব্যাটসম্যানরাই ছড়ি ঘোরাবেন কেন? বোলিং বৈচিত্র্য দেখতেও যে দর্শকরা মুখিয়ে থাকে, তা তো দেখিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশের মুস্তাফিজ।

১৯৭১ সালরে পর থেকে তার অপেক্ষায় ছিল সেই দেশটা। তিনি আসবেন বলে কথা দিয়েছিলেন কি না তা কেউ শোনেনি। তবু অপেক্ষা ছিল নিরন্তর। মাঠের দূর্বাঘাস। সকালের শিশির। পেছন পকেটে খাতা রাখা কলেজের ছেলে। লাইব্রেরিতে সন্ধ্যা পার করা পড়–য়ার চোখ। সবাই তাকে খুঁজত। এই অপেক্ষা শেষ হয় ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল। তিনি আসলেন। দেখলেন। জয় করলেন। বাঁ-হাতে ছিল জাদুরকাঠি। তা দিয়ে জাদু দেখিয়ে চলেছেন দেশে-বিদেশে। তাকে পেয়ে ধন্য সেই দেশ। বাংলাদেশও। এদেশের ক্রিকেটে আলোর দেখা পেতে থাকে ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি থেকে। কেনিয়ার বিপক্ষে। হাসিবুল হোসেন শান্ত সেই যে দৌড়ে এক জয় আনলেন, তার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরিসরে ধীরে ধীরে নিয়মিত হতে থাকে ঢাকার ক্রিকেট। তারপর আশরাফুল এসেছেন চাঁদনি পসরে। হারিয়ে গেছেন অমাবস্যায়।

একে একে মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিমের জন্ম হয়েছে ঠিকই শুধু ওই রাজপুত্র আসছিলেন না। মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়াইড দিয়ে শুরু করেছিলেন। পরে আফ্রিদিকে আউট করে নজরে আসেন। এরপর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেই বোঝা যায় আসলেই এই সেই রাজপুত্র। মুস্তাফিজুর রহমান! কাটার মাস্টার। বিস্ময় বালক। জাদুকর। ফিজ। সায়ানাইড। টর্নেডো। শত শত নাম তার! বিশ্বক্রিকেট আজ অবধি অনেক বাঁ-হাতি পেসার দেখেছে। তাদের মধ্যে ওয়াসিম আকরামকেই সেরা পাওয়া বলে মনে করা হয়। কিন্তু মুস্তাফিজ দিনকে দিন যে কীর্তি গড়ছেন, তাতে হিসাবের খাতা নতুন করে খুলতে হচ্ছে। তিনি সর্বকালের সেরা কি না, তা নিয়ে হয়ত এখনই আলোচনা করা যাবে না। তবে কেউ যদি আলোচনাটা শুরু করে দেন, তাকে দোষ দেওয়াও যাবে না! রথী-মহারথীরা তার প্রশংসা করছে শুরু থেকেই। এরপর আইপিএলে সেই প্রশংসা সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। মুস্তাফিজে বুঁদ গোটা বিশ্ব।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যে ছেলে সবেমাত্র বছর পার করেছে, তাকে নিয়ে এত মাতামাতি কেন? উত্তর দিবে এই পরিসংখ্যান। ওয়ানডে সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার যৌথ বিশ্ব রেকর্ডের মালিক তিনি। ৩ ম্যাচের সিরিজে অভিষেকে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড তার। ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার একক বিশ্ব রেকর্ড। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলিংয়ের রেকর্ড। মাশরাফি-রুবেলের পর তৃতীয় বাংলাদেশি হিসেবে ইনিংসে ৬ উইকেট। প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট, প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইডেন গার্ডেনে ৫ উইকেট। সবচেয়ে কম বয়সী বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ৫ উইকেট। বিশ্বের একমাত্র বোলার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে এক ইনিংসে ৪ জন ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করার গৌরব।

বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকেই টেস্ট ও ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আইসিসির বর্ষসেরা একাদশে ঠাঁই। অভিষেক বছরে এমন কীর্তি এই প্রথম। জিম্বাবুয়ের ব্রায়ান ভিটোরির পর ওয়ানডে ইতিহাসের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই ইনিংসে ৫ উইকেট। প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট। ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ওয়ানডেতে এটাই সর্বোচ্চ, ভিটোরির ছিল ১০ উইকেট। এরপর আইপিএলে আরেক ইতিহাস। লিগটিতে এখন পর্যন্ত কৃপণ বোলিং করার রেকর্ড তার। পাঞ্জাবের বিপক্ষে ৪ ওভার হাত ঘুরিয়ে মাত্র ৯ রান দিয়ে দুই উইকেট নেন। এর আগে রজত ভাটিয়া ১০ রান দিয়ে নিয়েছিলেন এক উইকেট। রেকর্ড তো থাকলই। বোলিংয়ের ধরনও তাকে আলাদা করছে সবার থেকে। ভিলিয়ার্স, কোহলিরা যেখানে একই ম্যাচে অন্যদের তুলোধোনা করছেন, সেখানে এই মুস্তাফিজকে সামলাতে হিমশিম খান। ভিলিয়ার্স তো ওই ম্যাচে তার দুই বল খেলে সাজঘরের পথ ধরেন।

এর আগে কলকাতা নাইট রাইডার্সের রাসেলকে দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে আরেক বিস্ময়ের জন্ম দেন। এমন নিখুঁত ইয়ার্কার সবার হাত থেকে বের হয় না। আর কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে ইতিহাস গড়া সেই চার ওভারের ভাঁজে ভাঁজে ছিল শিহরণ জাগানো বৈচিত্র্য।

প্রথম ওভারের প্রথম তিন বলের মধ্যে দুটি কাটার। পঞ্চমটি পুরোপুরি গুডলেংথ। ব্যাটে পেয়েছিলেন মান্নান ভোরা। গতি বুঝতে পারেননি। শেষ মুহূর্তে বল নিচু হয়। কয়েক সেকেন্ড আগে ভোরা বডি ওপেন করেন। মিডঅফে ঠেলার পর তার কোমর নিচু করা দেখেই বোঝা যায় গতির পরিবর্তনে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। দুই প্রান্তের দুই ব্যাটসম্যানের শরীরী ভাষা দেখে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল সিঙ্গেল বের করতে মরিয়া ছিলেন তারা। এটা পূর্বপরিকল্পিত। আগে থেকে ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গিয়েই রানআউট হন ওই মান্নান ভোরা। প্রথম বলে তিনি রুম করে কভার দিয়ে মারতে চেয়েছিলেন। অল্প একটু ডাউন দ্য উইকেটে আসতে চেয়েছিলেন। এসেছিলেনও। কিন্তু বল দেখার সময় পাননি।

পরের চারটিতে বডি ওপেন তো করতেই পারেননি, ফুটওয়ার্কও তালগোল পাকানো। শুধু দ্বিতীয় বলটিতে অস্বস্তি ছিল না। পা না নিয়ে ড্রাইভ করেছিলেন। বল সুইং করে বেরিয়ে যায়। এই ওভারের শেষ বলটি মোকাবেলা করেন নতুন ব্যাটসম্যান মিলার। অফস্ট্যাম্পের বেশ বাইরে ছিল। প্রথম পাঁচটির তুলনায় এটি একটু সাদামাটা। তবে চালাকি। কেন না অফস্ট্যাম্পের বাইরের বল টি-টোয়েন্টিতে যে কেউ খেলতে চাইবে। মুস্তাফিজ চেয়েছিলেন মিলারও খেলুক। নতুন ব্যাটসম্যান এসেই বাইরের বলে চালালে ‘এজ’ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মিলার অতি সতর্কতা অবলম্বন করলেন। এই ধরনের বলে সাধারণত স্কয়ার কাট অথবা স্কয়ার ড্রাইভ করা যায়। কিন্তু মুস্তাফিজের ওই বলটি এমন ছিল যে দুটির যেকোনো একটি করতে গেলে ঝুঁকি থেকে যায়। কেননা বলে গতির পরিবর্তন ছিল। যেভাবে বল বাউন্স করে তাতে নতুন ব্যাটসম্যানের পক্ষে খেলতে যাওয়া মানে মরণ ডেকে আনা।

দ্বিতীয় ওভার (ম্যাচের ১৪তম ওভার) ছিল আরো ভয়ংকর। যেন ১৩৫ কিলোমিটার বেগে স্পিন করেন বিস্ময় বালক। প্রথম তিনটি বল মোকাবেলা করেন বাঁ-হাতি মার্শ। নিখুঁত ইনসুইঙ্গার। গুডলেংথ। তৃতীয়টিতে মার্শকে ফিরতেই হয়। এটি ছিল অফকাটার। বল দেখেছিলেন। ব্যাটও নিয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে সুইং তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। ব্যাট ব্যাটের জায়গায় ছিল। বল ঢুকেছিল ভেতরে। ১৬তম ওভারেও (মুস্তাফিজের তৃতীয়) প্রথম চারটি বল খেলেন নায়েক। তার চেষ্টা দেখে মনে হলো, তিনি নতুন কিছু করতে চাইছিলেন। অর্থাৎ মুস্তাফিজকে খেলার পথ আবিষ্কার করতে চাচ্ছিলেন। বারবার এক স্টেপ এগিয়ে বলে যাচ্ছিলেন তিনি। তাতে কাজও হয়। অন্তত টিকে থাকতে পারেন। ম্যাচের শেষ ওভারেও (ফিজের চতুর্থ ওভার) নায়েকের এই চেষ্টা অব্যাহত ছিল।

প্রথম বলে অফস্ট্যাম্পের একটু বাইরে গিয়ে মিডউইকেট দিয়ে উড়িয়ে মারতে যান। কিন্তু টাইমিং ছিল দুর্বল। শট খেলার সময় তার শরীরী ভাষা দেখে বোঝা যায় মনোযোগের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু বলে যেমন গতির পরিবর্তন ছিল, তাতে ভালো টাইমিং পাওয়া সম্ভব ছিল না। ছয় মারতে গিয়ে সাজঘরের পথ ধরেন। পরের বলগুলো মোকাবেলা করেন অক্ষর প্যাটেল আর ঋষি ধাওয়ান। কোনো মতে সামলাতে সক্ষম হন। তাদের মূলত কিছু করার ছিল না। কি-ইবা করতে পারতেন! কেবল কোনো একটি ম্যাচের গল্প এমন নয়। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই অসাধারণ বৈচিত্র্যময় বোলিং দিয়ে গোটা বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছেন মুস্তাফিজ। সেটা এতটাই যে, আইসিসির বৈঠকেও তাকে নিয়ে উঠে অনির্ধারিত আলোচনা।

রাজপুত্রের আবির্ভাবের পেছনের গল্প

২০১২ সালের কথা। এক বড় ভাইয়ের মুখে মুস্তাফিজ শুনলেন ঢাকায় পেসারদের ট্রায়াল হবে। তখন তিনি সাতক্ষীরা অঞ্চলের দাপুটে বোলার। খ্যাপ খেলায় সবার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয় তাকে। বলে যেমন গতি, তেমন নিয়ন্ত্রণ। ওই সময় ব্যাটিংটাও ভালো করতেন। মুস্তাফিজ আসি আসি করে ঢাকায় এসেই পড়লেন। পরিচিত একজনের বাসায় থেকে সকালে ছুটলেন মিরপুর স্টেডিয়ামে। প্রথম দেখায় যে কেউ মনে করবেন, এ আর কী বল করবে! যেমন চিকন, তেমন হালকা। ট্রায়ালে বল করলেন মুস্তাফিজ। গতি দেখেই ভড়কে গেলেন নির্বাচকরা। পর পর কয়েকটি বল করতে বললেন। তারপর সরাসরি ক্যাম্পে! ডাক পেলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ছোটদের বিশ্বকাপে নিজের জাত চেনালেন। বাংলাদেশের পক্ষে নিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ উইকেট।

এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে মাঠে নামেন। সেখানেও প্রতিভার ঝলক দেখান। প্রথম শ্রেণি ক্রিকেটে অভিষেক ২০১৪ সালের এপ্রিলে। তারপর অভিষেক হয় ঘরোয়া একদিনের ম্যাচে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খুলনার হয়ে মাত্র আট ম্যাচ খেলেই নেন ২৩ উইকেট। গড় ১৮.৯১, ইকোনমিক রেট ২.৬৮। আর লিস্ট এ-তে আবাহনীর পক্ষে ৫ ম্যাচে উইকেট ১২টি। গড় মাত্র ১১.৭৫, ইকোনমিক রেট ৩.৪৫। ছোট এই ক্যারিয়ার নিয়ে মাশরাফি, হাবিবুল বাশার, হিথ স্ট্রিকের সমর্থন পেয়ে লাল-সবুজ জার্সিতে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নেমে পড়েন মুস্তাফিজ। হাথুরেসিংহে তার সম্পর্কে অতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। হিথ স্ট্রিকই তাকে বলেন, ছেলেটার বয়স কম হলেও খেলার যোগ্যতা রাখে।

বোলিং কোচের কথায় সায় দেন মূল কোচও। ওই ম্যাচে চার ওভার বল করে ‘পৌনে তিন ওভার’ দেন ডট বল-১৬টি! নেন দুই উইকেট। স্লগ ওভারে সেদিনই তার ক্ষমতা পরখ করে ক্রিকেট বিশ^। হাফিজকে হিমশিম খাইয়ে সাজঘরে ফেরান। ‘বুড়ো’ আফ্রিদি তার বলে আউট হয়ে ‘গো গো’ করতে করতে মাঠ ছাড়েন! এ কিন্তু সেই আফ্রিদি, যিনি ১৯ বছর ধরে ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করছেন। এই কিন্তু সেই আফ্রিদি, যিনি ১৭ বছর ধরে ওয়ানডে ক্রিকেটের দ্রুততম শতকের মালিক ছিলেন! মাথা ঝাঁকাতে-ঝাঁকাতে আফ্রিদি সেই যে মাঠ ছাড়লেন, তারপর থেকেই ফিসফাস, এক দেশে ছিল এক রাজপুত্তুর…!

এই বয়সেই কিংবদন্তীদের সঙ্গে তুলনা

একটু আগেভাগে প্রশ্নটা উঠল কি না তা কে জানে। তবে যেভাবে বাঁ-হাতে তিনি বিস্ময় ছড়িয়ে যাচ্ছেন, তাতে এই প্রশ্ন আর চুপ করে থাকতে পারছে না। একটি ম্যাচে বিস্ময় বালকের বোলিং দেখে ধারাভাষ্যকার অ্যালান উইলকিন্স তো মুস্তাফিজকে তুলনা করে বসলেন কিংবদন্তীর অ্যাথলেট সের্গেই বুবকার সঙ্গে। ইউক্রেনের এই অ্যাথলেট তার ক্যারিয়ারে পুরুষদের পোল ভল্টে ৩৫বার বিশ্ব রেকর্ড ভেঙেছিলেন টানা ছয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা বুবকা। এর মধ্যে নিজের রেকর্ডই ভেঙেছিলেন ১৪ বার। অভিষেকের দিন থেকে মুস্তাফিজ যত ম্যাচ খেলছেন, ততই তার প্রেমে পড়ছে ক্রিকেট-বিশ্ব। আইপিএলে সেই প্রেম যেন সর্বজনীন রূপ নিয়েছে! শুরু থেকেই মুড়ি মুড়কির মতো উইকেট পাচ্ছেন মুস্তাফিজ। তবে আসলে নজর কেড়েছেন বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করে ও বিপাকে ফেলে।

প্রতি ম্যাচেই বাংলার মুস্তাফিজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। উইলকিন্সের ভাষায় ‘ম্যাজিকাল বয় ফ্রম বাংলাদেশ’। তার বোলিং বৈচিত্র্যে এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন এই ভুবনবিখ্যাত ধারাভাষ্যকার যে, এক পর্যায়ে তিনি তুলনা করে বসলেন বুবকার সঙ্গে। বললেন, ‘মুস্তাফিজকে যতবার দেখবেন, পরমুহূর্তেই সে আরও দারুণ কিছু নিয়ে আপনার সামনে হাজির হবে। অনেকটা সের্গেই বুবকার মতো, যে নিজের রেকর্ড প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যেত নিজেই।’ গত এশিয়া কাপ থেকেই মুস্তাফিজের গুণমুগ্ধ ম্যাথু হেডেন। কদিন আগেই বলেছিলেন, এবারের আইপিএলে তার মতে সেরা বোলার মুস্তাফিজ। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনারের মতে, ‘সে অসাধারণ এক প্রতিভা। এত বৈচিত্র্য ওর হাতে, ব্যাটসম্যানকে একটুও থিতু হতে দেয় না। ম্যাককালামের মতো ব্যাটসম্যানকে সে স্বস্তি দেয়নি।’

ভারতীয় সাবেক তারকা ভি ভি এস লক্ষণ তো বলেই দিয়েছেন, পৃথিবীর অন্যতম সেরা বোলার মুস্তাফিজ। সাবেক কিউই তারকা পেসার ড্যানি মরিসনও এখন পর্যন্ত মুস্তাফিজকে অন্যতম সেরা মানছেন। আর সেই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছেন লম্বা একটা পথের কথা। বলছেন ‘এখন দেখার বিষয়, এখান থেকে নিজেকে কতটা সামনে এগিয়ে নিতে পারে সে।’ এ তো গেল সাবেকদের কথা। ক্রিকেটের বর্তমান তারকারাও কি কম বিস্মিত? মুস্তাফিজ ভক্তের তালিকায় সবশেষ সংযোজন ডেল স্টেইন, যাকে ম্যাকগ্রা-উত্তর সবচেয়ে ভালো পেসার হিসেবেই ধরা হয়। এই প্রোটিয়া ফাস্ট বলছেন, মুস্তাফিজের সামর্থ্য আর প্রতিভা দেখে তার ওয়াসিম আকরামের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তারকার বোলিং দারুণ উপভোগ করেন স্টেইন।

বলেছেন, ‘মুস্তাফিজ হয়ত আকরামের মতো অত বেশি সুইং করাতে পারে না। কিন্তু তার বোলিং দেখাটাও দারুণ উপভোগ্য।’ মুস্তাফিজের বোলিং বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানের পরীক্ষা নিচ্ছে। বাংলাদেশের এই বাঁ-হাতি বোলারকে দেখে স্টেইন এর কারণটাও ধরতে পেরেছেন, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ডান হাতি ফাস্ট বোলারদের অফ কাটার দিতে দেখেন ব্যাটসম্যানরা। তারা এটাতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাঁ-হাতি মুস্তাফিজ কাটারের সঙ্গে বলের গতিও পরিবর্তন করছেন যা ব্যাটসম্যানরা আগে দেখেননি।’ অজি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার মুস্তাফিজকে খেলা অসম্ভব বলেই মানছেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মুস্তাফিজের একটি বল খেলেছিলেন ওয়ার্নার। আইপিলে একই দলে খেলার সুবাদে নেটে মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই বিস্ফোরক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। তিনি বলেন, ‘নেটে আমি তার দুটি বল খেলেছিলাম। সে একটি বাউন্সার ও একটি স্লোয়ার বল করে। প্রথম বলটি প্রায় আমার মাথায় আঘাত করেছিল আর দ্বিতীয় বলে ব্যাট ছোঁয়াতে পারিনি… আমার মনে হয় ডেলিভারী পরিবর্তন করা তার বৈশিষ্ট্য, যা তাকে খেলা অসম্ভব করে তুলেছে।’

আরেক অজি অলরাউন্ডার মোইজেস হেনরিক্স বলেছেন, ‘মুস্তাফিজকে সামলাতে হলে মনোযোগ আর একাগ্রতা জরুরি। নেটে তাকে খেলে আপনি তার বৈচিত্র্যের সঙ্গে কিছুটা অভ্যস্ত হতে পারেন, তবে এরপরও আপনাকে যেকোনো কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ ভারতীয় পেস বোলার ভুবনেশ্বর কুমার তার অস্ত্রভা-ার আরও সমৃদ্ধ করতে চাইছেন মুস্তাফিজের দীক্ষায়। তার কাছে স্লোয়ার বল করা শেখার চেষ্টা করছেন তিনি। কুমারের ভাষায় ‘কিন্তু সে (মুস্তাফিজ) যেভাবে এটা করে তা কেউ পারে না…ওর বোলিং অ্যাকশন একটু ভিন্ন, স্লোয়ার বল পড়তে পারা খুব কঠিন।’

ক্রিকেট এখন আর শুধুই ব্যাটসম্যানের খেলা নয়

নব্বই দশক থেকেই ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের জয়-জয়কার। দৃষ্টিনন্দন শটে চার বা ছয় মেরে দর্শকদের যতটা আনন্দ দেওয়া যায়, বোলিংয়ের কারুকাজ ততটা টানে না ক্রিকেট অনুরাগীদের। ওয়াসিম আকরাম, গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন আর মুত্তিয়া মুরালিধরন যুগের অবসানের পর ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের আধিপত্য আরও প্রতিষ্ঠিত হয়। অভিনব নানা শট দিয়ে দর্শকদের আরও মাতিয়ে রাখছেন ব্যাটসম্যানরা। বৈচিত্র্যহীন সহজ বোলিং পেয়ে যেভাবে খুশি সেভাবে মেরে খেলছেন ব্যাটসম্যানরা। ওয়ানডে ক্রিকেটে ডবল সেঞ্চুরি মামুলি ব্যাপার হয়ে গেছে। এই সময়ে মুস্তাফিজের আবির্ভাব দর্শকদের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শচিন টেন্ডুলকারের অনুপম ড্রাইভ দেখতে মানুষ যেমন মুখিয়ে থাকত, ঠিক তেমনি এখন কাটার দেখার অপেক্ষায় থাকে ক্রিকেট পিপাসীরা। একটি নিখুঁত কাটার যেমন উদ্বেলিত করে দর্শকদের, তেমনি অনন্য ইয়র্কার, বোলিংয়ে গতি পরিবর্তন, সুইংয়ে ব্যাটসম্যানরা যত বিভ্রান্ত হয়, দর্শকও হয় ততটাই উল্লসিত।

বেড়েছে বাংলার কদর

হঠাৎ বেড়ে গেছে বাংলা ভাষার কদর। অস্ট্রেলিয়ার টম মুডি, ওয়ার্নার, ভারতের লক্ষণসহ অনেকেই এখন বাংলায় কথা বলতে চান। প্রতিদিন শিখছেন তারা এই ভাষা। নতুন ভাষা শেখার এই চেষ্টা কেন? এর কারণও মুস্তাফিজ। তার ভাষায়, ‘বোলিং নো প্রবলেন, বাট স্পিকিং অ্যান্ড ব্যাটিং প্রবলেম।’ মানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলা বা ব্যাটিংয়ে সেভাবে দক্ষতা নেই। তাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে অন্যদেরই কথা বলতে হবে তার ভাষায়। আর এ কারণেই বাংলা ভাষা নিয়ে চর্চা শুরু করেছেন ভি ভি এস লক্ষণ, ডেভিড ওয়ার্নার, টম মুডিরা!বাঙালি তারকা ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলিও এভাবে বাংলা ভাষার মর্যাদা বাড়াতে পারেননি। দেশে-বিদেশে তিনি বাংলার জয়গান গেয়েছেন ঠিক কিন্তু অন্যদের বাংলা শেখাতে পারেননি তিনিও।

রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপনে ক্রিকেট বিস্ময়

ক্রিকেট বিশ্বে চলছে এখন মুস্তাফিজ-বন্দনা। মন্ত্রিসভায়ও আলোচনা হয় তাকে নিয়ে। বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞাপনেও এখন আছে এই তরুণের ছবি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সীমানা প্রাচীরে এখন টানানো হয়েছে মুস্তাফিজের ছবি সম্বলিত পোস্টার। এসব পোস্টারে লেখা আছে, ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের।’ প্রাচীরজুড়ে মুস্তাফিজের ছবি টানানোর উদ্যোগের ব্যাপারে বিসিবির সাবেক সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘এই মুহূর্তে মুস্তাফিজ নিঃসন্দেহে বিশ্বের এক নম্বর বোলার। দুর্দান্ত বোলার হিসেবে সারা বিশ্বে সে সমাদৃত, আমি এজন্য এখানেও তার ছবি লাগিয়েছি। বাইরেও লাগিয়েছি। আরো অনেক জায়গায় লাগাব। মুস্তাফিজ যখন আপনাদের মাধ্যমে ফেসবুকে জানবে তখন সে অনেক খুশি হবে।’

তবে এ নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে সমালোচনাও করেছেন। সমালোচনার কারণ বিজ্ঞাপনে মুস্তাফিজকে ব্যবহারের জন্য নয়। তাদের অভিযোগ, সীমানা প্রাচীরজুড়ে মুস্তাফিজের ছবি শোভা পেলেও বেশিরভাগ ছবিতে মুস্তাফিজের শরীরে আইপিএলের দল সানরাইজ দায়দ্রাবাদের জার্সি। অভিযোগ তো উঠবেই। যে রাজপুত্রের জন্য এত অপেক্ষা, তার শরীরে কী লাল-সবুজ বাদে অন্য কিছু মানায়! সাপ্তাহিক এই সময়ের সৌজন্যে