মেইন ম্যেনু

রেডিও নিয়ে মজার ধাঁধা

শাওন আর রাজু দুই বন্ধু। একেবারে হরিহর আত্মা যাকে বলে। পাশাপাশি বাড়িতে থাকে ওরা। গ্রামের বাড়ি। তাই কখন কোন বাড়িতে কখন কী ঘটছে, কী শুনছে তারা, কী খাচ্ছে সেই বাড়ির মানুষগুলো, কী বলা বলি করছে। সব টের পেয়ে যায় প্রতিবেশিরা।

শাওন আর রাজু দুজনের বাড়িতেই রেডিও আছে। কখনো কখনো একই সাথে একই কেন্দ্রের অনুষ্ঠান চলে দুই রেডিওতে। উচ্চস্বরে। তাই নিয়েই তুমুলে উঠেছে দু’বন্ধুর তর্ক। শুরুটা করেছিল শাওনই, ‘রাজু তোদের রেডিওটা না বড্ড স্লো। অনেক দেরিতে শোনা যায়। যেমন ধর, সেদিন রবীন্দ্র নাথের আমাদের ছোট নদী- কবিতাটা আবৃত্তি করছিল একটা ছেলে। আমাদের রেডিওতে যখন শুনলাম—‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে- লাইনটা, তোদের রেডিওতে তখন শুনতে পেলাম, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে।

রাজুই বা এ অভিযোগ মানবে কেন? সে-ও তো একই ব্যাপার শোনে। সে জোর গলায় বলে উঠল, মিথ্যুক কোথাকার! আমাদের রেডিও স্লো না, তোদের রেডিও? ভালো করে যাচাই করে দেখ। বলে রাজু শাওনকে বলল, যা তোদের রেডিওটা অন করে ফুল ভলিউমে চালিয়ে দিয়ে আয়। আমি আমাদের রেডিও ছাড়ছি। ঢাকা-খ চ্যানেলে রাখবি কিন্ত।

শাওন বাড়ি চলে গেল রেডিও অন করতে। এদিকে রাজুও তার রেডিও ছাড়লো ফুল ভলিউমে। ঢাকা-খ তে তখন নজরুল সঙ্গীত চলছে। রাজু কানে শুনল, ওদের রেডিওতে চলছে—‘যাত্রীরা হুশিয়ার। অর্থাৎ গানটার দ্বিতীয় লাইন। তখন শাওনদের রেডিও থেকে রাজুর কানে ভেসে এলো, দুর্গমগিরি কান্তার মরু দুস্তর।’ অর্থাৎ গানটার প্রথম লাইন।

ওদিকে শাওনও শুনল ওদের রেডিওতে যখন গানটার দ্বিতীয় লাইন চলছে তখন রাজুদের রেডিওতে চলছে প্রথম লাইন। ও ভাবল রাজুটাই মিথ্যুক। এক দৌঁড়ে চলে গেল রাজুদের বাড়িতে।

অবাক কাণ্ড! রাজু মিথ্যুক নয়, এখন রাজুদের রেডিওতে গান চলছে আগে আগে। শাওনদের রেডিওতে চলছে একটু পরে।

শাওন ব্যপারটা খুলে বলল রাজুকে। রাজু বলল, চল তো দেখে আসি ব্যাপারখানা কী? কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! এখন শাওনদের রেডিওতে গান আগে বাজছে, পরে বাজছে রাজুদের রেডিওতে। চোখ কপালে উঠে গেছে দুই বন্ধুর। ভাবল একটা মস্ত রহস্য আবিষ্কার করে ফেলেছে দুই বন্ধু। তুমুল উৎসাহ নিয়ে ছুটে গেল বড়দের কাছে। বড়রা রহস্যটাকে পাত্তাই দিল না। তাদের মত, এমন ঘটনা নাকি সবজায়গায় সব রেডিওতে ঘটছে। এতে নাকি রহস্য টহস্য কিছু নেই। তখন ওরা জানতে চাইল কেন এমন ঘটছে? কিন্তু উত্তর পেল না। এতো সোজা প্রশ্নের নাকি উত্তর হয় না।

তখন দুই বন্ধুর মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। দুটো রেডিওকে পাশাপাশি রাখলে কেমন হয়? জানা যাবে কোনটা স্লো।

যেই ভাবা সেই কাজ। দুটো রেডিওকে একেবারে কাছাকাছি রেখে আবিষ্কার করল আরেক আজব ব্যাপার। কোনো রেডিওই স্লো নয়। দুটোয় চলছে সমান তালে। এর মানে কী? উত্তর ওরা জানে না। তবে এও বুঝল, এর ব্যাখ্যা দেয়া বড়দের কম্ম নয়। এর জবাব পাওয়া যেতে পারে বিজ্ঞান স্যারের কাছে।

শাওন আর রাজু যাক বিজ্ঞান স্যারের কাছে। আমরা এখন দেখি কেন এমন হয়। ব্যাখ্যাটা খুব সহজ। শব্দের গতিবেগ ধীর বলেই এমন হয়। ধরা যাক শাওনের রেডিও থেকে রাজুর রেডিওর দূরত্ব ৮৫ মিটার। বাতাসে শব্দের বেগ ৩৪০ মিটার। ৮৫ মিটার পথ পাড়ি দিতে শব্দের লাগে এক সেকেন্ডের চার ভাগের এক ভাগ সময়। এই সময়ে কোনো এক লাইন গেয়ে ফেলা যেমন সম্ভব, সম্ভব এক লাইন কবিতাও পড়ে ফেলা।

শাওন ও রাজু দুজনের বাড়িতেই একই সময়ে সময়ে একই গান চলছে। কিন্তু ৮৫ মিটার দূরত্বের কারণে এক সেকেন্ডের চার ভাগের এক ভাগ সময়ের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তাই রাজু যখন গানের একটা লাইন নিজের রেডিওতে শুনছে, শাওনও সেই একই লাইন শুনছে। কিন্তু দূরত্বের পার্থক্যের কারণে শাওনের রেডিওর গান রাজুর কানে আসতে এক সেকেন্ডের চারভাগের একভাগ সময় লাগছে। তাই ওর কাছে মনে হচ্ছে শাওনের রেডিওর স্লো চলছে। তেমনি শাওনের মনে হচ্ছে রাজুর রেডিও ধীরে চলছে।

যখন দুই রেডিও পাশাপাশি, তখন রাজু বা শাওন উভয়ের কান থেকেই দুটো রেডিওর দূরত্বই সমান। তাই তারা দুই রেডিওর গান তখন একইসাথে শুনতে পাবে। তখন দুই রেডিও শব্দ একসাথে মিলে জোরালো আওয়াজ তৈরি করবে।

এমন ঘটনা ঘটে দুটো টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও। একটা টেলিভিশনের কাছে দাঁড়িয়ে দূরের আরেকটা টেলিভিশনের দেখলে, দুটোতেই একই ছবি দেখা যাবে, কিন্তু শব্দ শোনা যাবে দুই রকম। কারণ আলোর গতিবেগ শব্দের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ায় ৮৫ মিটার কেনো ৮৫ কিলোমিটার দূর থেকে দেখলেও একই ছবি দেখা যাবে।