মেইন ম্যেনু

স্টেশনে কুকুর, হকারদের উৎপাত, দুর্গন্ধ

রেলে ভাড়া বাড়লেও সেবার মান বাড়েনি

যাত্রীদের বসার চেয়ার ভাঙা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মানুষের বসার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ছাগল। খোদ রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনেরই চিত্র এটি। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরো কত করুণ এতে খানিকটা আঁচ করা যায়।

রেলের ভাড়া বাড়লেও যাত্রীসেবার মান এখনো রয়ে গেছে আগের মতোই। ইঞ্জিন ও বগি সঙ্কটে প্রতিদিন ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যেতে পারছে না। এতে দেশের বিভিন্ন স্টেশনে রেলযাত্রীদের চরম হয়রানি আর ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

স্তব্ধ যাত্রীরা বলছেন, রেলে আগে যে সেবা ছিল এখনো সেই একই সেবা বিরাজ করছে। সেবার মান নিশ্চিত না করে কর্তৃপক্ষের কোনোভাবেই ভাড়া বৃদ্ধি করা ঠিক হয়নি। আর শিডিউল বিপর্যয় এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সিএনএস (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম) কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে লাগানো টিভি স্ক্রিন মনিটরে বেশির ভাগ সময় ট্রেন ছেড়ে যাওয়া ও আসার গন্তব্যের সময় ঠিক মতো ভেসে ওঠে না। তবে ঢাকার বিভাগীয় ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) কাছে দাবি করছেন, এখন আর ট্রেনের শিডিউল নিয়ে কথা বলার তেমন সুযোগ নেই। দুই-একটি ট্রেনের তো সমস্যা থাকতেই পারে।

কমলাপুর স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ৭টায় দিনাজপুরের উদ্দেশে দ্রুতযান এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে ছাড়ার কথা। সময়ানুযায়ী স্টেশনে যাত্রীরাও এসে হাজির। কিন্তু ওই ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় আসতেই পারেনি। এ সময় হাজার হাজার যাত্রীকে ট্রেনের অপেক্ষায় স্টেশনেই প্রহর গুনতে হয়। অনেকে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। অনেকেই খোঁজ নিতে স্টেশন ম্যানেজারের রুমে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সুসংবাদ না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসেন। একপর্যায়ে রাত ১টার দিকে ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছায়। এরপর ওই ট্রেনের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে ৭ ঘণ্টা বিলম্বে রাত আড়াইটার দিকে দিনাজপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

শুধু দ্রুতযান এক্সপ্রেস নয়, প্রতিদিন ঢাকা থেকে যেসব ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে এর বেশির ভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়ছে না বলে যাত্রীদের অভিযোগ। তবে যে ক’টা ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাচ্ছে সেগুলোতেও যাত্রীসেবার মান বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। একই সাথে স্টেশনের অপরিচ্ছন্নতা, হকার, কুকুরের উৎপাত যাত্রীদের বাড়তি ভোগান্তি হিসেবে যোগ হয়েছে। তবে এসব যাদের দেখার কথা তারা না দেখার ভান করছেন।

রোববার বিকেলে কমলাপুর স্টেশনে সরেজমিন দেখা যায়, স্টেশনের ২ নম্বর প্লাটফরম থেকে যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনটি জামালপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাইকে ঘোষণা দেয়া হয় ৪টা ৪০ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে যাবে। এই ট্রেনে বগি ১১টি। প্রতিটি বগির ভেতর ঘুরে দেখা যায়, ভেতরের পরিবেশ নোংরা। ফ্যান ঘুরছে ‘ঘড় ঘড়’ করে। সিটের হাতল কোনোটির এক সাইট থেকে ভেঙে পড়েছে। ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় থাকা এক মহিলা সিটে বসে পাশের মহিলাকে বলছিলেন, জানালা খোলে না কেন? তখন পাশের মহিলা তাকে বলেন, ‘তোমার জানালা খোলার দরকার নাই, তুলতে গেলে হাত কেটে যাবে। ট্রেনের লোক আসুক। এ সময় অপর এক যাত্রী বলছিলেন, বাথরুম থেকে গন্ধ আসে কেন? ট নম্বর বগিতে বসা জামালপুরগামী যাত্রী অহিদুর রহমানের কাছে টিকিট কত টাকায় কিনেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিকিট আমরা কাটি নাই। টিটি সাহেব আমাদের এখানে বসতে বলেছেন।

এ ব্যাপারে দায়িত্বরত টিটির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ট্রেনে টিকিট ছাড়া কোনো যাত্রী নেই। অনেকে আছে যারা স্ট্যান্ডিং টিকিট কাটে। তারা দাঁড়িয়ে যাবে। খাবার বগিতে গেলে দেখা যায় টিপটপ ক্যাটারিং কোম্পানির দুই সদস্য বসে আছেন। বাক্সে সেই পুরনো আমলের কাটলেট আর বার্গার। ট্রেনের ভাড়া বেড়েছে। কিন্তু খাবারের মানতো আগের মতোই, এমন প্রশ্নের উত্তরে ঘুরিয়ে তারা বলেন, ট্রেনের ভাড়া বেড়েছে আমরা খাবারের দাম কমিয়ে দেবো! পুরো খাবার বগিটাই অপরিচ্ছন্ন, অগোছাল। তবে এক যাত্রী বলেছেন, কেউ যদি এই খাবার তৈরি করতে দেখেন তাহলে তিনি আর কোনোদিনই খাবার খাবেন না। স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায় টার্মিনালে কুকুর ঘোরাঘুরি করছে। যাত্রীদের শরীরে ঘেঁষছে। হকারদের ভিড়।

নাম না প্রকাশের শর্তে একজন হকার জানান, প্রতিদিন একজন দোকানদার ২৬০ টাকা খরচ করে এখানে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। মাসে প্রায় আট হাজার টাকা গুনতে হয়। এর মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিক্রির জন্য আলাদা লাইসেন্স রয়েছে দোকানিদের। দোকান বসানোর ব্যাপারে কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী আমিনুল বলেন, এসব দোকান বসানোর জন্য ডিআরএম অফিস থেকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। আবার অনেকে আছে লাইসেন্স ছাড়াই। স্টেশনে যাত্রীদের আরামের জন্য ফ্যান লাগানো থাকলেও একটি ফ্যানও ঘুরতে দেখা যায়নি। এমনকি অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য এলইডি মনিটর লাগানো হলেও সেগুলোও ছিল বন্ধ।

স্টেশনে অপেক্ষমাণ ময়মনসিংহগামী যাত্রী নজরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, রেলের ভাড়া বেড়েছে কিন্তু যাত্রীসেবা নাই, এটা আর এখানে বলা যাবে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুই বছর ধরে শুনছি রেলে ইঞ্জিন-বগি আসছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখছি ওই পুরনো বগি আর পুরনো ইঞ্জিন দিয়েই চলছে রেল।

পরিচয় গোপন করে রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে শওকত নামে এক আনসার সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ রেলের সেবার কথা বলে আর লাভ নেই। ১০টার ট্রেন ১২টায়, ১২টার ট্রেন ৩টায় ছাড়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেনের মোবাইলে বারবার ফোন করা হলেও তিনি টেলিফোন ধরেননি। বিকেলে রেলের ঢাকার বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কাছে শিডিউল বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শত শত ট্রেন চলছে। দুই-একটা ট্রেনেরতো শিডিউল বিপর্যয় হতেই পারে। আমি মনে করি শিডিউল নিয়ে কথা বলার সুযোগ নাই। সাংবাদিকেরা না জেনেই শিডিউল বিপর্যয়ের কথা লিখছেন।

উল্লেখ্য, যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধির কথা বলে এর আগে ২০১২ সালে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল কিলোমিটারে গড়ে ৩৬ পয়সা। আর এবার গড়ে ভাড়া বেড়েছে ৭.২৩ শতাংশ। গন্তব্য অনুযায়ী বর্ধিত ভাড়ার তালিকা আগেই সব স্টেশনে টাঙিয়ে দিয়েছে রেল কর্তৃপ। নতুন হারে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে শোভন শ্রেণীর ভাড়া ২৬৫ টাকা থেকে বেড়ে ২৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০ থেকে ৩৪৫, এসি চেয়ার ৬১০ থেকে ৬৫৬, এসি সিট ৭৩১ থেকে ৭৮৮ ও এসি বার্থ ১০৯৩ থেকে ১১৮৯ টাকা হয়েছে। ঢাকা-খুলনা রুটে শোভন শ্রেণীর ভাড়া ৩৯০ টাকা থেকে বেড়ে হয় ৪২০ টাকা, শোভন চেয়ার ৪৬৫ থেকে ৫০৫, এসি চেয়ার ৮৯১ থেকে ৯৬১, এসি সিট ১০৭০ থেকে ১১৫৬ ও এসি বার্থ ১৫৯৯ থেকে বেড়ে হয় ১৭৩১ টাকা। ঢাকা-সিলেট রুটে শোভন শ্রেণীর ভাড়া হয় ২৬৫ টাকা, শোভন চেয়ার ৩২০, এসি চেয়ার ৬১০, এসি সিট ৭৩৬ ও এসি বার্থ ১০৯৯ টাকা। ঢাকা-রাজশাহী রুটে এসব শ্রেণীর ভাড়া হয় ৮৫, ৩৪০, ৬৫৬, ৭৮২ ও ১০৬৮ টাকা। অন্যান্য রুটেও প্রায় একই হারে বেড়েছে যাত্রী ভাড়া।

এই হারে ভাড়া বৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলছেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর অঙ্গীকার করে ২০১২ সালেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেবার মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে রেলে লোকসান হয়, আর এখন যাত্রীদের ওপর তার ভার চাপাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি রেলপথে নিয়মিত ভ্রমণকারী প্রায় ৩০০ যাত্রীর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছেন তারা, যাতে ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভাড়া বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক’ বলেছেন। সেবার মান নিয়ে ুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রামের পথে চলাচলকারী অন্যতম বিলাশবহুল ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রীদের মধ্যে ওই জরিপ চালানো হয়। পুরো ট্রেনের বিভিন্ন কোচে ভাঙা আসন, ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রব দেখা গেছে। পাশাপাশি টিকিটবিহীন যাত্রী ওঠানামাসহ নানা অনিয়ম দেখেছে জরিপকারী দল। জরিপ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীসেবার মান, রেলস্টেশনের সার্বিক পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে ‘সন্তুষ্ট নন’ বলে জানিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা।

অন্য দিকে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা রেলের সেবার মান ‘সন্তোষজনক’ বলেছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কিনে ভ্রমণ করতে বাধ্য হওয়ার কথা বলেছেন। তিন শতাংশ বলেছেন, তারা ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেলপুলিশ, আমলা, এমপি-মন্ত্রীর তদবিরের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করেন। বুকিং সহকারী, অনুসন্ধান কর্মকর্তা, স্টেশন মাস্টার, স্টেশন ম্যানেজার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে অসন্তুষ্টির কথা বলেছেন জরিপের ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা। ওই জরিপেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল শনিবার সকালে কমলাপুর স্টেশনে আসা যাত্রীদের সাথে কথা বলে।

মো: হাসেম আলী নামে এক যাত্রী জানালেন, একটি আন্তঃনগর ট্রেনের আসনবিহীন টিকিট কেটে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুরে এসেছেন তিনি। বাসে আসতে যানজটে পড়তে হয় বলে এভাবেই তিনি মতিঝিলে এসে অফিস করেন। অন্য সময়ে ৩৫ টাকায় চলে আসি। শনিবার ৪৫ টাকা নিলো। কিন্তু সার্ভিস তো আগের মতোই। কেন বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত না করে কেবল ভাড়াটাই চাপিয়ে দিলো সরকার।
কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেছেন, তাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে তারা সব সময়ই সচেষ্ট। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে প্রতিদিন ১৩০টি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করে। এর মধ্যে ‘দুই-একটা ট্রেন’ সময়মতো ছাড়া সম্ভব হয় না। এটাকেতো আর শিডিউল বিপর্যয় বলা যায় না।

কমলাপুর স্টেশনের মাস্টার কাজী আজিজুর রহমান বলেন, রোববার উপকুল এক্সপ্রেস ৩টা ২০ মিনিটে যাওয়ার কথা। সেটি ২০ মিনিট বিলম্বে, কালনী ৪টায় ছাড়ার কথা। সেটি ৪টা ১০ মিনিটে ছেড়ে গেছে। দ্রুতযান বিলম্বের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, দেরিতে যে ট্রেন আসবে সেটি দেরিতে ছাড়বে এটাই স্বাভাবিক।

গত রাতে রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, শিডিউল বিপর্যয় হলে বা ট্রেন না ছাড়লে ওই যাত্রীদের জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। নয়া দিগন্ত