মেইন ম্যেনু

রোয়ানু তাণ্ডবে কক্সবাজারে ৩০ হাজার বাড়ি-ঘর ক্ষতিগ্রস্ত

কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাবে কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আর উপকূলীয় এলাকায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। জলোচ্ছ্বাসে ২০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার বাড়ি-ঘর। ভেঙে গেছে উপকূলের ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

সকাল থেকে রোয়ানুর প্রভাবে ব্যাপক জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্ট হয়। এসময় কক্সবাজারের কুতুবদিয়া দ্বীপের আলী আকবর ডেইল, লেমশীখালী, উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং ও কৈয়ারবিল ইউনিয়ন, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা ও রাজাখালী ইউনিয়ন, মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা, কুতুবজোম ও মাতারবাড়ি ইউনিয়ন, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন ও কক্সবাজার সদরের পোকখালী, গোমাতলী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন এবং কক্সবাজার পৌরসভার বিমানবন্দর সংলগ্ন ১নং ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার শতাধিক গ্রাম ৩-৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায়।

বাতাসের তোড়ে জেলার প্রায় এলাকায় গাছপালা উপড়ে পড়েছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এক প্রেসব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন।

জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন জানান, জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া দ্বীপের দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মাস্টার ফয়েজুর রহমানের ছেলে ফজলুল হক (৫৫) দুই নৌকার মাঝখানে চাপা পড়ে প্রাণ হারায়। আর উত্তর ধুরুং ইউনিয়নের আব্দুর রহিমের ছেলে মো. ইকবাল (২৫) বসতবাড়ির মাটির দেয়াল চাপা পড়ে মারা যান।

অপরদিকে, ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী-ধলঘাটা ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা। এখানে নিহত হয়েছে এক শিশু। নিখোঁজ রয়েছে জেলেসহ ২৫ জন।

ধলঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম জানান, জলোচ্ছ্বাস থেকে নিজেদের বাঁচাতে ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে বের হন ধলঘাটা এলাকার ভুট্টোর স্ত্রী রোকেয়া। সঙ্গে ছিল তার তিন সন্তান। মাতারবাড়ী-ধলঘাটার সংযোগ স্থল আনিচদিয়া নামক স্থানে পানির তোড়ে তিন সন্তানসহ ভেসে যান তিনি। স্থানীয়রা মা রোকেয়াকে উদ্ধার করতে পারলেও ৭ এবং ৯ বছরের দুই শিশুকে এখনো সন্ধান পায়নি।

এদিকে, সকালে নৌকা কূলে আনতে গিয়ে ভেসে গেছেন জালিয়া পাড়ার আজগর মাঝি ও উলামিয়ার ছেলে বাড়ো মাঝিসহ দুই নৌকায় মোট ২৩ জন। তাদের অবস্থান এখনো পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।

ব্রিফিংয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান জানান, জলোচ্ছ্বাসে কক্সবাজার উপকূলের ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নিচিহ্ন হয়ে গেছে। তার মাঝে কুতুবদিয়ায় ১২ কি.মি., মহেশখালীতে ৭ কি.মি., পেকুয়ায় ৪ কি.মি., টেকনাফে ৪ কি.মি. ও কক্সবাজার উপজেলার গোমাতলী-চৌফলদন্ডী এলাকায় ৩ কি.মি. এলাকা নিচিহ্ন হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলায় মোট ১৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৭ হাজার ৪৩৪ পরিবারের ৮৭ হাজার ১৭০ জন মানুষ। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে চিড়া, মুড়ি, গুড় ও খাবার পানি দেয়া হয়েছে।

কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরং, দক্ষিণ ধুরং, আলী আকবর ডেইল, পেকুয়া উপজেলার মগনামা, রাজাখালী, উজানটিয়া, মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী, ধলঘাটা, কুতুবজোম, টেকনাফ উপজেলার সাবারাং, সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ও ২নং ওয়ার্ডের কুতুবদিয়া পাড়া, চরপাড়া, সমতিপাড়া, নুনিয়ার ছড়া সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-৭ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী জানান, ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের পর এবারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি মহাল নাজিরার টেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার শুঁটকি নষ্ট হয়ে গেছে।

পেকুয়া উপজেলার চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু জানান, উপজেলার মগনামা, উজানটিয়া, রাজাখালী, পেকুয়া সদর ও টৈটং ইউনিয়নে প্রায় ১২ শতাধিক ঘর-বাড়ি ভেঙে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে মগনামা, উজানটিয়া ও রাজাখালী ইউনিয়নের ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে আসা মানুষকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়া ও বাড়ি-ঘর এলাকায় চলাচল করতে গিয়ে কম-বেশি আহত হয়েছেন ৮-১০ জন।

কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু তালেব জানান, সদরের উপকূলীয় পোকখালীর পশ্চিম গোমাতলী বাঁশখালীপাড়া ও উত্তর গোমাতলী এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বৃহত্তর গোমতলীর প্রায় ১০ হাজার একর চিংড়ি ঘের ৫-৭ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর। পানির সঙ্গে মিলিয়ে গেছে লাখ লাখ টাকার লবণ। কম বেশি আহত হয়েছেন ১৫ জন।

কুতুবদিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম নুরুল বশর জানান, উপজেলার প্রায় ৮০ ভাগ জায়গা রোয়ানের আঘাতে প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু সকালের দিকে কক্সবাজারে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হেনেছে। এর প্রভাবে নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। এটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, প্রেস ব্রিফিংয়ে যা বলা হয়েছে তা প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য। অনেক এলাকা হয়তো হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেয়া আছে সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষয়-ক্ষতি নির্ণয় ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।