মেইন ম্যেনু

লোকসাহিত্যের বরপুত্র পল্লীকবি জসীম উদ্দীন

সাফাত জামিল শুভ : বাংলার লোকজীবনের বৃহত্তর আঙ্গিনায় অবারিত গ্রামীণ জনপদের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বহু গল্প,উপন্যাস রচিত হয়েছে। কিন্তু আবহমান গ্রাম বাংলাকে উপজীব্য করে ‘বাংলা কবিতা’র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পল্লী কবি জসীমউদ্দীন। রবীন্দ্রযুগের কবি হয়েও রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে পল্লীজীবনকে অবলম্বন করে জসীমউদ্দীন নির্মাণ করেছেন স্বকীয় এক কাব্যভুবন।

তার সাধনায় উন্মুক্ত হয়েছে বাংলা কবিতার নতুন এক দুয়ার। বাংলা গীতিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি আধুনিক দৃষ্টি দিয়ে চোখ ফেরান পল্লীজীবনের দিকে।

বাংলার গ্রামীণ-প্রকৃতি আর পল্লীর সাধারণ মানুষ নিয়েই গড়ে উঠে তাঁর কবিতালোক। গ্রামীণ জীবনকেন্দ্রিক কাব্যের বিস্ময়কর ভাষায় হাজার বছরের বাংলার পল্লী নতুন প্রাণ নিয়ে জেগে উঠে কবির কবিতায়।

পল্লীকবির কবিতায় রাখালিয়া সুর ও গ্রামীণ জীবনের ভাববস্তু, নিরস আঞ্চলিক কবিতা এবং ভাবুক দার্শনিক লোকজন কবির ভাব-সাধনাকে নিবিড়ভাবে বেছে নিয়ে নিজস্ব একটা ধারা তৈরি করেছেন। এই ধারা আসলে এক ধরনের পূর্ণ নির্মাণ। অপ্রধান কবিদের মধ্যে যে মাঝে মাঝে আলোর বিচ্ছুরণ থাকে শক্তিমান কবি জসীম উদ্দীন সেই সম্ভাবনাময় অংশকে একটু ঘষে মেজে, একটু রংয়ের ছোপ দিয়ে সে অংশটুকুকে আলোচিত করে বা জীবনের প্রাণবন্ত স্পর্শ শিল্প সৃষ্টি করে গড়ে তোলেন। পল্লীকবি কবি তার কবিতায় দেশ কাল,সমাজ, মানুষ ও জীবন চিত্র চিত্রিত করেছেন তা শুধু গোছানোই নয়,বরং সংহত, পরিপাটি ও অনুপম শিল্প আকার লাভ করেছে।

কবির কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মন্তব্য করেন, ‘জসীম উদ্দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রকৃতি আছে। নকশি কাঁথা’র মাঠ কবিতাকে সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা বলে মন্তব্য করে বিশ্বকবি বলেছিলেন, ‘আমি এটাকে আদরের চোখে দেখেছি, কেনো না এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে। আর এক ধরনের পল্লী কবিতা আছে যা ভাব গভীর ও দার্শনিকতাপূর্ণ। এতে গ্রাম বাংলার স্বকীয় চিন্তন প্রক্রিয়ার একটা ধারা পাওয়া যায়। এই সব কবিতার ভাবুকতা যথেষ্ট উচ্চ মানের বৈকি!’

জসীম উদ্দীনকে পরিচয় করিয়ে দেবার এ ছিল এক ছোট্ট উপমা। জসীম উদ্দীনকে সারা দেশ-বিদেশের পাঠক মহলকে চিনতে হলে তার সৃষ্টিকর্মের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হয়। তখনকার বাংলা সংস্কৃতির যে রূপ, তাঁর লেখার মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটে উঠছে। জসীম উদ্দীন লোকজ বাংলার, আবহমান বাংলার, কৃষ্টি সভ্যতাকে সত্যিকারভাবে বাংলা সাহিত্যে স্থান দেবার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা তিনি করেছেন, তাঁর অনবদ্য লেখনী তুলিকার মধ্য দিয়ে। পালাগান, গাজীর গান, জারী গানের ভাণ্ডার নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। বাংলার মানুষের আবেগ আর অনুভূতির দরজায় তিনি কড়া নেড়েছেন। পশ্চিমা সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতির হাত থেকে বাঙালিকে মুক্ত করার জন্য এটাও ছিল তার এক ধরনের কলমযুদ্ধ। গ্রাম বাংলায় ঘুরে ঘুরে কবি অর্জন করেছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আর এই অভিজ্ঞতাকে তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে। বাঙালির আবেগের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রেম-বিচ্ছেদ-গ্রাম্য সংস্কৃতি, নদীমাতৃক বাংলা কতো প্রিয় করে তোলে আমাদের। আমাদের লোকজন সংস্কৃতির সকল অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে তাঁর বইগুলোতে। তাঁর জীবনপঞ্জি থেকে পাঠক মহলে অনুমেয় হয় যে, কবি জীবনে যে যে স্তরে কাটিয়েছেন সেই বিষয়ের অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি পুস্তক আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা এই আঙ্গিকে জসীম উদ্দীনের মতো লোকজ বিষয়কে আর কেউ এতো প্রাধান্য দিয়েছেন বলে মনে হয় না।

বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে কবি জসীম উদ্দিনের আত্মজীবনী বা স্মৃতি কথা,ভ্রমণ কাহিনী আর গল্প ও উপন্যাসে যে সহজ অনুপম শিল্প আকারে লাভ করেছে, যার মধ্যে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হয়ে আছে তাঁর অতি আধুনিক মন, মনন, চিন্তা ও সামাজিক দর্শন।তিনি ছিলেন বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। কেননা তিনিই একদিন দুঃসাহসিক অঙ্গীকার নিয়ে বলতে পেরেছিলেন—‘তোমার গেঁয়ো মাঠটি আমার মক্কা হেন স্থান।’ পল্লীদরদী না হলে এমন উচ্চারণ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি অধ্যয়নকালে ও লাভের পর জসীম উদ্দীন প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে রিসার্চ ফেলো পদে কর্মরত ছিলেন। দীনেশ সেন সেই দিনগুলোতে বাংলাদেশের পল্লী এলাকার মানুষের মুখে মুখে গীত-পঠিত পুঁথি সংগ্রহ ও গবেষণা করতেন। ড. সেন তাঁর উপযুক্ত শিষ্য জসীম উদ্দীনকে বাংলার জেলাগুলোর বিশেষভাবে ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সেই সব পুঁথি (কাব্য-লোকগাথা) সংগ্রহের দায়িত্ব দেন। জসীম উদ্দীন পুঁথি সংগ্রহকালে গ্রামীণ জনপদের আনন্দ বেদনার কাব্যগাথার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন, মানুষকে ভালোবেসে একজন খাঁটি মানবপ্রেমী হয়ে ওঠেন। কবি পালাগান, গাজীর গান, জারী, লোকগীতির আসরে যেতেন, উপভোগ করতেন, মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতেও লোকসঙ্গীত আসরের আয়োজন করতেন। তিনি বেশ কিছু লোকগীতিতে সুরারোপ করেন ও বিশিষ্ট শিল্পীদের গান শেখান এবং পরবর্তীকালে কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। কবি পৃথিবীর বহুদেশ সফর করেছেন। সেই সব দেশের লোকসংস্কৃতির উপাদান প্রত্যক্ষ করেন। জসীম উদ্দীন কাব্যগ্রন্থ, নাটক, উপন্যাস, কাব্যোপন্যাস, প্রবন্ধ গ্রন্থ, লোক-সাহিত্য, গবেষণা গ্রন্থ, গানের বই, ভ্রমণ কাহিনী এবং তার নিজের আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাসহ অর্ধশতের অধিক বইয়ের রচয়িতা। কবি দুইবার এডিনবার্গ উৎসবে (১৯৫০ ও ১৯৬২ সালে) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোশ্লাভিয়াসহ বহুদেশে অনেক লোকসংস্কৃতি উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রন্থগুলো বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে; তাঁর “মাটির কান্না” কাব্যগন্থটির রুশ ভাষায় একটি সংস্করণ বেরিয়েছে।

কবির বিখ্যাত গ্রন্থ ভাণ্ডারের মধ্যে নকশী কাঁথার মাঠ (কাহিনী কাব্য), সোজন বাদিয়ার ঘাট (কাহিনী কাব্য), মাটির কান্না (কবিতা সংকলন), এক পয়সার বাঁশি (শিশু সাহিত্য), বেদের মেয়ে (লোকনাট্য), মধুমালা (লোকনাট্য), রঙিলা নায়ের মাঝি (গানের সংকলন), ডালিম কুমার (শিশু সাহিত্য), বোবা কাহিনী (উপন্যাস), বউ টুবানীর ফুল (উপন্যাস) সহ রচনা সমগ্র। জসীম উদ্দীনের লেখাগুলোর নাটক, চলচ্চিত্র, টেলিফিল্ম, মঞ্চ নাটক, গীতিনাট্য আকারে প্রচার হয়েছে আমাদের মিডিয়ায়।

FB_IMG_1470959867618

অনুভূতি আর আবেগের কবি জসীম উদ্দীন ১৯০৩ সালের পহেলা জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার বাড়ি ছিলো একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। বাবার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। মা আমিনা খাতুন ওরফে রাঙাছুট। জসীম উদ্ দীন ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল, ও পরবর্তীতে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে পড়ালেখা করেন। এখান থেকে তিনি তার প্রবেশিকা পরীক্ষায় ১৯২১ সনে উত্তীর্ণ হন।সেবছরই মোসলেম ভারত পত্রিকায় কবির ‘মিলন গান’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতাটিই কবির প্রকাশিত প্রথম লেখা। ১৯২৫ সালে প্রগতিশীল সাহিত্য পত্রিকা কল্লোল তার বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৭ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ প্রকাশিত হয়। এর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ‘কল্লোল’ পত্রিকার সম্পাদক জনাব দীনেশ রঞ্জন দাশ। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় তার আলোড়িত কাহিনী কাব্য ‘নকশীকাঁথার মাঠ।’ এর পর কবি এমএ পাস করেন। ১৯৩৩ সালে প্রবাদ প্রতিম পুরুষ এবং ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে লাহিড়ী রিসার্চ এ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দেন। এ বছরই তার কাব্যগ্রন্থ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৩৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।১৯৬৯ সনে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মান সূচক ডি লিট উপাধিতে ভূষিত করেন।

১৯৭৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন এবং এ বছরই কবি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে নিজ গ্রামেই সমাধিস্থ করা হয়।সমাধির শিয়রে একটি ডালিম গাছ আছে।যা মনে করিয়ে দেয়, ”কবর” কবিতার সেই জনপ্রিয় চরণ….

‘ঐখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজিয়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়