মেইন ম্যেনু

শক্তিশালী এল নিনোর কবলে বিশ্ব

গ্রীষ্ম আসতে না আসতেই গরমে প্রাণ উষ্ঠাগত। বছরের এই সময়েই সূর্য এতটাই তেতে উঠেছে যে, বাড়ির বাইরে যেতেই মন চাইছে না। ঘরেও যে শান্তি, তা নয়, গুমোট গরমে কিছুক্ষণ পর পর পানি আর পানীয়তে অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা মানুষের। এই পরিস্থিতির অবসান কবে, কবে নামবে বৃষ্টি, সেজন্যই এখন ত্যক্ত বিরক্ত মানুষের অপেক্ষা। এই পরিস্থিতি যে কেবল বাংলাদেশে তা নয়, প্রতিবেশি দুই দেশ ভারত-মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও খারাপ। গরম-খরায় জীবন-কৃষি সবই বিপন্ন এই দুই দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। প্রতিদিনই হিটস্ট্রোকে প্রাণ হারাচ্ছে মূল্যবান প্রাণ। নদী শুকিয়ে গেছে থাইল্যান্ডে, পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষবরণের পানি উৎসবেও দেয়া হয়েছে বিধিনিষেধ। পূর্ব এশিয়ার সব কটি দেশের পরিস্থিতিও একই রকম। গোটা আফ্রিকাতে জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। চলতি বছরটি হতে যাচ্ছে সবচেয়ে উষ্ণতম বছর, এমন আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। আবহাওয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর কবলে পৃথিবী। প্রশান্ত মহাসাগরের এই খামখেয়ালিপনা এত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এর আগে হাতে গোনা মাত্র কয়েকবার। ফলে ২০১৬ সালে ব্যাপক খরা এবং খাদ্যসঙ্কটের মুখোমুখি হতে চলেছে বিশ্ব। এল নিনোর আঘাতে ২০১৬ সালে ক্ষুধা ও রোগবালাইয়ের প্রবণতা বাড়বে। এই কারণে বিশ্বের কোনো এলাকায় প্রচ- খরার সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে অন্যান্য এলাকা প্রবল বন্যার কবলে পড়তে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সত্যি হলে চলতি বছর এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আফ্রিকা। শুধুমাত্র এই অঞ্চলেই অনাহারের মুখে পড়বে তিন কোটি ১০ লাখ মানুষ। ক্যারিবিয়া, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলেও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো। এমনিতেই তীব্র পানি সংকটে থাকা ইথিওপিয়ার অবস্থা এবার হবে আরও করুণ। খরার কারণে খাবারের অভাব বরাবরই প্রকট দেশটিতে। চলতি বছর অনাহারের পরিস্থিত আরও ভয়ঙ্কর হবে। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো এখন থেকেই গোটা বিশ্বকে সতর্ক করতে শুরু করেছে। তারা বলছে, ভয়ঙ্কর খাদ্যসঙ্কটের হুমকি মোকাবিলায় ত্রাণের ব্যবস্থা না করলে না খেয়ে মরতে হতে পারে কয়েক কোটি মানুষকে। যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক ক্লিঙ্গম্যান বলেন, ‘কিছু হিসাবে ইতোমধ্যেই সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর রেকর্ড করেছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলের অনেক দেশে বৃষ্টিপাত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেতে দেখছি’। এল নিনোর প্রভাবে বন্যা ও খরা অব্যাহত থাকায় এর সামগ্রিক প্রভাব কতোটা ব্যাপক হতে পারে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ত্রাণ সংস্থাগুলো। গত বছরের মে মাস থেকে শুরু হয়েছে এল নিনোর প্রভাব। অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী সতর্কবার্তা দিয়েছেন, চলতি বছর এই এল নিনো আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এল নিনোর এ রকম প্রতিক্রিয়া কয়েক বছর পরপর দেখা যায়। গত বছর তা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল এবং এর প্রভাব চলতি বছর আরও বেড়েছে। ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কা করছেন যুক্তরাজ্যের আবহাওয়াবিদেরা। এন নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ঝড় হতে পারে। আর যুক্তরাজ্যে ২০১২ সালের মতো বেশি ঠান্ডাও পড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে এল নিনোর প্রভাবে ফসলের ক্ষতি হবে। ফলে ধান, কফি ও চিনির মতো খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনো কী:- এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রার একটি পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন। এর প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং আবহাওয়ার নিয়মিত ধরণগুলোতে পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পর্যায়বৃত্তের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, তবে প্রতি তিন থেকে আট বছরের মধ্যে এটি দেখা যায়। সাধারণত ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলো এল নিনোতে বেশি আক্রান্ত হয়। কখনও টানা এক বছর এটি স্থায়ী হয়। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এল নিনো ২০১৬ সালেও থাকবে বলে জানান আবহাওয়াবিদরা। অতীতেও বেশ কয়েকবার এল নিনোর প্রভাব দেখা গেছে। আঠারো শতকে মাঝারি ধরনের সব মিলিয়ে ৩২টি এল নিনো শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ১৯৪০ থেকে ১৯৪১, ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সালের এল নিনোকে শক্তিশালী হিসেবে ধরা হয়। আর ১৮৯১, ১৯২৫ থেকে ১৯২৬ ও ১৯৮২ থেকে ১৯৮৩ সালের ঘটনাসমূহকে খুবই শক্তিশালী ধরা হয়। ‘এল নিনো’ একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার মানে ‘বালক’ এবং নির্দেশ করা হয় ‘যিশুর ছেলে’ বলে, কারণ এই পর্যাবৃত্ত উষ্ণ সামুদ্রিক জলপ্রপাতের পরিবর্তন সাধারণত উত্তর আমেরিকার ক্রিসমাসের সময়ই দেখা যায়। এল নিনো বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর কারণে উন্নয়নশীল দেশের কৃ্ষকিাজ এবং মাছ শিকার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।